Image description

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত এক গভীর আর্থিক সঙ্কটে নিমজ্জিত। উৎপাদনসক্ষমতা বাড়লেও বিদ্যুতের দাম কমেনি, বরং সরকারি ভর্তুকি ও লোকসানের পাহাড় ক্রমেই উঁচু হচ্ছে। এই সঙ্কট কোনো আকস্মিক ভুল সিদ্ধান্তের ফল নয়- বরং বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা, যেখানে রাজনৈতিক ক্ষমতা, আমলাতন্ত্র ও ব্যবসায়িক স্বার্থের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে একটি সুসংগঠিত ‘রেন্ট এক্সট্রাকশন’ ব্যবস্থা।

এই বাস্তবতা উঠে এসেছে জাতীয় পর্যালোচনা কমিটির (এনআরসি) চূড়ান্ত প্রতিবেদনে, যার শিরোনাম ‘ব্যয়বহুল চুক্তির ফাঁদে আটকা পড়েছে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন : প্রশাসনিক ব্যর্থতা এবং ভাড়া আদায়ের কৌশল’ (ইধহমষধফবংয’ং চড়বিৎ এবহবৎধঃরড়হ ঞৎধঢ়ঢ়বফ রহ ঈড়ংঃষু ঈড়হঃৎধপঃং : এড়াবৎহধহপব ঋধরষঁৎবং ধহফ ঃযব গবপযধহরপং ড়ভ জবহঃ ঊীঃৎধপঃরড়হ) ২০২৬ সালের ২০ জানুয়ারি প্রকাশিত এই প্রতিবেদনটি মূলত ২০১০ সালের বিতর্কিত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহের দ্রুত বর্ধন (বিশেষ বিধান) আইনের আওতায় স্বাধীন বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের (আইপিপি) সাথে স্বাক্ষরিত চুক্তিগুলোর একটি ফরেনসিক অডিট।

উচ্চপর্যায়ের স্বাধীন পর্যালোচনা : এই কমিটির নেতৃত্ব দেন হাইকোর্ট বিভাগের সাবেক বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী। বিদ্যুৎ প্রকৌশল, অর্থনীতি, হিসাব নিরীক্ষা, আইন ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মতো বহুমাত্রিক বিষয়ে দেশের ও আন্তর্জাতিক পরিসরের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত হয় এই কমিটি।

কমিটিতে ছিলেন-প্রফেসর আবদুল হাসিব চৌধুরী (বুয়েট)- বিদ্যুৎ প্রকৌশল ও গ্রিড ব্যবস্থাপনা; আলী আশফাক, সাবেক পার্টনার, কেপিএমজি বাংলাদেশ- আর্থিক ও নিরীক্ষা বিশ্লেষণ; প্রফেসর মুশতাক হুসেইন খান, ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন- প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতি; জাহিদ হোসেন, সাবেক লিড ইকোনমিস্ট, বিশ্বব্যাংক-সামষ্টিক অর্থনীতি এবং শাহদীন মালিক, বিশিষ্ট আইনজীবী ও সংবিধান বিশ্লেষক।

কমিটির কার্যক্রমে সহায়তা করেন গবেষক ও নাগরিক সংগঠক আলী আহসান জোনায়েদ। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও প্রয়োজনীয় নথিপত্র ও প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতি উন্মুক্ত করে দেন-যা প্রতিবেদনের বিশ্বাসযোগ্যতা আরো জোরদার করেছে।

বিপিডিবির আর্থিক ধস : প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (ইচউই) আর্থিক অবস্থার অবনতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।

ক্স২০১৪-১৫ অর্থবছরে বিপিডিবির লোকসান ছিল ৫,৪৬৮ কোটি টাকা

ক্স২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫০,৫৬৫ কোটি টাকা, যা প্রায় দশ গুণ

ক্সএকই সময়ে সরকারি ভর্তুকি বেড়ে ৮,৯৭৮ কোটি টাকা থেকে ৫৯,৬০০ কোটি টাকা

ডলার হিসাবে, বিপিডিবিকে প্রতি বছর ৪-৫ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত অর্থ জোগান দিতে হচ্ছে শুধু টিকে থাকার জন্য। এই পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির জন্য কোনোভাবেই টেকসই নয় বলে মত দিয়েছে কমিটি।

দাম বাড়ানো না চুক্তি পুনঃআলোচনা- দুটোর একটিই পথ : বর্তমান ব্যয় কাঠামো অনুযায়ী বিপিডিবিকে ব্রেক-ইভেনে যেতে হলে বিদ্যুতের পাইকারি দাম প্রায় ৮৬ শতাংশ বাড়াতে হবে। কিন্তু এতে শিল্প খাতে ভয়াবহ প্রভাব পড়বে।

প্রতিবেদন বলছে, পূর্ণ ব্যয় পুনরুদ্ধার হলে বাংলাদেশের শিল্প বিদ্যুতের দাম ভিয়েতনাম, চীন, ভারত ও পাকিস্তানের তুলনায় ৮০-৯০ শতাংশ বেশি হয়ে যাবে, যা সরাসরি ডি-ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন ডেকে আনতে পারে।

অর্থাৎ, দাম বাড়ানো কোনো বাস্তবসম্মত সমাধান নয়। একমাত্র পথ-অযৌক্তিক ও অতিমূল্যের বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিগুলো পুনঃআলোচনা বা বাতিল।

পাঁচ গুণ সক্ষমতা, অর্ধেক ব্যবহার : ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা পাঁচ গুণেরও বেশি বেড়েছে। অথচ বাস্তবে ব্যবহারের হার রয়ে গেছে মাত্র ৪০-৫০ শতাংশ।

প্রতিবেদনের হিসাব অনুযায়ী, এখন বাংলাদেশের বিদ্যুতের প্রকৃত চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত সক্ষমতা: ৫,৬০০-৬,৭০০ মেগাওয়াট; জ্বালানি, গ্রিড ও লজিস্টিক সীমাবদ্ধতায় আটকে থাকা সক্ষমতা: ২,১০০-২,৮০০ মেগাওয়াট আর মোট অলস/নিষ্ক্রিয় সক্ষমতা: ৭,৭০০-৯,৫০০ মেগাওয়াট। এই অলস সক্ষমতার জন্য বিদ্যুৎ উৎপাদন হোক বা না হোক শুধু ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ প্রতি বছর ৯০০ মিলিয়ন থেকে ১.৫ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করতে হচ্ছে।

উৎপাদন নয়, বেড়েছে শুধু পেমেন্ট : ২০১১ থেকে ২০২৪- বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৪ গুণ; কিন্তু বিদ্যুৎ উৎপাদকদের মোট পেমেন্ট বেড়েছে ১১ গুণ আর ক্যাপাসিটি চার্জ বেড়েছে প্রায় ২০ গুণ। এটি স্পষ্ট করে যে সমস্যার কেন্দ্রবিন্দু উৎপাদন নয়, বরং চুক্তির শর্ত ও মূল্য নির্ধারণ।

অতিমূল্যের চুক্তির নগ্ন চিত্র : জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্কের সাথে তুলনা করে এনআরসি যে চিত্র তুলে ধরেছে, তা উদ্বেগজনক-

* সৌর বিদ্যুৎ চুক্তি: ৭০-৮০% বেশি দাম

* হাই ফার্নেস অয়েলভিত্তিক (এইচএফও) কেন্দ্র: ৪০-৫০% বেশি

* গ্যাসভিত্তিক আনসলিসিটেড প্রকল্প: ৪৫% প্রিমিয়াম

* আদানি গড্ডা চুক্তি : প্রতি ইউনিটে ৪-৫ সেন্ট অতিরিক্ত, অর্থাৎ প্রায় ৫০% বেশি দাম

বিতর্কিত প্রকল্পগুলোর তালিকা : প্রতিবেদনে কয়েকটি প্রকল্পকে ‘চরম অনিয়মের উদাহরণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আদানি পাওয়ার (গড্ডা): পুরোপুরি ভারতের ভেতরে অবস্থিত কেন্দ্র; কয়লার দাম, কর ও নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশের কোনো সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ নেই। এসএস পাওয়ার: দু’টি বৃহৎ কেন্দ্র এক চুক্তিতে-মূল্য প্রতিযোগিতা নষ্ট। সামিট (মেঘনাঘাট): একই স্থানে একাধিক কেন্দ্র, গ্যাসসঙ্কটে ব্যবহার ধসে পড়ে। রিলায়েন্স-জেরা: ভারতের অলস সক্ষমতা বাংলাদেশে চাপিয়ে দেয়া। পায়রা কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র: অকার্যকর বন্দরের ওপর নির্ভরশীল। রূপসা বিদ্যুৎকেন্দ্র: নিশ্চিত জ্বালানি ছাড়াই চালু।

ভুল নয়, পরিকল্পিত লুট : এনআরসির সবচেয়ে শক্তিশালী পর্যবেক্ষণ- ‘এই সিদ্ধান্তগুলো ভুল ছিল না, এগুলো ছিল পরিকল্পিত। উদ্দেশ্য ছিল অতিরিক্ত মুনাফা সৃষ্টি করা এবং তা রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক অংশীদারদের মধ্যে বণ্টন করা।’

২০১০ সালের বিশেষ আইন এই লুটতন্ত্রকে সহজ করেছে, তবে সেটিই একমাত্র কারণ নয়। প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও জবাবদিহির অভাব পুরো ব্যবস্থাকে বিকৃত করেছে।

করণীয় : রুট অ্যান্ড ব্রাঞ্চ সংস্কার

কমিটির সুপারিশগুলো স্পষ্ট ও কঠোর। প্রমাণিত দুর্নীতির ক্ষেত্রে চুক্তি বাতিল; সব আইপিপি চুক্তির পুনঃআলোচনা; বিইআরসিকে শক্তিশালী করা; নতুন জ্বালানি তদারকি কমিশন গঠন এবং বিপিডিবি ও বিদ্যুৎ বিভাগে প্রযুক্তিগত ও আইনগত সক্ষমতা বৃদ্ধি। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত আজ আর উন্নয়নের প্রতীক নয়, বরং রাষ্ট্রীয় লুটতন্ত্রের এক ভয়াবহ উদাহরণ। এই সঙ্কটের বোঝা বহন করছেন করদাতা ও শিল্প খাত। এখনই যদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কাঠামোগত সংস্কার না আসে, তাহলে বিদ্যুৎ খাত শুধু অর্থনীতিকে নয়-রাষ্ট্রের সার্বিক স্থিতিশীলতাকেও ঝুঁকির মুখে ফেলবে। এই প্রতিবেদন এক অর্থে সতর্কবার্তা, আরেক অর্থে সংস্কারের শেষ সুযোগ।