Image description

ক্ষমা, মাগফেরাত ও তাকদির নির্ধারণের মহিমান্বিত রাত—পবিত্র শবেবরাত। এই রাতকে কেন্দ্র করে বুধবার আসরের নামাজের পর থেকেই মানুষের ঢল নামে রাজধানীর আজিমপুর কবরস্থানে। গভীর রাত পেরিয়ে ফজরের আগ পর্যন্ত কবরস্থানে ছিল চোখে পড়ার মতো ভিড়।

জীবিত মানুষের পদচারণা আর দোয়ার শব্দে যেন নীরব কবরস্থানও হয়ে উঠেছিল এক জীবন্ত ইবাদতের প্রাঙ্গণ। বারোটার পর থেকে ভোর পর্যন্ত রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা সময় কাটিয়েছেন ইবাদত-বন্দেগি, জিকির, নফল নামাজ, কুরআন তেলাওয়াত ও দোয়া-মুনাজাতে। কেউ ছিলেন মসজিদে, কেউ ঘরের নির্জনতায়, আবার কেউ ছুটে গেছেন প্রিয়জনের শেষ ঠিকানায়— কবরস্থানে।

রাজধানীর বিভিন্ন কবরস্থানে শবেবরাতের রাতে মানুষের উপস্থিতি থাকলেও অন্য সব স্থানকে ছাপিয়ে যায় আজিমপুর কবরস্থান। 

বুধবার (০৪ ফেব্রুয়ারি) সরেজমিনে দেখা গেছে, সন্ধ্যা থেকে ভোর পর্যন্ত কবরস্থানের তিনটি গেট দিয়ে একযোগে মানুষের ঢল নামতে শুরু করে। সময় যত গড়িয়েছে, ভিড় ততই বেড়েছে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মানুষ স্বজনদের কবর জিয়ারত করতে এখানে ভিড় করেন। কেউ পরিবারের সবাইকে নিয়ে, কেউ সন্তানদের হাতে ধরে, আবার কেউ একাই নীরবে দাঁড়িয়ে প্রিয়জনের কবরের পাশে দোয়া করেছেন।

কবরস্থানের ভেতরে ঢুকতেই মনে হয়—এটি কেবল একটি কবরস্থান নয়, যেন আখিরাত স্মরণের এক জীবন্ত পাঠশালা। কোথাও দাঁড়িয়ে কেউ কুরআন তেলাওয়াত করছেন, কোথাও নিঃশব্দে হাত তুলে দোয়া করছেন। অনেককে আবার কবরের পাশে বসে অশ্রুসিক্ত হতে দেখা গেছে। কেউ বাবার কবর জড়িয়ে ধরে কাঁদছেন, কেউ মায়ের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে দোয়া করছেন— ‘হে আল্লাহ! তুমি তাকে ক্ষমা করে দাও।’ এই দৃশ্যগুলো যেন মনে করিয়ে দিচ্ছিল—জীবন ক্ষণস্থায়ী, মৃত্যু অবধারিত।

শবেবরাতকে ঘিরে আজিমপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে কবরস্থান পর্যন্ত পুরো সড়কজুড়ে ছিল ভিন্ন এক চিত্র। ঢাকা শহরসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা সুবিধাবঞ্চিত, অসহায়, প্রতিবন্ধী মানুষ ও ভিক্ষুকরা এখানে সারিসারি লাইনে বসে ছিলেন। কেউ শিশু সন্তানকে কোলে নিয়ে, কেউ ছেলে-মেয়ে, কেউ স্বামী-স্ত্রী, কেউ বাবা-মা নিয়ে— সবাই অপেক্ষায় ছিলেন কবর জিয়ারত শেষে আগত মানুষের দান-খয়রাতের আশায়। বহু বছরের পুরোনো রীতি অনুযায়ী, এই রাতে কবর জিয়ারতে আসা মানুষদের দানের আশায় এখানে জড়ো হন তারা।

লালবাগ শেখ সাহেব বাজার থেকে কবর জিয়ারত করতে এসেছেন মো. ইসমাইল। সঙ্গে ছিলেন তার ছোট ছেলে মো. আরাফাত হোসেন আবির। তিনি বলেন,‘দাদা-দাদী, ভাতিজা ও সন্তানের জন্য দোয়া করতে এসেছি। প্রতি বছরই শবেবরাতে এখানে আসি।’

মগবাজার থেকে এসেছেন রেজাউল করিম রানা। পাঁচ বছর পর চলতি মাসের ২৫ তারিখে দুবাই থেকে দেশে ফিরেছেন তিনি। সঙ্গে ছিলেন তার চাচাতো ভাই মো. রুহুল আমিন। তারা জানান, ‘চাচা ও দাদির কবর জিয়ারত করতে এসেছি। ছোটবেলার স্মৃতি মনে পড়ে গেল। একসময় চাচার হাত ধরে এখানে আসতাম। আজ তারা নেই, আমরা আছি। একদিন সবাইকেই এই দুনিয়া ছাড়তে হবে।’

হাজারীবাগ থেকে দুই সন্তানকে নিয়ে এসেছেন মো. হারুনুর রশিদ। চোখে তখনও জল। তিনি বলেন, ‘বাবা-মায়ের কবর জিয়ারত করতে এসেছি। প্রতি বছর সন্তানদের নিয়েই আসি, যেন তারা মৃত্যুর বাস্তবতা বুঝতে শেখে।’

লালবাগ নবাবগঞ্জ বড় মসজিদ এলাকা থেকে মো. ইমরান তার দুই সন্তানকে নিয়ে বাবা, ফুপু, চাচা ও জ্যাঠার কবর জিয়ারত করেছেন। তিনি বলেন, ‘বাবা মারা গেছেন ১০ বছর আগে, ফুপু তিন বছর আগে, আর জ্যাঠা ১৫ বছর আগে। প্রতি বছর শবেবরাতে আমি সন্তানদের সঙ্গে এখানে আসি, প্রিয়জনদের কবর জিয়ারত করতে। আজকের এই মহিমান্বিত রাতে আল্লাহ যেন সারা জাহানের মানুষের সব পাপ ক্ষমা করে দেন এবং সবাইকে জান্নাতের সঙ্গ উপহার দেন— এই দোয়া করি।’

লালবাগ থেকে মো. স্বপন হোসেন বলেন, ‘বাবা মারা গেছেন ১৩ বছর আগে। আজ কবরে এসে বাবার সঙ্গে কাটানো দিনগুলোর কথা খুব মনে পড়ছে। ছোটবেলায় বাবা আমাকে কবর জিয়ারত করতে নিয়ে আসতেন, আর আজ আমি এসেছি বাবার কবর জিয়ারত করতে।’

লালবাগ থেকে আসা মো. ওমর ফারুক বলেন, ‘শবেবরাত শুধু দোয়ার রাত নয়, এটি দান-সদকার রাতও। আমরা চেষ্টা করেছি যতটুকু পারি দান করতে।’ তিনি দাদার কবর জিয়ারত করতে এসেছেন।

চকবাজার থেকে দাদা-দাদী ও অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনের কবর জিয়ারত করতে আসা মো. আবির আহমেদ আবির বলেন, ‘শবেবরাত মানেই আমার কাছে আত্মশুদ্ধির রাত। আজ দাদা-দাদীসহ প্রিয় মানুষদের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে খুব গভীরভাবে অনুভব করছি— আমরা সবাই সাময়িক, স্থায়ী কেবল আখিরাত। ছোটবেলা থেকে পরিবার নিয়ে এই কবরস্থানে আসার একটা অভ্যাস ছিল। আজ অনেকেই নেই, কিন্তু তাদের স্মৃতি আর দোয়ার বন্ধন রয়ে গেছে। আল্লাহর কাছে দোয়া করেছি, তিনি যেন তাদের সবাইকে মাফ করে দেন এবং আমাদের জীবিত অবস্থায় সঠিক পথে চলার তৌফিক দেন।’

শবেবরাত উপলক্ষ্যে আজিমপুরসহ রাজধানীর বিভিন্ন কবরস্থানে নেওয়া হয় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।

আজিমপুর কবরস্থানের মোহরার মো. রবিউল ইসলাম জানান, ‘আজকের রাত দোয়া কবুলের রাত। তাই ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ তাদের কবরস্থ আত্মীয়-স্বজনের মাগফেরাত কামনায় এসেছেন। গত বছরের তুলনায় এবার ভিড় অনেক বেশি। এই কবরস্থান শুধু মৃতদের বিশ্রামের স্থান নয়, এটি জীবিতদের জন্যও এক অনন্য শিক্ষা। মানুষ এখানে এসে জীবনের ক্ষণস্থায়ীতা, মৃত্যুর অনিবার্যতা এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনার গুরুত্ব নতুনভাবে উপলব্ধি করে। শবেবরাতের এই রাত দোয়া, কান্না, স্মৃতি আর দানের মিলনে যেন সবাইকে মনে করিয়ে দেয়— জীবিত অবস্থাতেই আল্লাহর কাছে ফিরে যাওয়া, গুনাহ মাফের জন্য চেষ্টা করা সবচেয়ে বড় তৌফিক।

ইবাদত, কান্না, দান আর দোয়ার এই রাত আজিমপুর কবরস্থানে যেন বারবার মনে করিয়ে দেয় এক চিরন্তন সত্য— জীবন ক্ষণস্থায়ী, মৃত্যু অবধারিত। আর শবেবরাত সেই রাত, যখন জীবিতরা দাঁড়িয়ে থাকে মৃতদের পাশে, দুই হাত তুলে বলে— ‘হে আল্লাহ! আমাদেরকেও ক্ষমা করো, যেদিন আমরাও এ মাটির নিচে চলে যাব।’