কাস্টমস আইনে শুল্ক কর পরিশোধ ছাড়া পণ্য খালাসের সুযোগ নেই। এর পরও শুল্কমুক্ত সুবিধায় আমদানি করা সাবেক সংসদ সদস্যদের ৩০টি গাড়ি এক আদেশের মাধ্যমে পরিবহন পুলে হস্তান্তর করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। শুধু এয়ারফেইজ চার্জ পরিশোধ করে গাড়িগুলো হস্তান্তর করে এনবিআর। রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত না করে একবার নিলামে তুলেই প্রচলিত কাস্টমস আইনের নতুন আদেশের মাধ্যমে পরিবহন পুলে দিয়ে দেওয়া হয়।
সাবেক সংসদ সদস্যদের আমদানি করা এসব গাড়ির রেজিস্ট্রেশন করতে অপারগতা জানিয়েছে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ)। এরই পরিপ্রেক্ষিতে জনপ্রশাসন সচিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এনবিআর চেয়ারম্যানের আগের ডিও (আদেশ) বাতিল বা সংশোধন করে গাড়ির মালিকানার বিষয়টি নিশ্চিত করতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতেই মহাবিপাকে পড়েছে এনবিআর। এখন পরিবহন পুলে দেওয়া এসব গাড়ির বৈধতা দিতে নতুন করে আইন সংশোধনের প্রক্রিয়া শুরু করেছে সংস্থাটি। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সূত্র জানায়, গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ভেঙে যায় জাতীয় সংসদ। সংসদ ভেঙে যাওয়ায় বাতিল হয়ে যায় গাড়ি আমদানিতে সংসদ সদস্যদের শুল্কমুক্ত সুবিধা। এতে সাধারণ আমদানিকারক হিসেবে সম্পূর্ণ শুল্ক কর পরিশোধ সাপেক্ষে গাড়ি খালাসের নিয়ম বলবৎ হয়ে যায়। এরপর সাবেক সংসদ সদস্যদের নিয়ে আসা গাড়িগুলো শুল্ক কর পরিশোধ করে খালাস না নেওয়ায় আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের নামে খালাস চিঠিও দেয় কাস্টম হাউস কর্তৃপক্ষ। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এসব গাড়ি খালাস না নেওয়ায় নিলামে তোলে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস। একবার নিলামে তুলেই প্রত্যাশিত দাম না পেয়ে গাড়িগুলোর বিষয়ে বিকল্প ব্যবস্থা নিতে এনবিআরের মতামত জানতে চায় চট্টগ্রাম কাস্টমস। কিন্তু এনবিআর এসব গাড়ি পরিবহন পুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। সংস্থাটি গত ১২ নভেম্বর গাড়িগুলো দুই শর্তে পরিবহন পুলে হস্তান্তর করে। শর্তগুলো হলো—ভবিষ্যতে এসব গাড়ির আমদানিকারক শুল্ক কর পরিশোধ করে খালাস নিতে চাইলে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের শুল্কায়নযোগ্য মূল্য নির্ধারণ করে আইন অনুযায়ী খালাস করতে পারবে। এ ছাড়া কাস্টম হাউস কর্তৃক প্রযোজ্য শুল্ক কর পরিশোধ সাপেক্ষে ভবিষ্যতে খালাসের ব্যবস্থা নেওয়া হলে সরকারের পরিবহন পুল থেকে কাস্টম কর্তৃপক্ষকে ফেরত দেওয়া হবে। অর্থাৎ আমদানিকারক ভবিষ্যতে গাড়িগুলো খালাস নিতে চাইলে নিতে পারবে। যদিও বর্তমান কাস্টম আইনে কোনো পণ্য খালাসের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ শুল্ক কর পরিশোধের বিধান রয়েছে। কোটি কোটি টাকা দামের এসব গাড়ি এয়ারফেইজ চার্জ হিসেবে মাত্র ১ কোটি ৯২ লাখ ৪০ হাজার টাকা পরিশোধ করে পরিবহন পুলে হস্তান্তর করেছে এনবিআর। যদিও মডেল ও সিসিভেদে প্রতিটি গাড়ির শুল্ক কর রয়েছে ৪ থেকে ৮ কোটি টাকা পর্যন্ত।
এ বিষয়ে জানতে এনবিআর চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খানের মোবাইল ফোনে বারবার কল দিয়েও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। খুদে বার্তা পাঠিয়েও উত্তর মেলেনি।
সূত্র আরও জানায়, প্রচলিত শুল্ক আইন উপেক্ষা করে একটি আদেশের মাধ্যমে সাবেক সংসদ সদস্যদের আমদানি করা এসব গাড়ি পরিবহন পুলে দেয় এনবিআর। কিন্তু বিপত্তি বাধে রেজিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে। এনবিআরের গাড়ি হস্তান্তরের শর্ত অনুযায়ী মালিকানা আদতে আমদানিকারকদের। অথচ প্রচলিত আইনে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে খালাস না করলে পণ্য নিলামে তোলার এখতিয়ার রয়েছে কাস্টম হাউস কর্তৃপক্ষের। সেক্ষেত্রে তিনবার পর্যন্ত নিলাম করতে পারে কাস্টম হাউস। এনবিআর একবার নিলামে তুলেই পরিবহন পুলে গাড়িগুলো দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এ ছাড়া গাড়িগুলোর মালিকানা কার নামে হবে, সেটি স্পষ্ট না হওয়ায় এখন রেজিস্ট্রেশনও হচ্ছে না। মালিকানার বিষয়টি স্পষ্ট না থাকায় রেজিস্ট্রেশন হবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে বিআরটিএ। এতে গাড়িগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে জনপ্রশাসন সচিবের সভাপতিত্বে একটি বৈঠক হয়। ওই বৈঠকে এনবিআরের গাড়ি প্রদান সংক্রান্ত আদেশ বাতিল বা সংশোধনের মাধ্যমে মালিকানা স্পষ্ট করার সিদ্ধান্ত হয়। গাড়িগুলো পরিবহন পুলে মালিকানা হস্তান্তর করার ক্ষেত্রে প্রয়োজনে রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্তের বিষয়ে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয় বৈঠকে। যদিও রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করতে হলে চোরাচালান বা নিষিদ্ধ ঘোষিত হওয়ার বিধান রয়েছে। সাবেক সংসদ সদস্যদের গাড়িগুলো এলসির মাধ্যমে আমদানি করা এবং অবাধে আমদানিযোগ্য হওয়ায় রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্তও করতে পারছে না এনবিআর।
এখন এসব গাড়ির মালিকানার বিষয়টি স্পষ্ট করে আইনি বৈধতা নিতে নতুন কৌশল নিয়েছে এনবিআর। এক্ষেত্রে আগের আদেশটি বাতিল করে নতুন আদেশ করে আইনে সংশোধনের বিষয়ে এরই মধ্যে কাজ শুরু করেছে এনবিআর। উপদেষ্টা পরিষদের অনুমোদন পেলে বিষয়টি আইনি বৈধতা পাবে বলেও জানিয়েছেন এনবিআরের একাধিক কর্মকর্তা। তাদের প্রশ্ন, এই আইনি বৈধতার মধ্যেও নানা প্রশ্ন থেকে যাবে। এসব কর্মকর্তা বলছেন, একজনের গাড়ি আরেকজন কোনোভাবেই দান করতে পারে না। কোনো আইনেই এটা সম্ভব না।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস সূত্রে জানা গেছে, তাদের আমদানি করা ৩২ গাড়ির মধ্যে একটির বিষয়ে উচ্চ আদালতে রিট মামলা বিচারাধীন। আরেকটি গাড়ি সাবেক এক স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ও শিল্পপতি শুল্ক কর পরিশোধ করে খালাস করা হয়েছে। বাকি ৩০টি গাড়ি পরিবহন পুলে হস্তান্তর করেছে এনবিআর। এর মধ্যে সাবেক ২৪ সংসদ সদস্যের আমদানি করা গাড়ির বিষয়টি সম্বন্ধে নিশ্চিত হয়েছে কালবেলা। তারা হলেন—সুনামগঞ্জ-৪ আসনের মোহাম্মদ সাদিক, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ আসনের একরামুজ্জামান, ঝিনাইদহ-৪ আসনের নাসের শাহরিয়ার জাহেদী, সিরাজগঞ্জ-২ আসনের জান্নাত আরা হেনরি, গাইবান্ধা-২ আসনের শাহ সরোয়ার কবির, বগুড়া-৫ আসনের মো. মজিবুর রহমান, যশোর-২ আসনের মো. তৌহিদুজ্জামান, খুলনা-৩ আসনের এস এম কামাল হোসাইন, ফরিদপুর-২ আসনের সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী (প্রয়াত), গাজীপুর-৫ আসনের আকতারুজ্জামান, ময়মনসিংহ-১১ আসনের মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াহেদ, চট্টগ্রাম-১৫ আসনের আব্দুল মোতালেব, সংরক্ষিত নারী আসনের সানজিদা খানম, ঢাকা-১৭ আসনের মোহাম্মদ আলী আরাফাত, রংপুর-১ আসনের মো. আসাদুজ্জামান, নীলফামারী-৩ আসনের মো. সাদ্দাম হোসাইন (পাভেল), ঢাকা-১৯ আসনের মো. সাইফুল ইসলাম ও ময়মনসিংহ-৭ আসনের এবিএম আনিসুজ্জামান।