Image description

জাতীয় নির্বাচন ঘিরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বিপুলসংখ্যক যানবাহনের প্রয়োজন হওয়ায় সাম্প্রতিক সময়ে যানবাহন অধিগ্রহণ বা রিকুইজিশনের (অস্থায়ীভাবে নিয়ে ব্যবহার) ঘটনা বেড়েছে। তবে এতে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন অনেক ব্যক্তিগত যানবাহনের মালিক।

বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী, জনস্বার্থে – জরুরি প্রয়োজনে বা দায়িত্ব পালনের জন্য – বাস, মাইক্রোবাস, লেগুনা ও পিক আপ ট্রাকের মতো যানবাহন রিকুইজিশনের ক্ষমতা পুলিশ বা প্রশাসনের রয়েছে।

কিন্তু ২০২২ সালে হাইকোর্টের দেওয়া এক রায়ের পর ব্যক্তিমালিকানাধীন গাড়ি, ট্যাক্সি ও সিএনজিচালিত অটোরিকশা সাধারণত জব্দ বা রিকুইজিশন করার নিয়ম নেই।

এছাড়া, আসন্ন ১২ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে সাপ্তাহিক ও সরকার-ঘোষিত সাধারণ ছুটি মিলিয়ে মোট ছুটির সংখ্যা দাঁড়াচ্ছে চারদিন।

এই সময়ে স্বাভাবিকভাবেই বিপুল সংখ্যক সরকারি গাড়ি ফাঁকা থাকার কথা। তারপরও পুলিশ কেন গণপরিবহণ থেকে শুরু করে ব্যক্তি মালিকানাধীন গাড়ির রিকুইজিশন চলছে, নির্বাচনের দেড় সপ্তাহ আগে সেই প্রশ্নও তুলছেন অনেকে।

ছবিতে এক পুলিশ ট্রাফিক কন্ট্রোল করছে

ছবির উৎস,Getty Images

ছবির ক্যাপশান,রিকুইজিশন এড়াতে অনেকে বাসা থেকে গাড়ি বের-ই করছেন না

গাড়ি রিকুইজিশন নিয়ে আতঙ্ক, প্রতিবাদ, অভিযোগ

গাড়ি রিকুইজিশন নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকেই প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। তারা তাদের ব্যক্তিগত ফেসবুক প্রোফাইলে কিংবা বিভিন্ন গ্রুপে এ নিয়ে মতামত লিখছেন।

ওয়ালিদ শ্রাবণ নামক এক ফেসবুক ব্যবহারকারী সম্প্রতি ফেসবুকে লিখেছেন, "আমার একমাত্র পিকআপটা আসন্ন নির্বাচনে রিকুইজিশন দিয়েছে অনির্দিষ্টকালের জন্য। এটা কোন আইন? রাষ্ট্রের কাজে এক-দুই দিনের জন্য গাড়ি নিতে পারেন। যেই গাড়ির উপর ভিত্তি করে ২০ থেকে ২৫ জন মানুষের রুটিরুজি হয়, সেই গাড়ি আপনার অনির্দিষ্টকালের জন্য নেন কোন আইনে?"

আরেকজন একটি ফেসবুক গ্রুপে তার ব্যক্তিমালিকানাধীন নোয়াহ গাড়ি রিকুইজিশন করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন। তিনি লেখেন, ''জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে গাড়িটি পিরোজপুর থেকে খুলনায় গেলে খুলনা হাইওয়ে পুলিশ সেই গাড়ি আটকায়। তারপর গাড়ির কাজগপত্র সহ ড্রাইভারের লাইসেন্স জমা নিয়ে ৩১শে জানুয়ারি থেকে নির্বাচন পর্যন্ত গাড়ির রিকুইজিশন দেয়।''

ওই ব্যক্তি লিখেছেন, ১২-১৩ দিন গাড়ি দেওয়া তার পক্ষে সম্ভব না এবং তার ড্রাইভারেরও এতদিন নির্বাচনের সময়ে গাড়ি চালানো সম্ভব না। কারণ হিসবে তিনি প্রশ্ন করেছেন, এতদিন গাড়ি কোথায় রাখবে? কোথায় ডিউটি করাবে? ড্রাইভার কোথায় থাকবে বা কী খাবে?

ফেসবুক ঘাঁটলে গাড়ির রিকুইজিশন নিয়ে এরকম অহরহ পোস্ট খুঁজে পাওয়া যায়।

কেউ কেউ দাবি জানিয়েছেন, এক দিনের জন্য হোক বা ১০ দিনের জন্য হোক, সরকার যদি গাড়ি রিকুইজিশন করে, তাহলে মালিক গাড়ির ক্ষতিপূরণ পাওয়ার অধিকার রাখেন।

২০১৪ সালে যাত্রা শুরু করা ফেসবুকভিত্তিক 'ট্রাফিক অ্যালার্ট' গ্রুপে ঢাকার যানজট থেকে শুরু করে বিআরটিএতে গাড়ির কাগজপত্র প্রক্রিয়াকরণ, নানা বিষয়ে তথ্য আদান-প্রদান হয়।

ওই গ্রুপে এখন 'কার রিকুইজিশন' লিখে সার্চ করলেই সাম্প্রতিক সময়ের অনেক পোস্ট সামনে আসে। দেখা যায়, গ্রুপের সদস্যরা একে অপরকে এ নিয়ে সতর্কবার্তা দিচ্ছেন। কেউ জানতে চাচ্ছেন, ঢাকার কোন সড়ক দিয়ে চলাচল করলে গাড়ি রিকুইজিশন এড়ানো যাবে।

একজন লিখেছেন, শাহবাগের হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড় দিয়ে চলার সময় সাবধান। ওই পোস্টে অনেকে মন্তব্য করেছেন, রামপুরা, মহাখালী কিংবা বাংলামোটরেরও একই অবস্থা।

ওই গ্রুপেই আজ নাবহান জামান নামক একজন ফেসবুক ব্যবহারকারী জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী প্রাইভেট কারও কি অধিগ্রহণ করা যায়?

একজন ফেসবুক ব্যবহারকারী জানতে চেয়েছেন, ব্যক্তিগত গাড়ি কি অধিগ্রহণ করা যায়?
ছবির ক্যাপশান,একজন ফেসবুক ব্যবহারকারী জানতে চেয়েছেন, ব্যক্তিগত গাড়ি কি অধিগ্রহণ করা যায়?
গাড়ি রিকুইজিশন নিয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি'র সংবাদ সম্মেলন
ছবির ক্যাপশান,গাড়ি রিকুইজিশন নিয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি'র সংবাদ সম্মেলন

যদিও রেন্ট-এ-কার কোম্পানি থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, পুলিশ প্রাইভেট কার নিচ্ছে না।

ঢাকার একটি কোম্পানির কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিবিসি বাংলাকে বলেন, সম্প্রতি পুলিশ তাদের দু'টো নোয়াহ গাড়ি পাঁচ দিনের জন্য রিকুইজিশনে নিলেও প্রাইভেট কার নেয়নি।

তবে পুলিশ যে মালিক ও চালকদের অনুমতির তোয়াক্কা না করে গাড়িগুলো একপ্রকার জোর করে রিকুইজিশনে নিচ্ছে, সেটি উল্লেখ করেন এই ব্যক্তি।

তার ভাষ্যে, "আমার গাড়ি আট থেকে ১২ তারিখের জন্য নিছে। আর নিছে জোর করে। তারা ডিরেক্ট আটকায়, কিছু বলার সুযোগ নাই। ধরেই রিকুইজিশন স্লিপ হাতে ধরায়ে দেয়।"

তিনি অভিযোগ করেন, এ সময় ড্রাইভারকে খাওয়া-থাকার সুযোগ হয়তো দিবে সরকার এবং জ্বালানি খরচও দিবে। কিন্তু মালিক হিসেবে তারা কিছুই পাবে না।

প্রায় একই বক্তব্য রিমন এন্টারপ্রাইজের মালিক রিফাত হোসেন রিমনেরও। তিনি বলছিলেন, এ পর্যন্ত গাজীপুর থেকে তার সাতটি নোয়াহ ও হায়েস গাড়ি রিকুইজিশনে নিয়েছে পুলিশ।

জোরপূর্বক গাড়ি নিচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলছিলেন, "তাদের সব খরচ দেওয়ার কথা। কিন্তু ড্রাইভারদেরকে থাকার জায়গাই দেয় না। হয়তো ব্যারাকে কোনো চকিতে থাকতে দেয়।"

এসময় তিনি আরও উল্লেখ করেন যে সারাদেশে দুই থেকে আড়াই লাখ গাড়ি আছে। "সরকারের লক্ষ্য দেড় লাখের মতো। আর এবারের নির্বাচনে রিকুইজিশনের হার অনেক বেশি।"

এদিকে, এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতিও।

গত ৩১শে জানুয়ারি তারা এক সংবাদ সম্মেলন ডেকেছে, যেখানে সংগঠনের মহাসচিব মো. সাইফুল আলম জানিয়েছেন, নির্বাচন উপলক্ষে ইতোমধ্যে প্রায় ২০ হাজার দূরপাল্লার যানবাহন রিকুইজিশন করেছে ট্রাফিক পুলিশ এবং এ সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

তাদের অভিযোগ, রিকুইজিশনকৃত গাড়ির ভাড়া, স্টাফদের বেতন এবং জ্বালানি খরচ কোথা থেকে আসবে, সে বিষয়ে তাদেরকে কোনো সুস্পষ্ট তথ্য জানানো হয়নি।

"শহরতলীর একেকটি গাড়ি সাতদিনে অন্তত ৩৫ হাজার টাকা ক্ষতির মুখোমুখি হবে। আগে আমাদেরকে বলা হতো, বাসপ্রতি এই টাকা মালিক পাবে, এই টাকা স্টাফ পাবে, আর তেল সরকারিভাবে দিবে। কিন্তু এবার এই নিয়মের ব্যত্যয় দেখা যাচ্ছে," যোগ করেন তিনি।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) অধ্যাদেশ-১৯৭৬, ১০৩ ক (১) ধারা
ছবির ক্যাপশান,ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) অধ্যাদেশ-১৯৭৬, ১০৩ ক (১) ধারা

গাড়ি রিকুইজিশন: কী, কখন কোন প্রক্রিয়ায় করা হয়

গাড়ি রিকুইজিশন মানে হলো রাষ্ট্রীয় জরুরি প্রয়োজনে বা জনস্বার্থে পুলিশ বা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ব্যক্তিগত বা বাণিজ্যিক গাড়ি সাময়িকভাবে অধিগ্রহণ করার আইনি প্রক্রিয়া।

সাধারণত নির্বাচন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ বা বিশেষ রাষ্ট্রীয় সফরের সময় এটি করা হয়।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) অধ্যাদেশ – ১৯৭৬, ১০৩ ক (১) ধারা অনুযায়ী, গাড়ি রিকুইজিশন করার ক্ষমতা ডিএমপি কমিশনারের। তার লিখিত আদেশবলে এটি করা যায়।

তবে এক্ষেত্রে পুলিশকে কিছু নিয়ম অনুসরণ করার কথা উল্লেখ আছে আইনে।

সেখানে বলা আছে, সর্বোচ্চ সাত দিনের জন্য যানবাহন রিকুইজিশন করা যেতে পারে এবং এই ধারার অধীনে রিকুইজিশন করা যানবাহনের মালিককে নির্ধারিত হারে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

কিন্তু এই রিকুইজিশন প্রক্রিয়া নিয়ে বরাবরই যানবাহনের মালিকদের অভিযোগ ছিল।

এখন যেমন কথা উঠছে যে গাড়ি রিকুইজিশনের পর সরকার তার ক্ষতিপূরণ দেবে কিনা কিংবা পুলিশ তার ক্ষমতার বাইরে যাচ্ছে, নির্বাচনের আগে আগে বরাবরই এগুলো শোনা যায়।

অধ্যাদেশের ওই ধারা অপব্যবহারের অভিযোগের কারণেই ২০১০ সালে হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ (এইচআরপিবি) হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করে।

২০১৯ সালের ৩১শে জুলাই এ নিয়ে হাইকোর্টের একটি আদেশে বলা হয়– পুলিশ প্রাইভেটকার, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও ট্যাক্সি রিকুইজিশন করতে পারবে না। এরপর ২০২২ সালের আটই জুন এক পূর্ণাঙ্গ রায়ে হাইকোর্ট গাড়ি রিকুইজিশনের ক্ষেত্রে ১১টি নির্দেশনা দেয়।

ভোটের সরঞ্জাম বহনের জন্য নির্বাচনের সময় বিপুল সংখ্যক যানবাহন প্রয়োজন।

ছবির উৎস,Getty Images

ছবির ক্যাপশান,ভোটের সরঞ্জাম বহনের জন্য নির্বাচনের সময় বিপুল সংখ্যক যানবাহন প্রয়োজন

গাড়ি রিকুইজিশনের বিষয়ে হাইকোর্টের সেই নির্দেশনায় বলা আছে —

  • যে কোনো গাড়ির রিকুইজিশন অবশ্যই জনস্বার্থে করতে হবে।
  • রিকুইজিশন করা গাড়ি কোনা কর্মকর্তা ব্যক্তিগত বা পরিবারের কাজে ব্যবহার করতে পারবেন না।
  • কোনো ব্যক্তি, কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন কোনো যানবাহন পূর্ব নোটিশ ছাড়াই রিকুইজিশন করা যাবে না।
  • প্রত্যেক থানায় রিকুইজিশন করা গাড়ির তালিকা সংরক্ষণ করতে হবে।
  • রিকুইজিশন করা গাড়ির কোনো ক্ষতি হলে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। গাড়ির পেট্রোল খরচ বহন করতে হবে। চালকদের খাবার খরচও দিতে হবে।
  • ছয় মাসের মধ্যে একই গাড়ি দুইবার রিকুইজিশন করা যাবে না।
  • নারী, শিশু, রোগী বহনকারী গাড়ি রিকুইজিশন করা যাবে না।
  • এসব নির্দেশনা পালনে পুলিশ কমিশনার কর্তৃক একটি সার্কুলার জারি করে তা সব পুলিশ কর্মকর্তার কাছে পাঠাতে হবে।
  • কোনো গাড়ি একনাগাড়ে সাত দিনের বেশি রিকুইজিশনে রাখা যাবে না। রিকুইজিশন অর্ডারে নির্দিষ্ট সময় উল্লেখ থাকতে হবে।
  • রিকুইজিশন করা গাড়ি ছেড়ে দেওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
  • প্রাইভেটকার, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও ট্যাক্সি রিকুইজিশন করা যাবে না।

এদিকে, ২০১০ সালে আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেছিলেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ।

এ প্রসঙ্গে তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, পুলিশ প্রাইভেট কার রিকুইজিশনে রাখতে পারবে না এবং যদি কেউ নোয়াহ'র মতো বড় গাড়ি রাষ্ট্রকে দিতে না চান, সেক্ষেত্রে পুলিশ তাকে জোর করতে পারবে না। বড়জোর সুনির্দিষ্ট কারণ দেখিয়ে বোঝাতে পারে।

রিকুইজিশনের গাড়ি নির্বাচনী প্রচারণা বা ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করতে পারবে না। যে উদ্দেশ্যে গাড়ি নেওয়া হয়েছে, শুধুমাত্র সেই উদ্দেশ্যেই ব্যবহার করতে হবে। রিকুইজিশনের গাড়িকে সকল ক্ষতিপূরণ-খরচও রাষ্ট্রকে বহন করতে হবে বলেও তিনি জানান।

পুলিশ হেডকোয়াটার্সের মিডিয়া এন্ড পাবলিক রিলেশনস-এর এআইজি এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন এ বিষয়ে বলেন, সরকারি গাড়ির স্বল্পতার কারণে নির্বাচন কমিশনের দেওয়া নির্দিষ্ট চাহিদা অনুযায়ী নির্বাচনী কাজের জন্যই এখন গাড়ির রিকুইজিশন করা হচ্ছে মূলত।

"নির্বাচনের সময় প্রায় ১৬ লাখ লোক কাজ করবে। কমিশন হয়তো এই গাড়িগুলোর কিছু দেবে বিজিবিকে, কিছু দিবে সেনাবাহিনীকে, কিছু ব্যবহার করবে অন্যান্য কাজে।"