Image description

চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল বা এনসিটিতে বিদেশি অপারেটর নিয়োগ সংক্রান্ত সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে দ্বিতীয় দিনের মতো অবরোধ পালন করছে বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীরা। জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদল ও শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্যপরিষদের ব্যানারে এই কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। এতে স্থবিরতা নেমেছে দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের মেরুদণ্ড খ্যাত চট্টগ্রাম বন্দরে।

ঘোষণা অনুযায়ী গত শনিবার ও গতকাল রোববার সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত কর্মবিরতি চালানোর কথা থাকলেও মূলত কর্মসূচি শুরু হওয়ার পর থেকে জেটি ছাড়া আর কোথাও কাজ হয়নি। নতুন করে আজ সোমবার সকাল থেকে ফের একই কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এদিকে আন্দোলন দমাতে কঠোর অবস্থানে রয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষও। গত শনিবার চারজনের পর গতকাল রোববার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া আরো সাত শ্রমিক-কর্মচারীকে বদলি করা হয়েছে। তালিকা তৈরি করা হয়েছে ১৮০ জনের। পর্যায়ক্রমে সবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যদিকে দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত কিছুতেই মাঠ ছাড়বেন না বলে জানিয়েছেন শ্রমিক-কর্মচারীরা।

বন্দর সূত্র জানিয়েছে, বন্দরে বিদেশি অপারেটর প্রতিষ্ঠান নিয়োগ সংক্রান্ত উচ্চ আদালতে একটি রিটের রায় সরকারের পক্ষে যায়। এরপর থেকেই এনসিটিকে গ্লোবাল টার্মিনাল অপারেটর প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে বুঝে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করে সরকার। কিন্তু এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় চট্টগ্রাম বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীদের একাংশ। গত শনিবার থেকে কাজ বন্ধ

রাখার কর্মসূচি ঘোষণা করে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদল ও সিবিএ। এতে সংহতি জানায় শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ)। ফলে কার্যত ৪৮ ঘণ্টার বেশি অচল রয়েছে চট্টগ্রাম বন্দরের অপারেশনাল কাজ। তবে সীমিত পরিসরে জেটিতে বিদেশগামী মাদার ভেসেলে কন্টেইনার ওঠা-নামা চালু আছে। কিন্তু নতুন করে কোনো পণ্য বন্দরে প্রবেশ করছে না কিংবা বন্দর থেকে ডেলিভারিও হচ্ছে না। এতে বন্দরের ইয়ার্ড ও অফডকগুলোতে জট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কঠোর অবস্থানে বন্দর কর্তৃপক্ষ

শ্রমিক-কর্মচারীদের আন্দোলন নিয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। ইতোমধ্যে বন্দর এলাকায় আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে কঠোর হওয়ার আহ্বান জানিয়ে সিএমপিতে চিঠি পাঠিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। এই চিঠির সূত্র ধরে বন্দরকে প্রথম শ্রেণির কেপিআইভুক্ত প্রতিষ্ঠান উল্লেখ করে বন্দর এলাকায় কোনো ধরনের মিছিল-সমাবেশ ও রাজনৈতিক কর্মসূচির উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে সিএমপি। বন্দর ভবন এলাকায় মোতায়েন করা হয়েছে অতিরিক্ত পুলিশ।

এদিকে কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেওয়া ১৮০ জনের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে গত শনিবার চারজনকে ও গতকাল রোববার আরো সাতজন শ্রমিককে বদলি করা হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের মুখপাত্র পরিচালক প্রশাসন ওমর ফারুক জানান, শ্রমিক কর্মচারীদের একাংশ কাজে যোগ না দিলেও আরেক অংশ অপারেশনে আছে। এতে বন্দরের কার্যক্রমের গতি কমলেও চলমান আছে। অনাকাঙ্ক্ষিত এই কর্মসূচির কারণে বন্দরে যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তা নিরূপণ করতে একটি কমিটি করা হয়েছে। কমিটির সুপারিশ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শ্রমিক কর্মচারীদের বদলির বিষয়ে তিনি জানান এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। বন্দরের কাজ স্বাভাবিক রাখতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

অনড় অবস্থানে আন্দোলনরতরা

আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া স্কপের যুগ্ম আহ্বায়ক ও শ্রমিকদল নেতা শেখ নুরুল্লাহ বাহার জানান, চট্টগ্রাম বন্দরকে বিদেশিদের কাছে ইজারা দেওয়ার প্রতিবাদে কর্মসূচি চলছে। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত এই কর্মসূচি চলমান থাকবে। বদলির তালিকা তৈরিতে কেউ ভিত নয়। কারণ আমরা সবাই জানি, এই সরকারের মেয়াদ আর ১০ দিনও নেই। নির্বাচনের পর এখন যারা তালিকা করছে, তাদের অস্তিত্ব থাকবে না। আর তাই দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত কর্মসূচি চালিয়ে যেতে একাট্টা সবাই।

বন্দর ব্যবহারকারীদের ক্ষোভ

বিজিএমইএ’র সাবেক সহ-সভাপতি রকিবুল আলম খন্দকার জানান, বিভিন্ন ইস্যুতে বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীরা আগে বহুবার কর্মবিরতির মতো কর্মসূচি পালন করেছে। কিন্তু কর্তৃপক্ষ সংকট নিরসনে এগিয়ে এসেছে। শ্রমিক-কর্মচারীরাও অনড় থাকেনি। এবারই প্রথম সবাই যার যার অবস্থানে অনড় অবস্থানে রয়েছে। কারণ একপক্ষ হয়তো ভাবছে তাদের মেয়াদ আর অল্প ক’দিন রয়েছে এই সময়ের জন্য মাথা নত করব না। অন্যপক্ষও ভাবছে ১০/১২ দিনের জন্য যা করে করুক পটপরিবর্তন হলে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু দুই পক্ষের জেদের জাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে জাতীয় অর্থনীতি। তিনদিন বন্দর বন্ধ থাকার জের বহুদিন ভোগাবে। এতে বন্দরে জট তৈরি হবে। বাজারে অস্থিরতা দেখা দেবে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন রয়েছে তৈরি পোশাক শিল্প। এতে বড় ধরনের ক্ষতির ঝুঁকি রয়েছে। তিন দিনে ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করা সম্ভব নয়। তবে সেটি শত কোটি টাকার কম নয়।

বেসরকারি কন্টেইনার ডিপো মালিকদের সংগঠন বিকডা সেক্রেটারি রুহুল আমিন শিকদার জানান, দ্রুত সময়ের মধ্যে সংকট সমাধান না হলে রমজানে অস্থির হয়ে উঠবে বাজার।