রাত পোহালেই ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন। বিজয়ী দল দায়িত্ব নেবে নতুন সরকারের। এরইমধ্যে সরকারি বাসভবন ছাড়তে শুরু করেছেন উপদেষ্টারা। অনেকেই আবার বিশেষ সুবিধাযুক্ত কূটনৈতিক লাল পাসপোর্টও জমা দিয়ে নিয়েছেন সাধারণ সবুজ পাসপোর্ট। সংশ্লিষ্ট অনেকেই বলছেন, যা ছেড়ে দিতে হবে তা আগে করা ভালো। তবে কেউ কেউ আবার এনিয়ে ভিন্নমত পোষণ করেছেন।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, ইতিমধ্যে দু’জন উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার একজন বিশেষ সহকারী তাদের বরাদ্দের সরকারি বাসভবন ছেড়ে দিয়েছেন। তা বুঝেও নিয়েছে গণপূর্ত অধিদপ্তর। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বে থাকা উপদেষ্টাদের মধ্যে গৃহায়ন ও গণপূর্ত, শিল্প এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান গত ৩১শে জানুয়ারি তার গুলশান অ্যাভিনিউ সিইএস (এ) ৫১ সড়কের ৯২ নম্বর সরকারি বাড়িটি ছেড়ে দিয়েছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেয়ার পর এতদিন তিনি ওই বাড়িতেই বসবাস করে আসছিলেন। এ ছাড়া হেয়ার রোডের ৬ নম্বর বাড়িটি ছেড়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত সদ্য সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। অন্যদিকে বাসা ছাড়ার প্রস্তুতি নিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ, রেল, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দারও তার বাসা ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন পুরো দমে। এর আগে বেইলি রোডের মিনিস্টার অ্যাপার্টমেন্টের ৩ নম্বর ভবনের বাসাটি ছেড়ে দেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিশেষ সহকারী খোদা বকশ চৌধুরী। এছাড়াও অন্তর্বর্তী সরকারের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল, ধর্ম উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেন, সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীসহ অনেক উপদেষ্টা যোগাযোগ করেছেন গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে।
সরকারি বাসভবন ছাড়ার পাশাপাশি গত ২০শে জানুয়ারির পর থেকে অন্তর্বর্তী সরকারের একাধিক উপদেষ্টা তাদের নামে ইস্যুকৃত কূটনৈতিক পাসপোর্ট বাতিলের জন্যও আবেদন করেছেন। অনেকেই আবার লাল পাসপোর্ট জমা দিয়ে নিয়েছেন সাধারণ সবুজ পাসপোর্ট। তন্মধ্যে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লে. জে. (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, অর্থ উপদেষ্টা সালেহ উদ্দিন আহমেদ, আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, শিক্ষা উপদেষ্টা চৌধুরী রফিকুল আবরার, তথ্য ও সমপ্রচার এবং পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, অধ্যাপক ডা. বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার, সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী, তার স্ত্রী অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশা অন্যতম। এর বাইরেও অনেকে আবেদন করেছেন। মন্ত্রিপরিষদ তথ্য বলছে, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদের মধ্যে প্রথম আদিলুর রহমান খান ২৫শে জানুয়ারি কূটনৈতিক পাসপোর্ট সমর্পণের অভিপ্রায় জানিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেন। একইদিন তিনি আবেদন জমা দেন সচিবালয়ের অভ্যন্তরে অবস্থিত পাসপোর্ট অফিসে। পরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পাসপোর্ট অধিদপ্তরকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়।
এসব বিষয়ে উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেছেন, আমি আমার সরকারি বাসা ছেড়ে দেয়ার জন্য আবেদনসহ সকল প্রস্তুতি ইতিমধ্যেই সম্পন্ন করে রেখেছি। আশা করছি নির্বাচনের পরপরই বাসা ছেড়ে দিতে পারবো। সবকিছু গোছগাছ করা আছে। তিনি বলেন, নির্বাচনের পর তো বাসা ছেড়েই দিতে হবে। এটাতো আমার নিজের বাসা নয়। সরকারি বাসা। তাই আগেভাগে কাজ করে রাখাই ভালো।
অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, আমি কূটনীতিক পাসপোর্ট জমা দিয়েছি। তবে দেশেই থাকবো, কোথাও যাবো না। তিনি বলেন, আমি আর এমন জরুরি কিছু না। আমি সাধারণত জরুরি মিটিং ছাড়া কোনো মিটিংয়েও যাই না। সেজন্য আমি পাসপোর্ট দিয়ে দিয়েছি। আমার মতো অনেকেই দিয়ে দিচ্ছে। এটাই নিয়ম।
অন্তর্বর্তী সরকারের ধর্ম উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেন বলেন, নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য আমরা প্রস্তুত। ইতিমধ্যেই আমাদের অনেক উপদেষ্টা কূটনৈতিক পাসপোর্ট জমা দিয়েছেন। আমাদের যতটুকু দায়িত্ব ছিল আমরা তা সঠিকভাবে সম্পন্ন করার চেষ্টা করেছি। যেতে যেহেতু হবেই তাই এসব কাজ করে রাখাই ভালো।
এ বিষয়ে সরকারি আবাসন পরিদপ্তরের পরিচালক মো. আসাদুজ্জামান মানবজমিনকে বলেন, গৃহায়ন ও গণপূর্ত, শিল্প এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা তার সরকারি বাসা ছেড়ে দেবেন এ মর্মে আমার কাছে চিঠি দেয়া হয়েছিল। এছাড়াও আরও বেশ কয়েকজন উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারীর তাদের সরকারি বাসা ছাড়ার জন্য নির্ধারিত একচেঞ্জের কাছে আবেদন করেছেন। অনেকেই তাদের বাসা বুঝিয়ে দিচ্ছেন। অনেকে আবার প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন, নির্বাচনের পরে ছেড়ে দিবেন। সেইভাবে বাসাগুলো আবার রঙ-মেরামোত করে যা যা দরকার সব করা হবে যেন আসন্ন নির্বাচনের পর নতুন সরকারের চাহিদামতো আমরা বুঝিয়ে দিতে পারি। তিনি বলেন, মূলত সরকারি এসব বাসভবন বরাদ্দ দিয়ে থাকে আমাদের আবাসন পরিদপ্তর। এজন্য বরাদ্দ দেয়ার প্রক্রিয়ার সবকিছু আবাসন পরিদপ্তর অবহিত থাকে। তবে ছেড়ে দেয়ার বিষয়টি উপদেষ্টা বা বিশেষ সহকারীরা গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলী পর্যায়ে বুঝিয়ে দেন। এজন্য অনেক তথ্য আমাদের কাছে সব সময় থাকে না। একচেঞ্জ আমাদের যা দেয় আমরা সেটুকুই তথ্য পাই। সব তথ্য আবাসন পরিদপ্তরের কাছে থাকে না।
এ বিষয়ে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. নজরুল ইসলাম বলেছেন, উপদেষ্টা বা বিশেষ সহকারীদের মধ্যে অনেকেই বাসা ছেড়ে দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কয়েকজন আনুষ্ঠানিকভাব বাসা ছেড়েও দিয়েছেন।