রপ্তানিমুখী নিটওয়্যার শিল্পে ব্যবহৃত ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের সুতা আমদানিতে বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধা প্রত্যাহার কেন্দ্র করে দেশের টেক্সটাইল ও পোশাক খাতের তিন শীর্ষ সংগঠন মুখোমুখি।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ), বাংলাদেশ গার্মেন্টস প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি এবং বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) মধ্যে তীব্র মতবিরোধ দেখা দিয়েছে বিষয়টি নিয়ে। এরই মধ্যে সংগঠনগুলো একে অপরের বক্তব্যকে বিভ্রান্তিকর ও একতরফা বলে অভিযোগ করেছে।
গত ১২ জানুয়ারি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাছে একটি চিঠি পাঠিয়ে ১০-৩০ কাউন্টের সুতা আমদানিতে বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধা প্রত্যাহারের অনুরোধ জানায়। এরপর এক সংবাদ সম্মেলনে তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা স্পিনিং খাত ও সুতা আমদানি সংক্রান্ত কিছু তথ্য উপস্থাপন করেন, যা সঠিক নয় বলে দাবি করেছে বিটিএমএ।
যেসব সুতা শতভাগ স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করা সম্ভব, সেগুলো বন্ড সুবিধার বাইরে আনার সক্ষমতা দেশের মিলগুলোর রয়েছে। এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা ও কর্মকর্তা তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তাদের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করেছেন।- বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ
বিটিএমএর অবস্থান
বিটিএমএ তার ব্যাখ্যায় বলেছে, বিটিএমএর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিটিএমএ, বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর সঙ্গে আলোচনার পরই ট্যারিফ কমিশন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন দাখিল করে। সেই প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় শুধু ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের সুতা (এইচএস কোড ৫২০৫, ৫২০৬ ও ৫২০৭) বন্ড সুবিধার বাইরে রাখার সুপারিশ করেছে। এতে নতুন কোনো শুল্ক আরোপ বা সেফগার্ড ডিউটির প্রস্তাব নেই।
বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ বলেন, ‘বন্ড সুবিধার আওতায় শুল্কমুক্ত সুতা আমদানির মাধ্যমে তৈরি পোশাক খাতের দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো বাস্তব সুবিধা পাচ্ছে না। বরং এই সুবিধার মূল ভোগী হচ্ছে বিদেশি ক্রেতারা। অন্যদিকে, স্থানীয় স্পিনিং মিলগুলো বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেও পার্শ্ববর্তী দেশের সরকারের দেওয়া প্রতি কেজিতে প্রায় ৫০ সেন্ট ভর্তুকির কারণে টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘যেসব সুতা শতভাগ স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করা সম্ভব, সেগুলো বন্ড সুবিধার বাইরে আনার সক্ষমতা দেশের মিলগুলোর রয়েছে। এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা ও কর্মকর্তা তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তাদের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করেন।’
সরকারের পক্ষ থেকে একাধিক বৈঠকের দাবি ভুল উল্লেখ করে তারা জানায়, মাত্র একটি অসম্পূর্ণ বৈঠক হয়েছে। একইভাবে, দেশীয় শিল্পের স্বার্থে তিন সংগঠনের একমত হওয়ার দাবিও তারা প্রত্যাখ্যান করে।- বিকেএমইএ
বিটিএমএ সভাপতি বলেন, ‘বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের পর রপ্তানিতে ৪০ শতাংশ স্থানীয় মূল্য সংযোজনের শর্ত পূরণ করতে হবে, যা যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও প্রযোজ্য হতে পারে।’
এ প্রেক্ষাপটে তিনি সরকারকে ‘অর্থনৈতিক আধিপত্যবাদের হুমকি থেকে দেশকে রক্ষা করতে’ দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।
বিকেএমইএর পাল্টা অভিযোগ
বিটিএমএর এসব বক্তব্যকে সম্পূর্ণ ভুল ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছে বিকেএমইএ। সংগঠনটির নেতারা বলেন, ট্যারিফ কমিশনের সঙ্গে যে বৈঠক হয়েছিল তা মূলত ২০ শতাংশ সেফগার্ড ডিউটি আরোপের প্রস্তাব নিয়ে এবং ভবিষ্যতে আরও তথ্য–উপাত্ত যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার শর্তে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ছাড়াই বৈঠক শেষ হয়। অথচ সেই বৈঠকের কার্যবিবরণী প্রকাশের আগেই বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের সুপারিশ করা হয়।
বিকেএমইএর মতে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বৈঠক না করেই একতরফাভাবে সুপারিশ দিয়েছে। তারা আরও অভিযোগ করে যে, যেসব তথ্য–উপাত্ত যাচাইয়ের কথা বলা হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ একপাক্ষিক এবং এর মাধ্যমে সুতা খাতে মনোপলি ব্যবসার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
বন্ড সুবিধা থেকে তৈরি পোশাক খাত কোনো লাভ পাচ্ছে না—এমন বক্তব্যের বিরোধিতা করে বিকেএমইএ জানায়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ক্রেতারা যেখানে কম দাম পায়, সেখান থেকেই কাঁচামাল সংগ্রহ করে। কাঁচামালের সহজলভ্যতাই বাংলাদেশের নিটওয়্যার শিল্পের প্রধান শক্তি। আর এর মাধ্যমেই তারা অর্ডার পাচ্ছে।
বন্ড সুবিধার সুফল কেবল বিদেশি ক্রেতারা পায়—এ দাবি সঠিক নয়। বন্ড ও ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি সুবিধাই গত কয়েক দশকে দেশের পোশাক শিল্পকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সক্ষম করেছে।- বিজিএমইএ
স্থানীয় স্পিনিং মিলগুলো প্রতিবেশী দেশের ভর্তুকির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত—এ দাবির জবাবে বিকেএমইএ বলছে, যদি সত্যিই অতিরিক্ত ভর্তুকি দেওয়া হয়, তাহলে অ্যান্টি-ডাম্পিংয়ের আবেদন করা উচিত। তাদের দাবি, সুতায় প্রকৃত সুবিধা ৫ শতাংশের মতো, যা অন্য খাতও একইভাবে মোকাবিলা করে রপ্তানি করছে।
বিকেএমইএ আরও জানায়, বাংলাদেশের সুতা শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা এখনো যথেষ্ট নয়। সরকারের পক্ষ থেকে একাধিক বৈঠকের দাবি ভুল উল্লেখ করে তারা জানায়, মাত্র একটি অসম্পূর্ণ বৈঠক হয়েছে। একইভাবে, দেশীয় শিল্পের স্বার্থে তিন সংগঠনের একমত হওয়ার দাবিও তারা প্রত্যাখ্যান করে।
এলডিসি উত্তরণ পরবর্তী ৪০ শতাংশ স্থানীয় মূল্য সংযোজনের বাধ্যবাধকতা প্রসঙ্গে বিকেএমইএ বলে, এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। পোশাক খাতে বাংলাদেশের জিএসপি প্লাস সুবিধা পাওয়া সম্পূর্ণ অনিশ্চিত।
সবশেষে বিকেএমইএ মন্তব্য করে, সুতা কারখানাগুলোর উচিত রপ্তানিতে সরাসরি সক্ষমতা বাড়ানো। জোর করে ব্যবসা চাপিয়ে দেওয়া কোনো সমাধান নয়।
বিজিএমইএ যা বলছে
সুতা আমদানি ও বন্ড সুবিধা নিয়ে বিটিএমএ সভাপতির প্রকাশিত বক্তব্যের সঙ্গে বিজিএমইএ দ্বিমত পোষণ করছে। বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর ১৯ জানুয়ারির যৌথ সংবাদ সম্মেলনে উপস্থাপিত তথ্যগুলো পরিসংখ্যানভিত্তিক ও বাস্তবসম্মত।
প্রথমত, বিটিএমএ সভাপতি দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে আলোচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বাস্তবে ৮ জানুয়ারি ট্যারিফ কমিশনের সভার কার্যবিবরণী প্রকাশিত হয় ১৩ জানুয়ারি, অথচ তার আগের দিনই ১২ জানুয়ারি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের বিষয়ে এনবিআরকে চিঠি দেয়। এতে স্পষ্ট যে, সিদ্ধান্তটি আগেই নেওয়া হয়েছিল এবং আলোচনাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।
দ্বিতীয়ত, বলা হয়েছে যে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহার মানেই নতুন শুল্ক আরোপ নয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বর্তমানে সুতা আমদানিতে মোট শুল্ক প্রায় ৩৯ শতাংশ, যা রপ্তানিমুখী শিল্পে বন্ড সুবিধার কারণে কার্যত শূন্য। এই সুবিধা তুলে নেওয়া হলে সরাসরি সেই করভার শিল্পের ওপর পড়বে, যা উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াবে।
তৃতীয়ত, বন্ড সুবিধার সুফল কেবল বিদেশি ক্রেতারা পায়—এ দাবি সঠিক নয়। বন্ড ও ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি সুবিধাই গত কয়েক দশকে দেশের পোশাক শিল্পকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সক্ষম করেছে। সুতা আমদানিতে কৃত্রিম বাধা সৃষ্টি হলে ক্রেতারা অর্ডার অন্য দেশে সরিয়ে নিতে পারে বা বিদেশ থেকে গ্রে ফেব্রিক আমদানির শর্ত আরোপ করতে পারে, যা দেশীয় নিটিং ও কম্পোজিট মিলগুলোর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
চতুর্থত, প্রতিবেশী দেশগুলোর ভর্তুকি নিয়ে তথ্যের অসামঞ্জস্য রয়েছে। সংবাদে যেখানে প্রতি কেজিতে ৫০ সেন্ট ভর্তুকির কথা বলা হয়েছে, সেখানে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ১২ জানুয়ারির চিঠিতে উল্লেখ রয়েছে প্রায় ৩০ সেন্ট। নীতিনির্ধারণে এমন তথ্যগত বিভ্রান্তি কাম্য নয়।
পঞ্চমত, এলডিসি উত্তরণের পর রপ্তানি সুবিধা পেতে দেশি সুতা ব্যবহার বাধ্যতামূলক—এ ধারণা সঠিক নয়। প্রযোজ্য নিয়ম হলো ‘ডাবল ট্রান্সফরমেশন’। অর্থাৎ, বিদেশ থেকে সুতা আমদানি করেও দেশে কাপড় ও পোশাক তৈরি করলে প্রয়োজনীয় মূল্য সংযোজন অর্জন সম্ভব।
চার দশকের শ্রম ও বিনিয়োগে গড়ে ওঠা দেশের পোশাক শিল্প আজ বিশ্ববাজারে দ্বিতীয় অবস্থানে এবং অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। এই শিল্প ৪০ লাখের বেশি মানুষের প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান ও কোটি মানুষের জীবিকায় ভূমিকা রাখছে। তাই শিল্পের ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে—এমন দায়িত্বহীন বক্তব্য কাম্য নয়।