Image description

বাংলাদেশে দুর্নীতির অভিযোগে সাজাপ্রাপ্ত যুক্তরাজ্যের লেবার পার্টির এমপি টিউলিপ সিদ্দিককে ফেরত চাইবে বিএনপি জোটের নতুন সরকার। তার সাজা কার্যকর করতে যুক্তরাজ্য সরকারের কাছে অনুরোধ করা হবে। চলমান মামলাগুলোয় অনড় অবস্থান ও বিচারকার্যে কোনো হস্তক্ষেপ না করার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী হতে যাওয়া তারেক রহমানের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির।

 

রোববার (১৫ ফেব্রুয়ারি) প্রকাশিত সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্টের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

 

রাজধানী ঢাকার একটি আদালত জমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত মামলায় সিদ্দিককে তার খালা ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে দোষী সাব্যস্ত করে চার বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড দেন। বিচারকার্য পরিচালনার সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন না ব্রিটেনের সাবেক মন্ত্রী ও উত্তর লন্ডনের হ্যাম্পস্টেড এবং হাইগেটের এমপি টিউলিপ। বিধায় বাংলাদেশের আদালতের দেওয়া রায়কে স্বীকৃতি দিতে নারাজ যুক্তরাজ্য।

 

অবশ্য টিউলিপ সিদ্দিক নিজেও অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। জানান, তাকে কখনও আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগের বিস্তারিত জানানো হয়নি। এই রায় ‘মিডিয়া ট্রায়াল’ ছিল বলে দাবি তার।

 

কিন্তু তারেক রহমানের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেছেন, ‘বিএনপি সরকার সিদ্দিক বা শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে চলমান মামলাগুলো থেকে সরে আসবে না। শেখ হাসিনাকে পৃথক এক মামলায় মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।’ ২০২৪ সালের আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে হওয়া গণবিক্ষোভ দমন-পীড়নের ১ হাজার ৪০০ মানুষের প্রাণহানি হয়। পরে তুমুল আন্দোলনের মুখে তিনি দেশ ছেড়ে পালিয়ে প্রতিবেশী দেশ ভারতে আশ্রয় নেন।

 

বিএনপি সরকারের সম্ভাব্য পররাষ্ট্রমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে থাকা হুমায়ুন কবির বলেন, ‘খালা-ভাগনি দুজনের অপরাধই প্রমাণিত। বিচারিক প্রক্রিয়া স্বচ্ছভাবেই চলছে।’

 

বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ চুক্তি নেই। ফলে সিদ্দিককে ফেরত পাঠানোর সম্ভাবনা খুবই সীমিত। তাত্ত্বিকভাবে চুক্তির বাইরে সমঝোতা হতে পারে, কিন্তু যুক্তরাজ্যের লেবার পার্টি এই বিচারের কড়া সমালোচনা করে বলেছে, ন্যায্য আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া দেওয়া ‘রায় তারা মানতে পারে না’। দলটির ভাষ্য, অভিযোগের বিস্তারিত না জানিয়ে এবং যথাযথ আইনি প্রতিনিধিত্বের সুযোগ না দিয়ে বিচার করা হয়েছে।

 

২০২৫ সালের শেষের দিকে দুর্নীতির অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হন টিউলিপ সিদ্দিক। চলতি মাসের শুরুতে এর প্রতিক্রিয়ায় লেবার পার্টি এক বিবৃতি দেয়। তাতে দলটি জানায়, ‘এই মামলায় টিউলিপ সিদ্দিককে কোনো ন্যায্য আইনি প্রক্রিয়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি। তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিস্তারিত তথ্যও অবগত করা হয়নি।’

 

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘তার আইন পরামর্শক টিমের মাধ্যমে বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের কাছে বারবার অনুরোধ জানানো হলেও অভিযোগের বিস্তারিত তথ্য সরবরাহ করা হয়নি। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হলে তাকে অবশ্যই যথাযথ আইনি প্রতিনিধিত্বের সুযোগ দিতে হবে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সে সুযোগ দেওয়া হয়নি। তাই এই রায়কে স্বীকৃতি দেওয়া সম্ভব নয়।’

 

হুমায়ুন কবিরের মতে, এই মামলাটি যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশের সম্পর্কে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। তারেক রহমান ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেবেন। গত বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ নির্বাচনের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে তার দল নতুন সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। বিএনপি সরকার শেখ হাসিনা ও তার ভাগনির বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহার করবে কি না প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা বিচারিক প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করব না।’

 

স্যার কিয়ার স্টারমারের নেতৃত্বাধীন লেবার পার্টি সরকারের জন্য টিউলিপ সিদ্দিক ইস্যুটি ‘বিব্রতকর’ বলে উল্লেখ করেন হুমায়ুন কবির। তিনি বলেন, “অপরাধীদের ব্যাপারে যুক্তরাজ্যের অবস্থান ‘স্পষ্ট হওয়া উচিত’। দেশটির মাটিতে অবস্থান করা আওয়ামী লীগসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অর্থ পাচারসহ নানা অপরাধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। তারা বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। আমরা ব্রিটিশ সরকারের কাছে একটি তালিকা দেব।”

 

হুমায়ুন কবির যুক্তি দেখিয়ে বলেন, ‘আমরা তাদের ফেরত চাই এবং প্রত্যর্পণের ক্ষেত্রে আমরা চাইব যুক্তরাজ্য সরকার এই অপরাধীদের অবস্থান শনাক্ত করুক। যদি অবৈধ অভিবাসন মোকাবিলায় যুক্তরাজ্যের সঙ্গে বাংলাদেশ ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে পারে, তাহলে বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে যুক্তরাজ্যে আশ্রয় নেওয়া অপরাধীদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সহযোগিত কেন সম্ভব হবে না?’

 

বাংলাদেশের পতিত সরকারের মন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীরর প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি প্রায় ১৭০ মিলিয়ন পাউন্ডের সম্পদ জব্দ করেছে। এর মথ্যে বাংলাদেশের সাবেক মন্ত্রীর প্রায় ৩০০ সম্পতি রয়েছে। তবে আরও কিছু করা দরকার।

 

এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে টিউলিপ সিদ্দিকের সঙ্গে যোগাযোগ করে দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট। এর আগে তিনি এই বিচারকে ‘ত্রুটিপূর্ণ এবং প্রহসনমূলক’ বলে অভিহিত করেছেন। টিউলিপ বলেন, ‘এই ক্যাঙ্গারু কোর্টের ফলাফল যতটা অনুমানযোগ্য, ঠিক ততটাই অযৌক্তিক। আশা করি, এই তথাকথিত রায়কে অবমাননার সঙ্গে বিবেচনা করা হবে। আমার মনোযোগ হ্যাম্পস্টেড ও হাইগেটের ভোটারদের দিকেই থাকবে এবং বাংলাদেশের নোংরা রাজনীতিতে বিভ্রান্ত হতে রাজি নই।’