Image description

নির্বাচন এলেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি চেনা দৃশ্য ফিরে আসে—প্রার্থীদের পোশাকে হঠাৎ পরিবর্তন। যাঁদের দৈনন্দিন জীবনে টুপি-পাঞ্জাবি বা ঘোমটা খুব একটা দেখা যায় না, ভোটের মৌসুমে তাঁদের অনেককেই দেখা যায় ধর্মীয় লেবাসে জনসংযোগ করতে। মসজিদ, মাজার, শোকসভা কিংবা ধর্মীয় জমায়েত হয়ে ওঠে নির্বাচনী প্রচারের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। প্রশ্ন হলো, এই পোশাক কি নিছক ব্যক্তিগত পছন্দ, নাকি ভোটের অঙ্কে কষা একটি রাজনৈতিক কৌশল?

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার নতুন কিছু নয়। ভাষা আন্দোলন-পরবর্তী সময় থেকে শুরু করে স্বাধীনতার আগ-পরে—ধর্ম কখনো প্রকাশ্যে, কখনো প্রচ্ছন্নভাবে রাজনীতির অংশ হয়ে এসেছে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনী স্লোগান, ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে মাজার জিয়ারত, ধর্মীয় স্লোগান কিংবা পোশাক—সবই তার উদাহরণ।

তবে গণ-অভ্যুত্থানের পর ‘নতুন বন্দোবস্ত’-এর যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, অনেকের মতে এবারের নির্বাচনী জনসংযোগে তার প্রতিফলন নেই। বরং আগের তুলনায় ধর্মীয় প্রতীক ও লেবাসের ব্যবহার আরও দৃশ্যমান হয়েছে। শুধু ধর্মভিত্তিক দল নয়, উদারপন্থি, বামপন্থি এমনকি স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যেও এই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এখানে পোশাক নিজে মূল বিষয় নয়; বিষয় হলো বার্তা। টুপি, পাঞ্জাবি বা ঘোমটা একটি নির্দিষ্ট ভোটার গোষ্ঠীর কাছে ‘পরিচ্ছন্নতা’, ‘নৈতিকতা’ ও ‘ধর্মপরায়ণতা’র প্রতীক হিসেবে কাজ করে। যেসব প্রার্থীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি, দখল বা চাঁদাবাজির অভিযোগ আছে, তাঁদের জন্য ধর্মীয় লেবাস এক ধরনের ‘ইমেজ ক্লিনার’ হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এস এম শামীম রেজার ভাষায়, ধর্মীয় পোশাক অনেক সময় প্রার্থীর বিরুদ্ধে থাকা নেতিবাচক ধারণা আড়াল করার চেষ্টা। অর্থাৎ পোশাক এখানে বিশ্বাসের প্রকাশ নয়, বরং রাজনৈতিক যোগাযোগের একটি কৌশল।

ভোটাররা কীভাবে দেখছেন?

ভোটারদের প্রতিক্রিয়া অবশ্য একরকম নয়। শহুরে, শিক্ষিত ও সচেতন ভোটারদের বড় একটি অংশ এই পোশাক পরিবর্তনকে ‘ভণ্ডামি’ বা ‘লোক দেখানো’ হিসেবেই দেখছেন। তাঁদের কাছে প্রশ্ন—নির্বাচনের পর এই ধর্মীয় লেবাস কোথায় হারিয়ে যায়?

তবে অন্য একটি বাস্তবতাও অস্বীকার করা যায় না। গ্রামাঞ্চল বা অপেক্ষাকৃত কম শিক্ষিত ভোটারদের একটি অংশ ধর্মীয় পরিচয়ের সঙ্গে নিজেকে মিলিয়ে দেখে। সেখানে প্রার্থী যদি ‘আমাদের মতো’ মনে হয়—একই লেবাস, একই ধর্মীয় ভাষা—তাহলে তার প্রতি আস্থা তৈরি হওয়াটা সহজ হয়। এই জায়গাটিতেই ধর্মীয় পোশাক ও স্লোগান কার্যকর হয়ে ওঠে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদের মতে, ভোটের রাজনীতিতে ধর্ম ব্যবহারের বড় কারণ হলো ভোটারদের একাংশের অজ্ঞতা ও আবেগপ্রবণতা। ধর্মীয় অনুভূতিকে সহজেই নাড়া দেওয়া যায়, বিশেষ করে যখন ধর্মীয় জ্ঞান গভীর নয়, কিন্তু আবেগ প্রবল।

তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে—যদি ধর্মীয় পোশাক ও স্লোগানই ভোট জয়ের মূল চাবিকাঠি হতো, তাহলে ধর্মভিত্তিক দলগুলো কেন বারবার নির্বাচনে প্রান্তিক অবস্থানে থাকে? বাস্তবতা হলো, তারা কখনোই সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পায়নি। অর্থাৎ ধর্ম একটি সহায়ক উপাদান হতে পারে, কিন্তু একমাত্র নির্ধারক নয়।

আইন আছে, প্রয়োগ নেই

নির্বাচনী আচরণবিধিতে ধর্ম ব্যবহারের বিষয়ে স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। উপাসনালয়ে প্রচারণা, ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগানো কিংবা প্রার্থনারত ছবি ব্যবহার—সবই নিষিদ্ধ। কিন্তু বাস্তবে এসব বিধির প্রয়োগ খুবই দুর্বল। ফলে ধর্ম ব্যবহার করে ভোট চাওয়ার প্রবণতা কার্যত একটি ‘গ্রে জোনে’ চলতে থাকে।

টুপি, পাঞ্জাবি বা ঘোমটা—নিজে নিজে কোনো ভোট নিশ্চিত করে না। কিন্তু বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় এগুলো এখনো একটি শক্তিশালী সাংস্কৃতিক ও আবেগী জায়গা দখল করে আছে। কিছু ভোটার এতে প্রভাবিত হন, আবার অনেকে একে প্রতারণা হিসেবে দেখেন। তাই বলা যায়, ধর্মীয় লেবাস হয়তো ভোট বাড়ানোর জাদুকাঠি নয়, তবে নির্বাচনী রাজনীতিতে এটি এখনো একটি কার্যকর কৌশল—যত দিন না ভোটাররা ব্যক্তি, নীতি ও কর্মসূচিকে লেবাসের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।