তফসিল ঘোষণার পর থেকেই সারাদেশে নির্বাচনী হাওয়া বইতে শুরু করেছিল। তবে গত কয়েকদিনে সংঘাত ও সহিংসতায় আনন্দঘন পরিবেশের পরিবর্তে জনমনে দানা বাঁধছে আতঙ্ক। পটুয়াখালী-৪ আসনসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রার্থীদের গণসংযোগে হামলা, দলীয় কার্যালয় ভাঙচুর এবং প্রাণহানির ঘটনা প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে- আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন কি শান্তিপূর্ণ গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবে?
বৃহস্পতিবার দুপুরে পটুয়াখালী-৪ (কলাপাড়া-রাঙ্গাবালী) আসনের ধোলাশার ইউনিয়নে খেলাফত মজলিসের ‘দেওয়াল ঘড়ি’ মার্কার মিছিলে অতর্কিত হামলা হয়। অভিযোগের আঙুল উঠেছে স্থানীয় বিএনপির একটি পক্ষের দিকে। হামলায় অন্তত ৩ জন দায়িত্বশীল নেতাকর্মী গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এই ঘটনার পর এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ একে ‘পেশীশক্তির অপরাজনীতি’ হিসেবে অভিহিত করে ইসি’র কঠোর হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন।
কেবল পটুয়াখালী নয়, গত কয়েকদিনে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। শেরপুর-৩ আসনে ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠানে আসন বিন্যাস নিয়ে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে জামায়াতের বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতা মাওলানা রেজাউল করিম নিহত হন। এ ছাড়া এ ঘটনায় অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন।
ভোলায় গত কয়েক দিনে এখানেও একাধিক রাজনৈতিক পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে ২৫ জনের বেশি নেতাকর্মী আহত হয়েছেন।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, গত এক মাসে সারাদেশে ৬০টিরও বেশি নির্বাচনী সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে, যাতে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১৬ জন।
এদিকে নির্বাচন কমিশন (ইসি) আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটগ্রহণের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। প্রায় ৯ লাখ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন এবং ৩৮ প্লাটুন বিজিবি নামানোর ঘোষণা দেওয়া হলেও তৃণমূল পর্যায়ে সহিংসতা থামছে না। ভোটারদের মনে বড় প্রশ্ন—ভোটকেন্দ্রে গিয়ে তারা নিরাপদে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন তো?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন পর দেশে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের আবহ তৈরি হলেও দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রতিহিংসা মাঠপর্যায়ে সংঘাতের রূপ নিচ্ছে। বিশেষ করে একই জোটের শরিকদের মধ্যে আসন বণ্টন বা স্থানীয় আধিপত্য নিয়ে বিরোধ রক্তক্ষয়ী হয়ে উঠছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন নির্বাচন পর্যবেক্ষক বলেন, নির্বাচন কমিশন এবং প্রশাসন যদি অবিলম্বে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ না করে, তবে এই সংঘাত সাধারণ ভোটারদের কেন্দ্রবিমুখ করতে পারে।
গণতন্ত্রের উৎস হলো ভোট। কিন্তু সেই ভোট যদি হয় সংঘাতের কারণ, তবে তা সাধারণ মানুষের জন্য উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। পটুয়াখালীর ঘটনা বা শেরপুরের সংঘর্ষ—সবই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, আইনশৃঙ্খলার কঠোর নিয়ন্ত্রণ ছাড়া ‘নির্বাচনী ট্রেন’ নির্বিঘ্নে গন্তব্যে পৌঁছানো কঠিন হবে। এখন দেখার বিষয়, নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আগামী দুই সপ্তাহে কতটা কঠোরভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।