Image description

গত প্রায় দেড় বছরে দেশে যে পরিস্থিতি বিরাজ করেছে, তাতে বিনিয়োগ করা কঠিন ছিল—এমনটাই মনে করেন ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা। এখন তারা চান আগামীকাল শান্তিপূর্ণভাবে জাতীয় নির্বাচন শেষ হোক। পাশাপাশি ক্ষমতা হস্তান্তর হোক মসৃণ ও নিয়মতান্ত্রিক। তারা বলছেন, ফলাফল যা-ই হোক দেশে নতুন নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারের মাধ্যমে যেন শান্তিপূর্ণ ও বিনিয়োগবান্ধব একটা পরিবেশ তৈরি হয়।

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল করা এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধিতে অন্তর্বর্তী সরকারের সাফল্য থাকলেও উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। দুর্বল আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির মধ্যে ছিল ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার। ফলে এ সরকারের আমলে বেসরকারি বিনিয়োগ ও ঋণপ্রবাহে স্থবিরতা নেমে আসে, যা নেতিবাচক প্রভাব ফেলে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে। আবার ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সরকারের দূরত্ব ও আস্থার সংকট ছিল। আগামীকাল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। দেশের ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তারা এখন তাকিয়ে আছেন শান্তিপূর্ণ নির্বাচন ও ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রত্যাশায়। সে রকমটা হলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও বিনিয়োগ উদ্যোগ নতুন করে পথ চলতে সক্ষম হবে বলে মনে করছেন তারা।

শিল্পোদ্যোক্তারা মনে করেন, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী শাসনামলে যারা ব্যাংক থেকে টাকা লুট করেছে, দুর্বৃত্তায়নে জড়িত ছিল তাদের শাস্তি হতে হবে বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। কিন্তু এজন্য গোটা ব্যবসায়ী সম্প্রদায়কে আক্রমণ করে কিংবা তাদের ব্যবসা করতে না দিয়ে দুর্বৃত্তায়নের ক্ষত দূর করা যাবে না।

বাংলাদেশের পরবর্তী রূপান্তরে ব্যবসায়ীরা অংশীদার হতে চান। তাদের প্রত্যাশা শান্তিপূর্ণ পরিবেশ। তারা মনে করেন জ্বালানিসহ যেসব বড় সংকট রয়েছে সেগুলোর টেকসই সমাধান নিশ্চিত করা গেলে তিন বছরের মধ্যে দেশের অর্থনীতি বড় ধরনের রূপান্তর প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে পারবে।

স্কয়ার গ্রুপের পরিচালক তপন চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গত দেড় বছর ধরে অন্তর্বর্তী সরকার দেশ পরিচালনা করছে। তারা তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে। এ সময়ে কিছু শিল্পকে ভুগতে হয়েছে। অতিসম্প্রতি বন্দরে কার্যক্রম স্থবির ছিল। সব মিলিয়ে একটা অস্থিতিশীল অবস্থা ছিল। এখন সময় এসেছে একটা শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারের দায়িত্ব নেয়ার। আমাদের প্রত্যাশা তারা অন্তত দেশের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করবেন। এ রকম ঘনবসতিপূর্ণ দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি খুব জরুরি। আমাদের প্রত্যাশা সামনে একটা ভালো সময় আসবে।’

দেশের স্বার্থের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের নিজেদের স্বার্থও জড়িত উল্লেখ করে তপন চৌধুরী জানান, তারা কোনোক্রমেই অস্থির পরিস্থিতি হতে পারে এমন ঝুঁকিতে যেতে চান না। তিনি বলেন, ‘বিশেষ করে যারা কারখানা পরিচালনায় রয়েছেন তারা চান দেশটা মসৃণভাবে চলুক। আমি ব্যক্তিগতভাবে এবং সমষ্টিগতভাবে বিশ্বাস করি যে যারা শিল্প-কারখানা চালায়, তারা যে সরকারই আসুক তাদের পূর্ণ সমর্থন করবে। যারাই সরকার গঠন করুক তারা ব্যবসায়ীদের পূর্ণ সমর্থন পাবে। কারণ আমরা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি অ্যাফর্ড করতে পারব না। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটের দিকে দৃষ্টি দিলেই বোঝা যায় যে আমরা খুব একটা ভালো অবস্থায় নেই। কাজেই দেশটা সুন্দরভাবে পরিচালিত হওয়া ছাড়া আর কোনো পথ নেই।’

দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে ২০২২ সাল থেকে। ২০২৪ এর আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার সময় এ হার ছিল ১১ শতাংশের ঘরে। উচ্চ এ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কথা বলে নীতি সুদহার ১০ শতাংশে উন্নীত করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর প্রভাবে ব্যাংক ঋণের সুদহার ঠেকেছে প্রায় ১৫ শতাংশে। যদিও গত দেড় বছরে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকার তেমন সাফল্য দেখাতে পারেনি। সর্বশেষ জানুয়ারিতেও দেশের মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশ। গত অক্টোবরের পর থেকে মূল্যস্ফীতির এ হার ঊর্ধ্বমুখী অবস্থান ধরে রেখেছে। যদিও অন্তর্বর্তী সরকার মূল্যস্ফীতির হার সাড়ে ৬ শতাংশে নামিয়ে আনার কথা বলেছিল। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এ পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে ও অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে নতুন সরকারের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের নিবিড় সম্পর্ক প্রয়োজন।

বিএসআরএমের চেয়ারম্যান আলীহোসেন আকবরআলী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের ম্যান্ডেট ছিল দেশে নির্বাচন দেয়ার। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সেই নির্বাচন এখন আসন্ন। সবচেয়ে বড় কাজ হয়েছে সংস্কার করতে সবগুলো রাজনৈতিক দলগুলোকে ঐকমত্যে নিয়ে আসা। গত দেড় বছরে সরকার কোনো বড় উন্নয়ন প্রকল্পে হাত দেয়নি। কিন্তু অবকাঠামো নিয়ে কাজ করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকে সংস্কার এনেছে। ব্যাংকিংয়ে সংস্কার এনেছে। এখন যে সরকারই আসুক দেশের অর্থনীতি দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত আছে বলে আমি মনে করি। যে সরকারই আসুক তাদের ম্যান্ডেট হলো অগ্রসর হওয়া ও পারফর্ম করা। ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে যেতে একমাত্র পথ হলো পারফর্ম করা। নতুন সরকারকে দুর্নীতিমুক্ত পারফরম্যান্স দেখাতে হবে। পাশাপাশি জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। এরপর যদি ভালো ব্যবসায়ীদের সহায়তা দেয়া হয়, আমার মনে হয় দেশটা দ্রুত এগিয়ে যাবে। আর ব্যক্তি খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ততার মাধ্যমেই রূপান্তরের পথে এগিয়ে যেতে হবে। যে দলই দেশের দায়িত্বে আসবে সবকিছু ছাপিয়ে তাদের পারফর্ম করতে হবে। অন্যথায় ফ্যাসিস্ট আবারো ফিরে আসবে।’

অন্তর্বর্তী সরকারের বিভিন্ন অবস্থানের কারণে অনেক ব্যবসায়ীকে বিরূপ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। নীতি প্রণয়ন উদ্যোগে একই খাতের সংগঠনের মধ্যে বিভেদ তৈরি হয়েছে। সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে তাদের সঙ্গে বেসরকারি খাতের এক ধরনের দূরত্ব সৃষ্টি হয়।

এমন পরিস্থিতিতে অর্থনীতির গতি বাড়াতে টি কে গ্রুপের গ্রুপ ডিরেক্টর মোহাম্মাদ মুস্তাফা হায়দার শান্তিপূর্ণ নির্বাচন ও ক্ষমতা হস্তান্তর প্রত্যাশা করছেন। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশের অংশীজনদের সঙ্গে বসতে হবে। শুধু লোক দেখানো না বরং নিয়মিতভাবে বসতে হবে। অংশীজনদের সঙ্গে এনগেজমেন্ট নিশ্চিত করেই অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে আসতে হবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে আমরা দেখেছি একই খাতের ব্যবসায়ী সংগঠনের মধ্যে বিভেদ দেখা দিয়েছে, এ পরিস্থিতি হতে দেয়া যাবে না। দেখতে হবে যেন সমন্বয়ের মাধ্যমে সবার সহাবস্থান নিশ্চিত করা যায় এবং সেখানে সবাই যেন সমান পারদর্শিতা দেখানোর সুযোগ পায়। এ ধরনের একটা কাঠামো তৈরি করতে হবে। এ ধরনের অনেক চ্যালেঞ্জ আছে। এসব চ্যালেঞ্জ নতুন সরকারকে শুনতে এবং আমলে নিতে হবে। আশা করি শান্তিপূর্ণ নির্বাচন ও শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের পর কাঙ্ক্ষিত এনগেজমেন্টের পথে দ্রুত এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে। দেশের অর্থনীতি যে অবস্থায় আছে, তাতে আমাদের সময়ক্ষেপণের সুযোগ কম।’

দেশে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি থাকায় শিল্প-কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে তা ৩৫-৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। স্থানীয় পর্যায়ে গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি করতে না পারায় অন্তর্বর্তী সরকার ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভর করেছে। যার প্রভাবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এলএনজি আমদানিতেই ব্যয় হয়েছে প্রায় ৪০ হাজার ৭৫২ কোটি টাকা। সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপের কারণে ভর্তুকি কমিয়ে আনা এবং আইনি সংস্কারের চেষ্টা চললেও জ্বালানি খাতের কাঠামোগত সংকট ও বকেয়া পরিশোধ এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।

ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা বেসরকারি খাত থেকে চাচ্ছি সরকারের নীতিসহায়তা। সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল জ্বালানির। এ সংকট মোকাবেলায় কোনো নীতিসহায়তা ছিল না। আশা করছি নতুন সরকার নীতিসহায়তা দেবে, ব্যবসা এবং অবকাঠামো উন্নয়ন—দুই ক্ষেত্রেই গুরুত্ব দেবে। এতে দেশে বিনিয়োগ আসবে, কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে। এটা আমাদের প্রত্যাশা। এ মুহূর্তে নির্বাচন আসন্ন, নতুন সরকার আসবে। তারা নীতি কাঠামো তৈরি করবে। যার আওতায় আমরা একসঙ্গে কাজ করব এবং এগিয়ে যাব।’

বিনিয়োগকারীদের প্রয়োজন জ্বালানি সংকটের টেকসই সমাধান ও সুশাসন। নতুন রাজনৈতিক সরকার ব্যক্তি খাতকে গুরুত্ব দেবেন এমন প্রত্যাশা রেখে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল বলেন, ‘ভবিষ্যতে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের জন্য প্রথম দরকার হলো সুশাসন ও জ্বালানি—এ দুটি এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। লাল ফিতার দৌরাত্ম্য দূর করতে হবে। জ্বালানির অভাবে অনেক শিল্পায়ন আটকে আছে। আর সুশাসন নিশ্চিত হলে ঘুস দুর্নীতি বন্ধ হবে। সরকারের সঙ্গে ব্যক্তি খাতের এনগেজমেন্ট নেই বললেই চলে। আগের সরকার কথা শুনত না, আর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এনগেজমেন্টের আবেদন করে সাড়া পাওয়া যায়নি। তাই নতুন সরকারের সঙ্গে ব্যক্তি খাতের এনগেজমেন্ট নিবিড় হওয়ার প্রত্যাশা রাখি। কারণ ব্যক্তি খাতকে ছাড়া পৃথিবীর কোনো দেশ এখন এগোচ্ছে না।’

ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার টানা দেড় দশকের শাসনামলে দেশের ব্যাংক খাত নজিরবিহীন লুটপাটের শিকার হয়েছে। এ খাত থেকে ৫ লাখ কোটি টাকারও বেশি লুণ্ঠিত হয়েছে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বেশ কয়েকটি নিরীক্ষায় তুলে ধরা হয়। এরই মধ্যে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৩৫ শতাংশে ঠেকেছে। সরকারি-বেসরকারি অর্ধেকের বেশি ব্যাংক এখন অনিয়ম-দুর্নীতির ভারে পর্যুদস্ত। গ্রাহকদের টাকা ফেরত দিতে ব্যর্থ হওয়াসহ সুশাসনের তীব্র ঘাটতির কারণে শরিয়াহভিত্তিক পাঁচটি ব্যাংককে একীভূত করে একটিতে রূপান্তর করার উদ্যোগ চূড়ান্ত করে অন্তর্বর্তী সরকার। ব্যাংক খাত অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় নাজুক পরিস্থিতি পার করার প্রভাব পড়েছে দেশের অর্থনীতিতে।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের (এমটিবি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা আশা করছি, নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিলে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফেরেনি, ব্যাংকিং আইনের সংশোধনও হয়নি। রাজনীতির চেয়েও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে আমলাতন্ত্রকে ঠিক করার দিকে। নতুন সরকার কী নীতি নেবে এখনো তা আমাদের জানা নেই। আবার সরকারের নিজস্ব রিসোর্স খুবই সীমিত, অথচ ব্যয় ক্রমাগত বাড়ছে। পরিস্থিতি কঠিন, তবে সরকারের সদিচ্ছা থাকলে এখনো কিছু করা সম্ভব। এনার্জি খাতে এখনো ১৪ থেকে ১৮ হাজার কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। সরকার এ টাকা পরিশোধে ব্যর্থ হলে রমজানে বিদ্যুৎ সংকট তৈরি হতে পারে, এমনকি গ্রীষ্মেও বিদ্যুৎ পাওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। শুধু ব্যাংক খাত দেখলেই হবে না, সব খাত মিলিয়েই পরিস্থিতি বিবেচনা করতে হবে।’

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দেশে বিনিয়োগ পরিস্থিতি একেবারেই নাজুক পর্যায়ে নেমে গেছে। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির হার নেমে গেছে মাত্র ৬ শতাংশে। গত ১৮ মাস ধরে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ খরার প্রভাবে কর্মসংস্থানের পরিস্থিতি ছিল নাজুক। এ সময়ে তেমন কোনো চাকরির সুযোগ সৃষ্টি না হলেও অনেকে নতুন করে বেকারত্বের মুখে পড়েছে। অনেক শিল্প-কারখানাও এ সময়ে বন্ধ হয়ে গেছে। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধন কমেছে ৫৮ শতাংশ। একই সময়ে প্রকৃত বিদেশী বিনিয়োগ কমেছে ৫৭ শতাংশ। নতুন বিদেশী বিনিয়োগ কমেছে ১৬ শতাংশ।

বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এখন সবাই অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে গেছে। বৈশ্বিক রাজনীতির প্রেক্ষাপট খুব খারাপ দিকে যাচ্ছে। এ অবস্থায় আমাদের রাজনৈতিক সরকার যারা আসবেন তাদের অনেক ভিশনারি বা দূরদৃষ্টিসম্পন্ন হতে হবে। যদিও আগামী সরকারের জন্য বেশকিছু চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হয়েছে। মূল্যস্ফীতি কীভাবে নিয়ন্ত্রণে আসবে বোঝা যাচ্ছে না। আবার ব্যাংক ঋণের সুদ অনেক বেশি। ব্যাংক খাতে স্থায়ী ক্ষতিসাধন করা হয়েছে। সব মিলিয়ে শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। নতুন সরকারের মেকানিজম এমন হতে হবে যেন প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবেলা করা যায়।’

অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি যেভাবে ভেঙে পড়ে সেটি আর আস্থায় ফেরেনি অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে। শ্রমিক অসন্তোষ ও চট্টগ্রাম বন্দরে অস্থিরতা রফতানি বাণিজ্যকে ঝুঁকির মুখে ফেলে। এছাড়া মব ভায়োলেন্স অর্থনীতি ও সামাজিক পরিসরে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফআইসিসিআই) প্রেসিডেন্ট ও বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রূপালী হক চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সবার আগে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি দরকার। পাশাপাশি সামাজিক স্থিতিশীলতা ও শৃঙ্খলা যাতে বজায় থাকে, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। নতুন সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা থাকবে তারা ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ ও নীতিনির্ধারণ করবেন যাতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ে। এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করবেন যাতে সবাই বিনিয়োগ করতে উৎসাহী হয়। ব্যাংক ঋণ সহজলভ্য হয়, সুদের হার সহনীয় হয়। এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে হবে যাতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়।’

নতুন রাজনৈতিক সরকারের কাছে সহায়তা পেলে ব্যবসায়ীরা দেশের অর্থনীতিকে ইতিবাচক ধারায় ফেরাতে পারবেন বলে মনে করেন প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের চেয়ারম্যান ও সিইও আহসান খান চৌধুরী। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রাজনৈতিক দূরত্ব বা মতপার্থক্য যা-ই থাকুক না কেন, ব্যবসা ও অর্থনীতির প্রশ্নে সবার চিন্তাভাবনা এক হওয়া দরকার। বাংলাদেশ এখনো একটি দরিদ্র দেশ। দেশের সামগ্রিক উন্নতি চাইলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। বাস্তবতা হলো রাজনৈতিক বিশ্বাসের কারণে বাংলাদেশে ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাই রাজনৈতিক বিভেদ ভুলে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে ব্যক্তি ও সামষ্টিক কর্মকাণ্ডের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করা জরুরি। বিনিয়োগ, ব্যাংকিং, সামগ্রিক অর্থনৈতিক অবস্থা, অবকাঠামো ও বন্দরের মতো বিষয়ে কোনো ধরনের আপস করা যাবে না। এসব ক্ষেত্রে সরকার থেকে নিরবচ্ছিন্ন সহায়তা পেলে ব্যবসায়ীরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কাজ করতে পারবেন, আর সেখান থেকেই দেশের অর্থনীতি আরো এগিয়ে যাবে।’