এবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট ৭৮ জন নারী বিভিন্ন দলের ও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাঁদের অনেকেই প্রচারে নেমে ইতিমধ্যে সাধারণ মানুষের নজর কেড়েছেন। সানজিদা ইসলাম, তাসনিম জারা, রুমিন ফারহানা, মনীষা চক্রবর্তী, সাবিরা সুলতানা ও জুঁই চাকমাসহ আরও অনেক নারী প্রার্থী ভোটের মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন দিন-রাত। যাচ্ছেন ভোটারদের দুয়ারে দুয়ারে।
গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবার নিয়ে গড়ে তোলা ‘মায়ের ডাক’ সংগঠনের সংগঠক সানজিদা ইসলাম। তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন রাজধানীর মিরপুর, শাহ আলী ও দারুস সালাম এলাকা নিয়ে গঠিত ঢাকা-১৪ আসনে। বিএনপির এই প্রার্থী নারী-পুরুষ সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলছেন।
গতকাল রোববার মিরপুরের উত্তর বিশিল, শাহ আলীর তুরাগ সিটি, কুসুমবাগ ও শাইনপুকুর এলাকায় গণসংযোগ করেন সানজিদা। তাঁর অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর মীর আহমাদ বিন কাসেম আরমান। তিনি নিজেও গুমের শিকার হয়েছিলেন। এখানে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়াইয়ে নেমেছেন এ এলাকার বিএনপিদলীয় সাবেক সংসদ সদস্য এস এ খালেকের ছেলে সৈয়দ আবু বকর সিদ্দিক সাজু। তবে তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করেছে বিএনপি। এখানে ত্রিমুখী লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। রাজধানীর এ আসন থেকে এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ১২ জন প্রার্থী।
সানজিদা ইসলাম, তাসনিম জারা, রুমিন ফারহানা, মনীষা চক্রবর্তী, সাবিরা সুলতানা ও জুঁই চাকমাসহ আরও অনেক নারী প্রার্থী ভোটের মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন দিন-রাত। যাচ্ছেন ভোটারদের দুয়ারে দুয়ারে।
জারার ‘ক্লিন ক্যাম্পেইন’
ঢাকা-৯ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন পরিচিত মুখ, আলোচিত চিকিৎসক তাসনিম জারা। যিনি এক সময় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) অন্যতম নেতা ছিলেন, পরে পদত্যাগ করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচনে মাঠে নামেন। গতকাল তিনি ঢাকার সবুজবাগের বাগপাড়া এলাকায় প্রচারণা চালিয়েছেন ফুটবল প্রতীক নিয়ে।
তাসনিম জারা তাঁর প্রচারণায় বলেন, ‘আমরা সচেতনভাবে একটি ক্লিন ক্যাম্পেইন করছি, যেখানে মানুষের ওপরই ভরসা করছি। মানুষ সেই জায়গায় সাড়া দিচ্ছে।’
ভোটের পরিবেশ নিয়ে মানুষের মধ্যে উৎসাহের পাশাপাশি শঙ্কা আছে বলেও উল্লেখ করেন তাসনিম জারা। বলেন, ‘এই ভয় কাটাতে হবে, মানুষ অনেক বছর পর যে উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটের দিকে তাকিয়ে আছে, সেটি যেন বাস্তব হয়।’
এ আসনে তাঁর মূল প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থী হাবিবুর রশিদ এবং ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী এনসিপির জাবেদ রাসিন। এখানে মোট প্রার্থী ১২ জন।
এই ভয় কাটাতে হবে, মানুষ অনেক বছর পর যে উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটের দিকে তাকিয়ে আছে, সেটি যেন বাস্তব হয়তাসনিম জারা, স্বতন্ত্র প্রার্থী
রুমিনের কোলে রঙিন হাঁস
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে রুমিন ফারহানা আলোচিত প্রার্থী। গতকাল রোববার সকাল থেকে বেলা সাড়ে তিনটা পর্যন্ত উপজেলার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ রুমিন ফারহানার সঙ্গে দেখা করতে শাহবাজপুর আসেন।
সরাইল-আশুগঞ্জের ন্যায্য কোনো দাবি যদি সরকার না মানে,...আমি আমাদের নেতা-কর্মী ভাই-বোন পরিবার নিয়ে আশুগঞ্জের ব্রিজের সামনে ভৈরবে বইসা পড়ব। সুতরাং সরকারে যেই আসুক, ইনশা আল্লাহ ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ কে গইন্যাই তাকে রাজ্য পরিচালনা করতে হবে।রুমিন ফারহানা
পরে সোয়া চারটার দিকে তিনি শাহবাজপুর বাড়ি থেকে বের হন। কর্মী-সমর্থকেরা অর্ধ শতাধিক মোটরসাইকেলের বহর নিয়ে তাঁর পিছু নেন। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের সরাইল কুট্টাপাড়া মোড়ে গাড়ি থেকে নেমে স্থানীয় ভোটারদের মাঝে প্রচারপত্র বিলি করেন তিনি। পরে আবার গাড়িতে উঠে উপজেলার উচালিয়াপাড়া গ্রামে পৌঁছে নির্বাচনী জনসভায় যোগ দেন। মঞ্চে অনেকে পরিয়ে দেন একের পর এক মালা। একজন তাঁর কোলে তুলে দেন একটি রঙিন হাঁস।
সন্ধ্যা ছয়টার দিকে উপজেলা সদরের বড্ডাপাড়ার জনসভায় রুমিন ফারহানা বলেন, ‘সরাইল-আশুগঞ্জের ন্যায্য কোনো দাবি যদি সরকার না মানে,...আমি আমাদের নেতা-কর্মী ভাই-বোন পরিবার নিয়ে আশুগঞ্জের ব্রিজের সামনে ভৈরবে বইসা পড়ব। সুতরাং সরকারে যেই আসুক, ইনশা আল্লাহ ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ কে গইন্যাই তাকে রাজ্য পরিচালনা করতে হবে।’
মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন মনীষা
সাদাসিধে পোশাকে নিজের কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে পায়ে হেঁটে প্রচারণা চালাচ্ছেন। নেই কোনো যানবাহনের বহর, নেই মহড়া, নেতা-কর্মীদের প্রটোকলও নেই। ভোটের মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন দিন-রাত। বরিশাল-৫ (সদর ও সিটি করপোরেশন) আসনের নারী প্রার্থী চিকিৎসক মনীষা চক্রবর্তীর প্রচারণার চিত্র এটি। বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে লড়ছেন তিনি। এ আসনে মোট ৬ জন প্রার্থীর বিএনপির মজিবর রহমান সরোয়ার এবং ইসলামী আন্দোলনের মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীমও রয়েছেন।
মনীষা গতকাল দুপুরে বরিশাল নগরের কাশীপুর এলাকায় গণসংযোগ করেন। সেখানে শ্রমজীবী মানুষেরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন। বিকেলে কাশীপুর বাজারে পথসভা করেন।
নির্বাচনী প্রচারে কেমন সাড়া পাচ্ছেন জানতে চাইলে মনীষা চক্রবর্তী প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগত লাভালাভের জন্য নয়, বরং গণমানুষের অধিকারের কথা জাতীয় সংসদে তুলে ধরতে নির্বাচনে অংশ নিয়েছি।’
মনীষার নির্বাচনী ব্যয় সম্পূর্ণ গণচাঁদার ওপর নির্ভরশীল। শ্রমজীবী ও সাধারণ মানুষ নির্বাচনী তহবিল জোগান দিচ্ছে বলে জানান তিনি।
সাদাসিধে পোশাকে নিজের কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে পায়ে হেঁটে প্রচারণা চালাচ্ছেন। নেই কোনো যানবাহনের বহর, নেই মহড়া, নেতা-কর্মীদের প্রটোকলও নেই।
যশোরে নারী প্রার্থী সাবিরা
যশোর-২ আসনে বিএনপির নারী প্রার্থী সাবিরা সুলতানা। নির্বাচনী প্রচারণার অংশ হিসেবে গতকাল ঝিকরগাছা উপজেলার পদ্মপুকুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে নির্বাচনী সমাবেশ করেন। সেখানে দেখা যায় গাঁদা ফুলের মালা হাতে মঞ্চের পাশে অপেক্ষা করছেন বাসন্তী পালসহ কয়েকজন নারী। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে সাবিরা সুলতানার গলায় ফুলের মালা পরিয়ে আবেগে কেঁদে ফেলেন বাসন্তী পাল।
পদ্মপুকুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠের সমাবেশে নারীদের ভালোবাসায় আবেগাপ্লুত হয়ে সাবিরা বলেন, ‘বৈবাহিক সূত্রে আমি এই পদ্মপুকুরের বউমা। হিন্দু-মুসলিম-খ্রিষ্টান সবাই আমার আপনজন। এখানে কোনো দলাদলি বা রাজনৈতিক ভেদাভেদ নেই। আমাকে নির্বাচনে জয়ী করার দায়িত্ব আপনাদের।’
সাবিরা সুলতানা ঝিকরগাছা উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে জামায়াতের প্রার্থী মোসলেহ উদ্দিন ফরিদ লড়ছেন।
বৈবাহিক সূত্রে আমি এই পদ্মপুকুরের বউমা। হিন্দু-মুসলিম-খ্রিষ্টান সবাই আমার আপনজন। এখানে কোনো দলাদলি বা রাজনৈতিক ভেদাভেদ নেই। আমাকে নির্বাচনে জয়ী করার দায়িত্ব আপনাদের।বিএনপির নারী প্রার্থী সাবিরা সুলতানা
দুর্গম পাহাড়ে ছুটছেন জুঁই চাকমা
রাঙামাটি আসনে সাত প্রার্থীর মধ্যে একমাত্র নারী প্রার্থী জুঁই চাকমা। তিনি বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির প্রার্থী হিসেবে কোদাল প্রতীকে লড়ছেন। ভোটারদের দুয়ারে দুয়ারে যাচ্ছেন জুঁই চাকমা। জেলা সদর থেকে দুর্গম পাহাড়ি এলাকা, সবখানে সমানতালে ছুটছেন। বিপদে-আপদে পাশে থাকার আশ্বাস দিয়ে ভোট চাইছেন তিনি।
নির্বাচিত হলে তৃণমূল পর্যায়ে উন্নয়নের ওপর জোর দেবেন জুঁই। তাঁর ভাষায় শহরকেন্দ্রিক উন্নয়ন করলে গ্রামগুলো বঞ্চিত হয়।
ভোটারদের দুয়ারে দুয়ারে যাচ্ছেন জুঁই চাকমা। জেলা সদর থেকে দুর্গম পাহাড়ি এলাকা, সবখানে সমানতালে ছুটছেন। বিপদে-আপদে পাশে থাকার আশ্বাস দিয়ে ভোট চাইছেন তিনি।
তিনি গ্রাম থেকে উঠে এসেছেন, এ জন্য গ্রামীণ মানুষের উন্নয়নে কাজ করে যাবেন। বিশেষ করে নারীদের ক্ষমতায়ন, নারীর প্রতি বৈষম্য দূরীকরণ, শিক্ষা, চিকিৎসা, যোগাযোগের ওপর জোর দেবেন।
{প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন প্রথম আলোর সংশ্লিষ্ট জেলা ও উপজেলার নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিরা}