Image description

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে এক নজিরবিহীন নিরাপত্তার চাদর বিছিয়ে দিয়েছে সরকার। আট লাখের বিশাল নিরাপত্তা বাহিনী, আকাশছোঁয়া প্রস্তুতি আর আধুনিক ‘সুরক্ষা অ্যাপ’— সবমিলিয়ে এক নিশ্ছিদ্র বলয়ের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু গাণিতিক এই প্রস্তুতির আড়ালে লুকিয়ে আছে এক উদ্বেগজনক বাস্তবতা। একদিকে মাঠপর্যায়ে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের বিস্তার, অন্যদিকে লুণ্ঠিত অস্ত্রের রহস্যময় নিখোঁজ থাকা জনমনে বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে।

পুলিশের দাবি তারা ‘ফুল স্ট্রেংথ’ অর্থাৎ পূর্ণ শক্তিতে প্রস্তুত, কিন্তু সাম্প্রতিক মব ভায়োলেন্স মোকাবিলায় বাহিনীর ‘নির্বিকার’ ভূমিকা সেই সক্ষমতাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, ৫ আগস্ট-পরবর্তী মনস্তাত্ত্বিক ট্রমা কাটিয়ে পুলিশ কতটা কার্যকর হবে, তার ওপরই নির্ভর করছে ভোটের দিনের ভাগ্য। এমন এক জটিল সমীকরণের সামনে দাঁড়িয়ে খোদ পুলিশপ্রধানের বয়ানে ফুটে উঠছে এক রূঢ় সত্য— সহিংসতা কি তবে আমাদের নির্বাচনের অমোঘ নিয়তি?

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশে এক নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে। মাঠপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত করা হয়েছে প্রায় ৮ লাখ সদস্যকে। এর মধ্যে সেনাবাহিনী এক লাখ, পুলিশ এক লাখ ৫০ হাজার এবং রেকর্ডসংখ্যক পাঁচ লাখ ৬০ হাজার আনসার-ভিডিপি সদস্য মোতায়েন রয়েছে। এছাড়া বিজিবি, নৌ ও বিমান বাহিনীর সদস্যরাও সমন্বিতভাবে কাজ করছেন। এবারই প্রথম নিরাপত্তা ব্যবস্থা তদারকিতে আনসার বাহিনীর ‘সুরক্ষা অ্যাপ’ এবং সেনাবাহিনীর ‘ভোটকেন্দ্রের আঙিনা পর্যন্ত’ নজরদারির বিশেষ অনুমতি যুক্ত করা হয়েছে
 

মব নিয়ন্ত্রণে পুলিশের ‘অসহায়ত্ব’

গত বছরের ১৮ ডিসেম্বরের রাত দেশের সংবাদমাধ্যম ইতিহাসের এক ভয়াবহ অধ্যায়। ইনকিলাব মঞ্চের শরীফ ওসমান হাদীর মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে পড়লে রাজধানীতে উত্তেজনা দেখা দেয়। এর জেরে শ-দুয়েক মানুষের একটি মব প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার অফিসে ঢুকে ব্যাপক ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে।

 জীবন বাঁচাতে সাংবাদিকরা ছাদে আশ্রয় নিলেও প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, ঘটনাস্থলে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা উপস্থিত থাকলেও তারা ছিল নির্বিকার। হামলাকারীদের ছত্রভঙ্গ করা বা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের এই ‘অসহায়ত্ব’ বা রহস্যময় নীরবতা মবকে আরও বেপরোয়া করে তোলে। ওই ঘটনাটি আসন্ন নির্বাচনে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে সংশয় তৈরি করেছে।

সহিংসতার উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান

ওই ঘটনার রেশ না কাটতেই ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর  নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতার পরিসংখ্যান জনমনে উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। সংস্থাটির তথ্যমতে, তফসিল ঘোষণার পরবর্তী ৩৬ দিনে সারাদেশে অন্তত ১৫ জন রাজনৈতিক কর্মী নিহত হয়েছেন। ২০২৫ সালে ৪০১টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১০২ জন। থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্রের মধ্যে এখনও ১,৩৩৩টি অস্ত্র উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। 

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই লুণ্ঠিত অস্ত্র এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নতুন করে অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়ার উদ্যোগ নির্বাচনের ঝুঁকি কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অস্ত্র উদ্ধার অভিযান

নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশজুড়ে অস্ত্র উদ্ধার অভিযানে নামে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জানায়, গত ২০ জানুয়ারি থেকে ৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মাত্র ১৪ দিনে প্রায় দেড় শতাধিক অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে, যার অধিকাংশই বিদেশি পিস্তল। এখন পর্যন্ত তারা মোট ১০ হাজার ১৫২টি অস্ত্র, ২ লাখ ৯১ হাজার গোলাবারুদ উদ্ধার করেছে এবং ২২ হাজার ২৮২ জন চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও দুষ্কৃতকারীকে আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে।

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) জানায়, ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত সীমান্ত এলাকায় অভিযান চালিয়ে দুটি এসএমজি, ১৬টি রাইফেল, পাঁচটি রিভলবার, ৯০টি পিস্তলসহ বিভিন্ন ক্যাটাগরির মোট ১০২টি অস্ত্র উদ্ধার করেছে। পাশাপাশি উদ্ধার করা হয়েছে দুই হাজার ৩১১ রাউন্ড গোলাবারুদ, ৮১টি ম্যাগাজিন, ১৩টি মর্টার শেল, ২০ দশমিক ০৫ কেজি গান পাউডার, ২৩টি গ্রেনেড, এক হাজার ২৯৫টি ককটেল এবং চারটি মাইন।

নিরাপত্তার বিশাল প্রস্তুতি থাকলেও বড় শঙ্কা হয়ে দাঁড়িয়েছে গত ৫ আগস্টের পর থানা থেকে লুট হওয়া ১৩৩৩টি অস্ত্র, যা এখনও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। একই সঙ্গে বিশেষজ্ঞরা পুলিশের বর্তমান মনস্তাত্ত্বিক অবস্থাকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন। সাম্প্রতিক মব ভায়োলেন্স এবং হামলা মোকাবিলায় পুলিশের ‘নির্বিকার ভূমিকা’ জনমনে আস্থার সংকট তৈরি করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, পুলিশ বাহিনীর এই ‘মনস্তাত্ত্বিক ট্রমা’ ও লুণ্ঠিত অস্ত্রের সম্ভাব্য অপব্যবহার নির্বাচনী দিনগুলোতে বড় ধরনের সহিংসতার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে

ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) জানায়, গত ১৪ ডিসেম্বর ‘ডেভিল হান্ট ফেজ–২’ অপারেশন শুরুর পর থেকে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত ১৬টি বিদেশি পিস্তল, দুটি দেশি পিস্তল, ছয়টি বিদেশি রিভলবার, একটি একনলা বন্দুক, ৩৯০ রাউন্ড গুলি, ১৫৭ রাউন্ড কার্তুজ, ২৬টি ম্যাগাজিন এবং ১৬ দশমিক ৩০০ কেজি বিস্ফোরক উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া পরিত্যক্ত অবস্থায় চারটি বিদেশি রিভলবার, ১১টি বুলেট, ৭৭ রাউন্ড তাজা কার্তুজ, দুটি গুলির খোসা, দুটি ম্যাগাজিন, একটি রিভলবারের কভার, দুটি ছুরি ও একটি চাকুও উদ্ধার করা হয়েছে।

যদিও এখনও লুট হওয়া হাজারের ওপর অস্ত্র উদ্ধার হয়নি। বিভিন্ন মহল থেকে আশঙ্কা করা হচ্ছে যে, আসন্ন নির্বাচনে এসব অস্ত্র ব্যবহার করা হতে পারে। ফলে বাড়তে পারে সহিংসতা।

ঢাকার রাস্তায় বিজিবির বিশেষায়িত ‌'র‍্যাট' বাহিনীর টহল

নজিরবিহীন নিরাপত্তা : একযোগে মাঠে সব বাহিনী

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে নিরাপত্তার এক নিশ্ছিদ্র বলয় গড়ে তোলা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবার সেনা, নৌ, বিমান বাহিনীসহ পুলিশ, বিজিবি ও আনসার সদস্যরা সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালন করছেন।

সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে তিন বাহিনীর শক্ত অবস্থান : নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে ধাপে ধাপে বাড়ানো হয়েছে সেনা সংখ্যা। গত ১০ জানুয়ারি যেখানে ৩৫ হাজার সেনাসদস্য মোতায়েন ছিল, ২০ জানুয়ারি থেকে সেই সংখ্যা এক লাখে উন্নীত করা হয়েছে। এছাড়া মাঠপর্যায়ে সহায়তার জন্য নৌবাহিনীর পাঁচ হাজার এবং বিমান বাহিনীর তিন হাজার ৭৩০ জন সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।

পুলিশের ‘ফুল স্ট্রেংথ’ মোতায়েন ও বিশেষ প্রশিক্ষণ : পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্যমতে, আসন্ন নির্বাচন উপলক্ষ্যে রাজধানীসহ সারাদেশে এক লাখ ৫০ হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। নির্বাচনী ডিউটির জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষ প্রশিক্ষণও ইতোমধ্যে সম্পন্ন করেছে বাহিনীটি। ডিএমপি জানিয়েছে, ঢাকা মহানগরীর ২,১৩১টি ভোটকেন্দ্রের সুরক্ষায় নিয়োজিত থাকবেন ২৫ হাজার পুলিশ সদস্য। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রাজধানীতে চারটি কন্ট্রোল রুম স্থাপন করা হয়েছে। সাধারণ কেন্দ্রে পাহারায় থাকবেন দুজন এবং গুরুত্বপূর্ণ বা ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে তিনজন করে পুলিশ সদস্য থাকবেন। প্রতিটি ভেন্যুতে একাধিক কেন্দ্র থাকলে সেখানে পাঁচজন করে সশস্ত্র সদস্য মোতায়েন থাকবেন।

বিজিবি ও আনসারের ব্যাপক উপস্থিতি : সীমান্ত রক্ষার পাশাপাশি নির্বাচনী নিরাপত্তায় বিজিবি’র ৩৭ হাজারের বেশি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। তবে, জনবলের দিক থেকে এবার সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে আনসার ও ভিডিপি। সারাদেশে সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ ৬০ হাজার আনসার সদস্যকে ভোটের নিরাপত্তায় নিয়োজিত করা হচ্ছে।

আধুনিক প্রযুক্তিতে নজরদারি : ‘সুরক্ষা অ্যাপ’

আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদ জানান, এবারই প্রথম ‘সুরক্ষা অ্যাপস’-এর মাধ্যমে আনসার সদস্যদের কার্যক্রম তদারকি করা হবে।  প্রতিটি কেন্দ্র থেকে দুই-তিনজন সদস্য অ্যাপে নিবন্ধিত থাকবেন। কোনো কেন্দ্রে অনিয়ম বা বিশৃঙ্খলা দেখা দিলে অ্যাপের মাধ্যমে রিপোর্ট করা মাত্রই ‘মোবাইল ট্র্যাকিং ফোর্স’ তাৎক্ষণিকভাবে সেখানে পৌঁছে ব্যবস্থা নেবে।

বাস্তবতার টানাপোড়েন ও বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ

সরকারের পক্ষ থেকে ব্যাপক নিরাপত্তার আশ্বাস দেওয়া হলেও দিনশেষে সহিংসতা কতটা নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে তা নিয়ে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মধ্যে গভীর সংশয় ও আশঙ্কা কাজ করছে। বিশেষ করে দেশের অন্যতম প্রধান আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী— পুলিশের বর্তমান মানসিক অবস্থা ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

নিরাপত্তা ও অপরাধ বিশ্লেষক এবং মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ওমর ফারুক পুলিশের বর্তমান অবস্থাকে ‘চ্যালেঞ্জিং’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তার মতে, ৫ আগস্ট পরবর্তী পরিস্থিতির কারণে পুলিশ বাহিনী বর্তমানে নানা ধরনের ট্রমার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই মনস্তাত্ত্বিক দুর্বলতার কারণে মাঠপর্যায়ে কঠোর অবস্থান নেওয়া তাদের জন্য কঠিন হতে পারে।

‘পুলিশ যদি ঠিকভাবে কার্যকর না হয়, তবে যৌথ বাহিনীর অন্য সদস্যদের ওপর চাপ বাড়বে। সকল বাহিনীর মধ্যে সমন্বিত ও দৃঢ় প্রচেষ্টা না থাকলে সহিংসতা ব্যাপক আকার ধারণ করতে পারে। যদি তারা শক্ত অবস্থান ধরে রাখতে পারে, দৃঢ়তার সঙ্গে যদি মোকাবিলা করতে পারে, তাহলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।’

নির্বাচনের দু-এক দিন আগে বড় ধরনের সহিংসতার ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে— উল্লেখ করে ড. ফারুক বলেন, ‘ভোটের দিন দুপুরে বড় ধরনের সংঘাত হতে পারে। এবারের নির্বাচনে খুনাখুনি, অগ্নিসংযোগ এবং সরকারি স্থাপনায় হামলার ঝুঁকি গতানুগতিক নির্বাচনের চেয়ে বেশি। বিশেষ করে লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধার না হওয়া এই আশঙ্কাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।’

নির্বাচনী সহিংসতা নিয়ে মাঠপর্যায়ে উদ্বেগ থাকলেও ভিন্ন মত পোষণ করেছেন পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মোহাম্মদ নুরুল হুদা। তার মতে, বর্তমান পরিস্থিতি এখনও উদ্বেগজনক বা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়নি। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিলে সহিংসতা বা উত্তেজনার যে চিত্র দেখা যাচ্ছে, তাকে খুব বড় কোনো শঙ্কার কারণ বলে মনে করার অবকাশ নেই। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দেওয়া আগাম তথ্যের ভিত্তিতে যদি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দ্রুত এবং কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে, তবে যেকোনো ধরনের সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

প্রস্তুতির ঘাটতি নেই, সমস্যা রাজনীতিতে : আইজিপির ব্যাখ্যা

নির্বাচনকালীন সহিংসতা প্রতিরোধে গৃহীত পদক্ষেপের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে পুলিশের সর্বোচ্চপর্যায় থেকে বলা হয়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পুলিশ তাদের পূর্ণ শক্তি বা ‘ফুল স্ট্রেংথ’ নিয়ে মাঠে থাকছে। তবে দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, প্রার্থী ও সমর্থকদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব এবং অতীতের সহিংসতার অভিজ্ঞতায় প্রশ্ন উঠছে— পুলিশের এই বিপুল প্রস্তুতি আসলে কতটা কার্যকর হবে?

এ বিষয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘নির্বাচনী প্রস্তুতিতে আমাদের কোনো কমতি নেই। পুলিশসহ বিভিন্ন বাহিনীর প্রায় আট লাখ সদস্যকে এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মোতায়েন করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে পুলিশের এক লাখ ৫০ হাজার সদস্যের বিশেষ নির্বাচনী প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হয়েছে এবং তারা মাঠে নামার জন্য প্রস্তুত।’

নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে আইজিপি কিছুটা সোজাসাপ্টা ও ভিন্নধর্মী মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ‘নির্বাচনী সহিংসতা তো হচ্ছেই। এমন কোনো নির্বাচন কি আছে যেখানে সহিংসতা হয়নি? এটা নিয়ে নতুন করে আশঙ্কার কিছু নেই। সহিংসতাহীন বা মৃত্যুহীন নির্বাচন কি আমাদের জাতির জীবনে কখনও হয়েছে? সংঘাত না হলে বরং মানুষই অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করবে— কী ব্যাপার, মারধর কিছু হলো না?’

সহিংসতার মূল কারণ হিসেবে প্রার্থীদের মধ্যকার পারস্পরিক শত্রুতাকে দায়ী করেন আইজিপি। বলেন, ‘নির্বাচনে যারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, তারা ভবিষ্যতে আইনপ্রণেতা বা এমপি হবেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে প্রার্থীরা তাদের সমর্থকদের শান্ত রাখতে পারছেন না। নেতারা যদি সমর্থকদের নিবৃত্ত করতে না পারেন, তাহলে হানাহানি চলতেই থাকবে।’

‘মানুষ নির্বাচনকে এখনও খেলাধুলার মতো সুলভ মনে করে না, বরং একে শত্রুতা হিসেবে দেখে বিবাদে জড়িয়ে পড়ে। ইতোমধ্যে চারজন প্রাণ হারিয়েছেন— এটি দুঃখজনক।’

আইজিপি প্রশ্ন তোলেন, ‘দুজন পটেনশিয়াল এমপির মধ্যকার বিবাদ কেন পুলিশকে মিটিয়ে দিতে হবে? আমরা কি তাদের অভিভাবক? বরং তারাই তো দেশের অভিভাবক হয়ে আমাদের চালাবেন। আমাদের কাজ চোর, গুন্ডা বা অপরাধী ধরা। কিন্তু রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যকার ব্যক্তিগত সংঘাত থামানো পুলিশের কাজ হওয়া উচিত নয়। তারা নেতা, তাদের মারামারি কেন আমাদের থামাতে হবে— বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে চিন্তা করা প্রয়োজন।’

ঢাকা পোস্ট