গণভোটের ব্যালটে ‘না’ ভোট দেওয়ার জন্য পুরনো ফ্যাসিবাদী এবং ‘নতুন ফ্যাসিবাদিদের’ মধ্যে ঐক্যের অভিযোগ এনেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র ও কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া। তিনি বলেছেন, ১২ ফেব্রুয়ারি ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে ব্যালট বিপ্লবের মাধ্যমে তাদের সেই ঐক্য নস্যাৎ করে দেওয়া হবে।
সোমবার (২৬ জানুয়ারি) দুপুরে চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলা সদরে এনসিপির নির্বাচনি পদযাত্রা উপলক্ষ্যে আয়োজিত সমাবেশে তিনি এসব কথা বলেন।
সমাবেশে চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী ও নগরীর একাংশ) ও পার্বত্য জেলা বান্দরবান আসনে ১১ দলীয় জোটের এনসিপির প্রার্থী জোবাইরুল হাসান আরিফ ও সুজা উদ্দিনকে পরিচয় করে দেন আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের মতো আগামী ১২ ফেব্রুয়ারিকে ‘গুরুত্বপূর্ণ দিন’ উল্লেখ করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি পাঁচ আগস্টের পর আরেক গুরুত্বপূর্ণ ক্রান্তিকাল হিসেবে আমাদের সামনে এসে উপস্থিত হয়েছে। পাঁচ আগস্ট একদিনে চার থেকে পাঁচশত মুক্তিকামী শহিদের রক্তের বিনিময়ে আমরা বাংলাদেশ থেকে শেখ হাসিনাকে তাড়াতে সফল হয়েছিলাম। আবার আরেকটি সেরকম দিন হিসেবে ১২ ফেব্রুয়ারি আমাদের সামনে আছে।’
‘পাঁচ আগস্টের জন্য আমাদের অনেক রক্ত দিতে হয়েছিল। কিন্তু ১২ ফেব্রুয়ারির জন্য আমাদের রক্ত দিতে হবে না, শুধু সিল দিতে হবে। একটা সিলের মাধ্যমে আমরা শত, সহস্র শহিদের রক্তের মাধ্যমে যা অর্জন করেছিলাম তা রক্ষা করতে পারব। এই সুযোগ আমাদের কাজে লাগাতে হবে।’
১৭ বছরের অত্যাচার-নির্যাতনের নমুনা গত ১৭ মাসে আবার দেখা গেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা দেখেছি, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর, ৫ আগস্টের আগে ১৭ বছর ধরে যেভাবে এদেশের মানুষকে অত্যাচার, নির্যাতন, গুম, খুন, জেলখানায় অত্যাচার করা হয়েছে, একইভাবে তার একটা ডেমো আমরা গত ১৭ মাসে দেখেছি। আমরা দেখেছি, ১৭ বছরের অত্যাচারের নতুন রূপ নাজিল হয়েছে। আমরা দেখেছি কীভাবে গ্রামের অলিগলি থেকে শুরু করে শহরের অলিগলি, বাজার থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পর্যন্ত চাঁদাবাজি এবং সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা হয়েছে।’
‘আমরা যদি এই চাঁদাবাজদের, এই সন্ত্রাসীদের আর না দেখতে চাই, তাহলে আমাদের এবার রাজপথে নয়, ব্যালটে বিপ্লব সাধন করতে হবে। সেই লক্ষ্যে বাংলাদেশের মুক্তিকামী ১১টি রাজনৈতিক দল আজ একত্রিত হয়েছে। এখন সময় ভোটারদের অর্থাৎ আপনাদের একত্রিত হওয়ার এবং এই জোটকে সাফল্যমণ্ডিত করার।’
১১ দলীয় জোটের প্রার্থীরা দেশ ও জাতির মুক্তির প্রতীক উল্লেখ করে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, ‘আপনারা জানেন, ইতোমধ্যে ৩০০ আসনে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী ঘোষিত হয়েছে। আপনারা তাদের এই জাতির, এই দেশের মুক্তির প্রতীক হিসেবে দেখবেন। কার কী মার্কা সেটা দেখার সময় নেই, আমরা শুধু দেখব এদেশের জনগণ হিসেবে এদেশের মুক্তি কোন প্রার্থী, কোন জোট এনে দিতে পারবে আমরা সবাই চোখ বন্ধ করে তাদের ভোট দেব। আমাদের ভোটের মাধ্যমে আমাদের এই প্রজন্মের এবং পরবর্তী প্রজন্মের স্বাধীনতা এবং মুক্তি নিহিত হয়ে থাকবে।’
বোয়ালখালীতে জোবাইরুল হাসান আরিফকে শাপলাকলি প্রতীকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এনসিপি এবং ১১ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে আহ্বান থাকবে, আপনারা আরিফ ভাইকে জয়যুক্ত করবেন এবং তার মাধ্যমে বাংলাদেশকে এবং বোয়ালখালী আসনকে জয়যুক্ত করবেন। বোয়ালখালী আসনে শুধু একটা মার্কায় সিল পড়বে, বাংলাদেশের জনগণের মুক্তির জন্য শুধু একটা মার্কায় সিল পড়বে।’
‘আপনাদের একটা ভোটের মাধ্যমে এবার বাংলাদেশ দীর্ঘকালিন স্বাধীনতা ও মুক্তির দিকে এগিয়ে যাবে। বাংলাদেশ সুশাসনের দিকে এগিয়ে যাবে। বাংলাদেশ সংস্কারের দিকে এগিয়ে যাবে। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন পর আবারও সার্বভৌমত্বের পথে এগিয়ে যাবে।’
সংস্কার ও গণভোট প্রসঙ্গে আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘একটি রাজনৈতিক দল বিগত ১৭ বছর ধরে সংস্কারের কথা বলে আসছে। কিন্তু যখন সংস্কারের সময় এসেছে, তখন তাদের আওয়াজ বন্ধ হয়ে গেছে। আমরা শুধু আমাদের প্রার্থীদের জন্য ভোট চাচ্ছি না। আপনারা যদি ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীদের নির্বাচিত করেন, আমরা হয়তো ৫বছর আপনাদের দায়িত্ব নিয়ে সার্ভিস দিতে পারব। তবে আপনারা যদি গণভোটকে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করেন, শুধু আপনি কিংবা আমি না, আমাদের সন্তানরা, আমাদের সন্তানদের পরবর্তী প্রজন্মও এর সুফল ভোগ করবে। সুতরাং আমরা ১২ ফেব্রুয়ারি গণভোটে হ্যাঁ-এর পক্ষে ভোট দেব।’
‘আমরা দেখছি, পরাজিত ফ্যাসিবাদি শক্তি এবং যারা নতুন করে ফ্যাসিবাদি শক্তি হয়ে উঠতে চায়, গণভোটে ‘না’ ভোটকে জয়যুক্ত করার জন্য তাদের মধ্যে একধরনের ঐক্য গঠিত হয়েছে। আমরা পাঁচ আগস্ট যেভাবে ফ্যাসিবাদি শক্তিকে দেশ থেকে বিতাড়িত করেছি, ১২ ফেব্রুয়ারি ব্যালট বিপ্লবের মাধ্যমে আমরা তাদের এই ঐক্যকে আবার নস্যাৎ করে দেব। গণভোটের ব্যালটে আমরা সবাই ‘হ্যাঁ’ ভোট দেব।’
এর আগে, সকালে চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলায় জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নিহত কিশোর মো. ইশমামুল হক চৌধুরীর কবর জিয়ারতের মধ্য দিয়ে এনসিপির নির্বাচনি পদযাত্রা শুরু হয়।
কবর জিয়ারত শেষে আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া সাংবাদিকদের বলেন, ‘ইশমামুল হকরা যে কারণে জীবন দিয়েছেন, এই নির্বাচনের মাধ্যমে সেই স্বপ্নের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হবে। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে তাদের (জুলাই শহিদদের) আকাঙ্ক্ষিত যে সংস্কার, সেটির বাস্তবায়ন সম্ভব হবে।’
এসময় আসিফ মাহমুদের সঙ্গে জাতীয় যুবশক্তির কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক তরিকুল ইসলাম, এনসিপির চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সুজা উদ্দিন এবং চট্টগ্রাম অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক মো. জোবাইরুল হাসান আরিফ উপস্থিত ছিলেন।