Image description

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, জনমনে ততই বাড়ছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে চারদিক। বাড়ছে নির্বাচনি সহিংসতা। তফসিল ঘোষণার পরদিন রাজধানীতে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান বিন হাদি হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই নির্বাচনি মাঠ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ১১ ডিসেম্বরে নির্বাচনি তফসিল ঘোষণার পর এ পর্যন্ত নির্বাচনি সহিংসতায় চার জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৫ শতাধিক। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলোও বলছে—দিন যত যাচ্ছে, রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়ছে। দুর্বল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দৃশ্যমান হচ্ছে। ২১ জানুয়ারি নির্বাচনি প্রচারণা শুরুর পরই নিহত হয়েছেন ৪ জন। এ সময়ে আহত হয়েছেন ৪১৪ জন। সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে ৫১টি।

বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, নির্বাচনি প্রচারণা শুরুর পর ময়মনসিংহের ধোবাউড়ার এরশাদ বাজারে স্বতন্ত্র প্রার্থী সালমান ওমর রুবেলের সমর্থক নজরুল ইসলাম নির্বাচনি সহিংসতায় নিহত হয়েছেন। শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি রেজাউল করিমকে পিটিয়ে ও ইট দিয়ে থেঁতলে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। এছাড়া কিশোরগঞ্জ-২ আসনের কটিয়াদি উপজেলার আচমিতা ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক ইউপি সদস্য মো. কামাল উদ্দিন ও নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের কাঞ্চনে আজাহর নামে এক স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা নিহত হয়েছেন।

রাজনৈতিক সহিংসতা ছাড়াও ছিনতাইয়ের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ শঙ্কিত। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় দিনে কিংবা রাতে নির্জন এলাকায় চলাচলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অনেকে। গণপরিবহন, নির্জন সড়ক এমনকি ব্যস্ত এলাকাতেও ছিনতাইয়ের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। ব্যবসায়ী ও কর্মজীবীরা বলছেন, সন্ধ্যার পর নিরাপত্তা ঝুঁকি আগের চেয়ে অনেক বেশি মনে হচ্ছে। নির্বাচনকে সামনে রেখে বিভিন্ন দেশের দূতাবাস থেকে তাদের নাগরিকদের সতর্কতার সঙ্গে চলাচলের অনুরোধ জানিয়েছে।

পুলিশ সদর দফতরের তথ্য অনুযায়ী, ১১ ডিসেম্বর তফসিল ঘোষণার পর ১২ ডিসেম্বর থেকে ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত সারা দেশে ১৪৪টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ৫৫টি সংঘর্ষ, ১১টি ভীতি প্রদর্শন ও আক্রমণাত্মক আচরণ, ৬টি প্রার্থীর ওপর আক্রমণ, ২টি ঘটনায় অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার, ১৭টি প্রচারকাজে বাধা, ৮টি নির্বাচনি অফিসে হামলা ও অগ্নিসংযোগ ছাড়াও বিভিন্ন কারণে ২৪টি ঘটনা ঘটেছে।

মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) প্রতিবেদন অনুযায়ী, গেলো ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসের তুলনামূলক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, জানুয়ারি মাসে দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি আরও জটিল, সহিংস ও উদ্বেগজনক রূপ ধারণ করেছে। সব প্রধান মানবাধিকার সূচকেই জানুয়ারি মাসে ঘটনার সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে—যা রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্বল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির ধারাবাহিক প্রভাবকে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, নির্বাচনি সহিংসতার ৬৪টি ঘটনার মধ্যে ৩৩টি বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা। এছাড়া বিএনপির অন্তর্দ্বন্দ্বে ১৩টি, বিএনপি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে ৯টি সংঘর্ষ, গণঅধিকার পরিষদ ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যে একটি এবং বিএনপি ও এনসিপির মধ্যে একটি ঘটনা ঘটেছে।

আইন ও সালিশকেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি মাসে কমপক্ষে ৭৫টি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় কমপক্ষে ১১ জন নিহত হয়েছেন এবং কমপক্ষে ৬১৬ জন আহত হয়েছেন। নির্বাচনি প্রচারণা শুরুর পর ২১ জানুয়ারি থেকে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত কমপক্ষে ৫১টি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় কমপক্ষে ৪ জন নিহত হয়েছে এবং আহত হয়েছে ৪১৪ জন।

গত বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) বিকালে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস অ্যাকাডেমিতে নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব জানিয়েছেন, তফসিল ঘোষণার পর এখন পর্যন্ত ৪ জনের প্রাণহানি হয়েছে। তিনি বলেন, এসব ঘটনা অনাকাঙ্ক্ষিত হলেও নির্বাচনের পরিবেশ বিগত সরকারের আমলের চেয়ে অনেক ভালো।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. মো. তৌহিদুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজি নিয়ে সহিংসতা বাড়ছে। তবে প্রার্থীদের মধ্যে মূল্যবোধের অভাব ও প্রতিদ্বন্দ্বীকে প্রতিযোগী হিসেবে না দেখার কারণই নির্বাচনি সহিংসতা বাড়ছে। এসব ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দ্রুত ও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। সংঘাতপ্রবণ এলাকাগুলোতে সমানভাবে আইন প্রয়োগ করতে হবে—নতুবা পরিস্থিতির আরও অবনতি হবে।’’

পুলিশ সদর দফতরের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) খন্দকার রফিকুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করাসহ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য পুলিশ সার্বক্ষণিক সতর্ক রয়েছে। দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে জনমনে আস্থা ও স্বস্তি আনতে কার্যক্রম বাড়ানো হয়েছে। নির্বাচনে নাশকতা সৃষ্টি করতে পারে এমন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীগুলোর ওপর নজরদারি জোরদার ও অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘‘ইতোমধ্যে অনেক অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে, যার মধ্যে থানা থেকে লুণ্ঠিত অস্ত্রও রয়েছে।’’

খন্দকার রফিকুল ইসলাম আরও বলেন, ‘‘এবারের নির্বাচনে ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রগুলোতে বডিওর্ন ক্যামেরাসহ পুলিশ নিয়োজিত থাকবে, যাতে কোনও ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। পুলিশ সদর দফতর থেকে নির্বাচনি সব কার্যক্রম মনিটরিং করা হবে। একইসঙ্গে পুলিশের সব ইউনিটকে দাফতরিক কাজ কমিয়ে মাঠে সময় দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’’