ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের শেষ সময়ে এসেও নির্বাচন কমিশনের (ইসি) প্রতি আস্থার সংকট কাটছে না। একের পর এক সিদ্ধান্ত পরিবর্তন, নির্বাচনের মাঝপথে আইন ও আচরণবিধি সংশোধন, আদালতের আদেশে তফসিল ও সীমানা পুনর্বিন্যাসে জটিলতা- সব মিলিয়ে রাজনৈতিক দল ও ভোটারদের মধ্যে প্রশ্ন বাড়ছে। জুলাই বিপ্লবের প্রেক্ষাপটে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, বর্তমান বাস্তবতায় তা কতটা পূরণ হবে, সেটা নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এরমধ্যেই গণভোটে নির্বাচনসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পক্ষে-বিপক্ষে প্রচার না করার নির্দেশনা নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার জানিয়েছেন, নির্বাচনি দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’-এর পক্ষে প্রচার চালাতে পারবেন না, তবে ভোট দেওয়ার বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরিতে প্রচার চালাতে পারবেন। এ বিষয়ে পরিপত্র জারির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারের পক্ষ থেকে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চলমান থাকায় ইসির এ সিদ্ধান্ত ভোটারদের কাছে ভিন্ন বার্তা দিতে পারে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও একই সঙ্গে গণভোট আয়োজন করছে নির্বাচন কমিশন। বড় পরিসরের এ দুটি ভোট একসঙ্গে আয়োজনের ক্ষেত্রে কমিশনের বাস্তব অভিজ্ঞতা সীমিত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বর্তমান কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর কোনো স্থানীয় সরকার বা উপনির্বাচনের আয়োজন না করেই সরাসরি জাতীয় নির্বাচনে যাচ্ছে, যা প্রস্তুতি ও দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। একই দিনে বড় দুটি ভোট আয়োজনের পেছনে কমিশনের বাস্তব অভিজ্ঞতা হিসেবে রয়েছে একটি কেন্দ্রে চার ঘণ্টায় ৫০০ ভোটারের একটি মক ভোটিং। এছাড়া সিইসিসহ অন্য কমিশনারদের কর্মজীবনেও মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তা হিসেবে নির্বাচনি দায়িত্ব পালনের খুব বেশি অভিজ্ঞতা নেই বলে জানা গেছে।
জুলাই বিপ্লবের হাত ধরে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর ২০২৪ সালের ২৪ নভেম্বর নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়। এক বছরের কিছু বেশি সময় দায়িত্ব পালন শেষে এ কমিশন সংসদ নির্বাচন আয়োজন করতে যাচ্ছে। অন্য কমিশনগুলোকে সংসদ নির্বাচনের আগে উপনির্বাচন, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদসহ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচন আয়োজন করতে দেখা গেলেও ভিন্ন বাস্তবতায় বর্তমান কমিশনের আমলে এ ধরনের কোনো নির্বাচনই হয়নি। তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ইসির নিজস্ব কর্মকর্তাদের অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাদের সঙ্গে যথাযথ সমন্বয় হলে সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠান খুব কঠিন কিছু হবে না।
এদিকে নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নিজেদের কর্মকাণ্ডে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি বিতর্ক তৈরি করেছে। বারবার সিদ্ধান্ত বদল ইসিকে নতজানু প্রতিষ্ঠানে পরিণত করছে।
তফসিল ঘোষণার পরও নির্বাচন কমিশনের পক্ষপাতের অভিযোগ আনে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। আপিল শুনানির শেষ দিকে ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকদের প্রার্থিতা ফেরত দেওয়ার প্রসঙ্গ টেনে গত ১৮ জানুয়ারি এনসিপির মুখপাত্র ও দলটির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া সাংবাদিকদের বলেন, নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠু নির্বাচন করার জন্য রাজনৈতিক দল বা জনগণের আস্থা হারিয়েছে। এই নির্বাচন কমিশনের প্রতি বিশ্বাস রাখতে পারছি না।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানে গত ১১ ডিসেম্বর তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। তফসিল ঘোষণার পরপরই একাধিক সংশোধনী আনতে বাধ্য হয় কমিশন। আপিল দায়েরের সময়সীমা আইন অনুযায়ী পাঁচ দিনের মধ্যে নির্ধারিত হলেও প্রথমে সাতদিন সময় দেওয়া হয়, যা পরে সংশোধন করা হয়। একই ভাবে আদালতের আদেশে পাবনা-১ ও ২ আসনের ভোট স্থগিত ও পরে পুনর্নির্ধারণ করতে হয়।
ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকদের প্রতি ‘অনুগ্রহ’
ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকদের প্রার্থিতা নিয়ে কমিশন সবচেয়ে বড় বিতর্কে জড়ায়। জিরো টলারেন্স নীতির ঘোষণা থাকলেও বাস্তবে দেখা গেছে ভিন্নচিত্র। অকাট্য প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও একাধিক প্রার্থীর প্রার্থিতা বৈধ ঘোষণা করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর চাপে আপিল শুনানিতে এসব বৈধতা দেওয়া হয়। এমনকি একপর্যায়ে বাতিল হওয়া প্রার্থিতা স্বপ্রণোদিতভাবে পুনর্বহালের অভিযোগও ওঠে। বিষয়টিকে নজিরবিহীন বলে জানিয়েছেন নির্বাচনসংশ্লিষ্টরা।
পোস্টাল ব্যালট বিতর্ক
পোস্টাল ব্যালট ইস্যুতেও কমিশন বিভিন্ন সমালোচনার মুখে পড়ে। প্রবাসী ও দেশের ভোটারদের জন্য একই ধরনের ব্যালট দেওয়ার ঘোষণা থাকলেও পোস্টাল ব্যালটে বিএনপির দলীয় প্রতীকের অবস্থান (ব্যালটের ভাঁজ বরাবর) নিয়ে বিতর্ক তৈরি হওয়ায় দেশে পোস্টাল ব্যালট পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা হয়। গত ২২ জানুয়ারি নির্বাচন পরিচালনা বিধিতে এ-সংক্রান্ত সংশোধনী জারি করা হয়।
চাপের মুখে খেই হারানো ইসি
সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে ইসি প্রথমে যে নির্বাচনি আচরণবিধি প্রণয়ন করেছিল, নির্বাচনের মাঝপথে এসে তার কয়েকটি জায়গায় সংশোধন করেছে। রাজনৈতিক দলগুলোর দাবির মুখে তারা বিধিমালা সংশোধন করে মাইক ব্যবহারের সুযোগ বৃদ্ধি, ডিজিটাল ব্যানারের সংখ্যা বাড়ানোসহ একাধিক শর্ত শিথিল করে।
জানা গেছে, গত বছরের ১০ নভেম্বর আচরণবিধির প্রজ্ঞাপন জারির পর তফসিল ঘোষণার দিন ১১ ডিসেম্বর তাতে এক দফা সংশোধনী আনা হয়। নতুন করে আচরণবিধি সংশোধনে ইতোমধ্যে আইন মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে। প্রস্তাবিত সংশোধনীতে জনসভায় মাইকের সংখ্যার সীমা তুলে দেওয়া ও ভোটার স্লিপে দলীয় প্রতীক, দলের ও প্রার্থীর নাম যুক্ত থাকবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
নির্বাচনি প্রতীক ও দল নিবন্ধন নিয়েও কমিশনকে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়। জাতীয় নাগরিক পার্টির প্রতীক নিয়ে টানাপোড়েন এবং পরে চাপের মুখে ইসি নতিস্বীকার করে শাপলার পরিবর্তে ‘শাপলা কলি’কে নতুন প্রতীক হিসেবে তালিকাভুক্ত করা, কয়েক দিনের অনশন এবং বিএনপির প্রভাবশালী নেতাদের তদবিরে দৃশ্যমান কোনো সাংগঠনিক তৎপরতা না থাকা ‘আমজনতার দল’-কে নিবন্ধন দেওয়া এবং সীমানা পুনর্বিন্যাসে বারবার লেজেগোবরে করে ফেলার বিষয়গুলো কমিশনের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
নির্বাচন বিশ্লেষক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, আইন অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা অনেক বেশি হলেও সে ক্ষমতার প্রয়োগ না হলে প্রতিষ্ঠানটি দুর্বল হয়ে পড়ে। বারবার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন কমিশনের দুর্বলতাই প্রকাশ করছে। আরেক বিশ্লেষক মনিরা হক বলেন, দলীয় সরকার না থাকলেও কমিশনের আচরণে রাজনৈতিক চাপের ছাপ স্পষ্ট। আবদুল আলীম মনে করেন, যৌক্তিক কারণে আচরণবিধি সংশোধন নেতিবাচক নয়, তবে অভিজ্ঞতার বিকল্প নেই। কমিশনের দায়িত্বশীলদের অভিজ্ঞতার দরকার ছিল। অবশ্য নির্বাচন কমিশনের মাঠ প্রশাসন ও কেন্দ্রীয় পর্যায়ে যেসব কর্মকর্তা রয়েছেন তাদের নির্বাচনি অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাদের সঙ্গে সমন্বয় থাকলে খুব একটা সমস্যা হওয়ার কথা নয়।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ আমার দেশকে বলেন, আমাদের ওপর রাজনৈতিক কোনো চাপ নেই। যা করছি ইনসাফের সঙ্গে করছি। নির্বাচনের প্রয়োজনে যা যা করণীয়, ভোটের দিন পর্যন্ত তা করতে প্রস্তুত আছি। কে আমাদের প্রশংসা করল বা কে সমালোচনা করল, তা আমরা আমলে নেব না।
গণভোট চ্যালেঞ্জ করা রিট খারিজ
এদিকে, সংসদ নির্বাচন ও গণভোট বন্ধে নির্বাচন কমিশনের পদক্ষেপ চেয়ে আদালতে রিট করা হলে তা খারিজ করে দেয় হাইকোর্ট। গত সোমবার বিচারপতি রাজিক-আল-জলিল ও বিচারপতি আনোয়ারুল ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেয়।
রিটে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে অংশ নেওয়া অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার অনীক আর হক জানান, জাতীয় সংসদ নির্বাচনসংক্রান্ত বিধিমালা দেখিয়ে আবেদনকারী রিট নিয়ে এসেছেন, এর কোনো সারবত্তা নেই। সরকার যেটি করছে, সেটি হচ্ছে এখানে ‘হ্যাঁ’ দিলে কী হবে এবং ‘না’ দিলে কী হবে। এটা হচ্ছে জনসচেতনতা তৈরি। তাদের প্রথমে প্রার্থনা ছিল জাতীয় সংসদ নির্বাচন স্থগিতের। নির্বাচন স্থগিত চেয়ে উদ্দেশ্যমূলকভাবে রিটটি করা হয়েছে, যা খারিজযোগ্য। শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট রিটটি সরাসরি খারিজ করে দেয়।