আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি একই দিনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও সাংবিধানিক গণভোট। গ্রামাঞ্চেলের মানুষের কোনো ধারণা নেই গণভোট সম্পর্কে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি একই দিনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও সাংবিধানিক গণভোট। গণভোট উপলক্ষে সরকারের পক্ষ থেকে প্রচার-প্রচারণা চালানো হলেও দেশের বিভিন্ন উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের অধিকাংশ মানুষ এখনো জানেন না ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট আসলে কী এবং কেন এটি দেওয়া হচ্ছে। নির্বাচনে সাধারণ ভোটারদের বেশিরভাগই সংসদ নির্বাচনের বিষয়ে আগ্রহী হলেও গণভোট নিয়ে তাদের মধ্যে কার্যত কোনো স্পষ্ট ধারণা নেই। অনেকেই জানেন সংসদ নির্বাচন হবে, তবে একই দিনে আরেকটি ব্যালট পেপারে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দিতে হবে এ তথ্য তাদের কাছে নতুন। ভোটারদের বড় একটি অংশের ধারণা, তারা কেবল দলীয় প্রতীকে ভোট দেবেন; এর বাইরে অতিরিক্ত ভোটের বিষয়টি তাদের জানা নেই।
সুনামগঞ্জ-৫ (ছাতক-দোয়ারাবাজার) আসনের গ্রামগঞ্জের অধিকাংশ সাধারণ ভোটারদের কাছে গণভোটের কোনো ধারণা নেই বললেই চলে। উপজেলার চরমহল্লা ইউনিয়নের চানপুর গ্রামের বাসিন্দা আফজাল হোসেন বলেন, এবারের নির্বাচনে হ্যাঁ ভোট দেব নাকি না ভোট দেব এটাই জানি না। কেন হ্যাঁ বা কেন না, সে বিষয়েও আমাদের কোনো ধারণা নেই। চোখে পড়ার মতো কোনো প্রচারও দেখিনি। উপজেলার সমতা মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজের একজন প্রভাষক বলেন, গণভোট নিয়ে তেমন কোনো প্রচার নেই। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে এ বিষয়ে আগ্রহ বা সচেতনতা তৈরি হয়নি।’
এ বিষয়ে ছাতক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ডিপ্লোমেসি চাকমা বলেন, ‘সরকারি দপ্তর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ইউনিয়ন পরিষদ ও বাজার এলাকায় ব্যানার-ফেস্টুন টাঙানো হয়েছে। ওয়ার্ড পর্যায়ে মাইকিং করা হচ্ছে এবং বিভিন্ন সভায় আমি নিজেও গণভোটের বিষয়ে কথা বলছি। নির্বাচনের আগ পর্যন্ত এই প্রচার অব্যাহত থাকবে।
খানসামা (দিনাজপুর) প্রতিনিধি জানান, খানসামা উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে গণভোট নিয়ে তেমন কোনো দৃশ্যমান প্রচার দেখা যাচ্ছে না। জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই গণভোট সম্পর্কে সচেতনতার অভাবে গ্রামীণ ভোটারদের বড় একটি অংশ এখনো অন্ধকারেই রয়ে গেছে। যদিও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, গণভোট বিষয়ে প্রচার কার্যক্রম চলমান রয়েছে এবং ধীরে ধীরে তা তৃণমূল পর্যায়ে বিস্তৃত করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ‘দেশের চাবি আপনার হাতে’ স্লোগানে সাংবিধানিক গণভোটকে সামনে রেখে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ডিজিটাল বিলবোর্ড ও প্রচার-গাড়ির মাধ্যমে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব কার্যক্রম মূলত উপজেলা সদর কিংবা হাট-বাজারকেন্দ্রিক পর্যায়েই সীমাবদ্ধ থাকছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, অনেক ভোটারই জানেন না যে, নির্বাচনের দিন সংসদ নির্বাচনের ব্যালটের পাশাপাশি আলাদা একটি গণভোটের ব্যালটও দেওয়া হবে। এতে ভোটের দিন কেন্দ্রে গিয়ে সাধারণ ভোটাররা বিভ্রান্তিতে পড়তে পারেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সচেতন নাগরিকরা।
গণভোট সম্পর্কে জানতে চাইলে আঙ্গারপাড়া ইউনিয়নের সেল্টুশাহ মাদরাসা মোড়ের চা বিক্রেতা এন্তাজুল বলেন, তিনি শুধু এমপি নির্বাচনের কথাই শুনেছেন। গণভোট কী বা কেন এ ভোট দিতে হবে—এ বিষয়ে কেউ তাকে কিছু বলেনি। এমনকি চায়ের দোকানে ভোট নিয়ে আলোচনা হলেও গণভোট নিয়ে কাউকে কথা বলতে শোনেননি তিনি।
পাকেরহাট এলাকার অটোচালক ওমর ফারুক জানান, সংসদ নির্বাচনের বিষয়ে তিনি জানেন এবং আগেও ভোট দিয়েছেন। তবে গণভোট কী—এ সম্পর্কে তার কোনো ধারণা নেই।
একই কথা জানান স্কুল শিক্ষিকা লিলি আক্তার। তিনি বলেন, ‘চেয়ারম্যান-মেম্বার কিংবা এমপি নির্বাচনের ভোট গ্রামবাসী বুঝলেও গণভোট কী—তা বেশিরভাগ মানুষই বোঝে না। গ্রামে এখনো এ বিষয়ে কোনো প্রচার চোখে পড়েনি।’
‘এ বিষয়ে সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) কামরুজ্জামান সরকার বলেন, ‘গণভোটের বিষয়ে ইতোমধ্যে উপজেলার নিজস্ব অর্থায়নে ১২ হাজার লিফলেট এবং সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর থেকে পাওয়া প্রায় ১৫ হাজার লিফলেট ইউনিয়ন উদ্যোক্তাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিতরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি গণভোটের বিষয়টি গ্রামাঞ্চলের মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে প্রচার কার্যক্রম চলমান রয়েছে।’
দোয়ারাবাজার (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি জানান, সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক ও জেলা রিটার্নিং অফিসার ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া বলেছেন, ‘আসন্ন গণভোটে ভোটাররা ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দেবেনÑসেটি সম্পূর্ণ তাদের ব্যক্তিগত ইচ্ছের ওপর নির্ভর করে। এ বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো চাপ বা নির্দিষ্ট নির্দেশনা নেই।’ গতকাল বুধবার দুপুরে দোয়ারাবাজার উপজেলা প্রশাসন আয়োজিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট নিয়ে মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সভায় ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া বলেন, ভোট দেওয়া জনগণের নাগরিক ও ব্যক্তিগত অধিকার। ভোটার যদি মনে করেন ‘না’তে ভোট দিলে ভালো, তবে তিনি তা-ই দেবেন; আবার ‘হ্যাঁ’ ভালো মনে করলে সেখানেই ভোট দেবেন। আমি যেহেতু এখন রিটার্নিং কর্মকর্তা ও নির্বাচন কমিশনের লোক, তাই কোনো পক্ষের হয়ে কথা বলব না। তবে আমরা জনগণকে সচেতন করতে চাই, যাতে কেউ না জেনে ভোট দিয়েছেন—এমনটি বলতে না পারেন।
তিনি আরো যোগ করেন, ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচারে কিছু বিষয় আছে, যা জনকল্যাণে প্রয়োজন। দোয়ারাবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অরুপ রতন সিংহের সভাপতিত্বে সভায় বিশেষ অতিথি ছিলেন দোয়ারাবাজার সেনাক্যাম্পের ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ শাওন, সহকারী পুলিশ সুপার (ছাতক-দোয়ারা সার্কেল) শেখ মো. মুরসালিন,উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আবু সালেহীন খান প্রমুখ। এ সময় রাজনৈতিক নেতাকর্মী, গণমাধ্যমকর্মী এবং প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।