Image description
গণভোট ঘিরে ‘হ্যাঁ’-‘না’ মেরুকরণ জটিল হচ্ছে

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি দেশে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। প্রথমবারের মতো দেশে একই দিনে গুরুত্বপূর্ণ এ দুটি ভোট অনুষ্ঠিত হবে। এই ভোট ঘিরে দেশের রাজনৈতিক মাঠ ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। এক দিকে জুলাই জাতীয় সনদের আইনিভিত্তি নিশ্চিত করতে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে মাঠে নেমেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারা। অন্য দিকে সময় যত গড়াচ্ছে ততই ‘না’ ভোটের পক্ষে সংগঠিত ও দৃশ্যমান হচ্ছে ফ্যাসিবাদী শক্তি ও তাদের দোসররা। এত দিন আওয়ামী ফ্যাসিবাদী বলয় নীরবে বা আড়ালে ‘না’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নিলেও এবার প্রকাশ্যে সেই অবস্থানে দাঁড়িয়েছে জাতীয় পার্টি। দলটির চেয়ারম্যান জি এম কাদের সরাসরি গণভোট প্রত্যাখ্যান করে ‘না’ ভোট দেয়ার আহ্বান জানিয়ে মাঠের রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন।

জানা যায়, গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচারণার দায়িত্ব দেয়া হয় প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (উপদেষ্টার মর্যাদায়) অধ্যাপক আলী রীয়াজকে। তার সাথে আরেক বিশেষ সহকারী মনির হায়দার (সিনিয়র সচিব মর্যাদায়) ইতোমধ্যে বিভাগীয় পর্যায়ে কর্মকর্তাদের সাথে মতবিনিময় করেছেন। ইমাম সম্মেলনসহ মাঠ পর্যায়ের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সাথেও বৈঠক করেছেন। তাদের সাথে বৈঠকে ইতোমধ্যে তারা স্পষ্ট করেছেন গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচারণায় সরকারি কর্মকর্তাদের কোনো ধরনের আইনি বাধা নেই। ‘ভোটের গাড়ি’সহ ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষের প্রচারণায় সরকারের বিভিন্ন উইংকে সক্রিয় করার চেষ্টা করা হচ্ছে। প্রধান উপদেষ্টার দুই বিশেষ সহকারী বিভাগীয় শহরগুলোতে মতবিনিময় শেষে এখন দফতরভিত্তিক প্রচারণায় নামার উদ্যোগ নিয়েছেন। ইতোমধ্যে ইমাম সমাবেশসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা ও সমাজের প্রতিনিধিদের সাথে আলোচনা করা হয়েছে।

এরই ধারাবাহিকতায় গত সোমবার সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটে সিল দেয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ’ ভোটের মাধ্যমে নতুন বাংলাদেশ গড়ার পথ খুলবে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা বাস্তবায়নে এটি একটি ঐতিহাসিক সুযোগ। সম্প্রতি জেলা সফরে যাচ্ছেন সরকারের বিভিন্ন উপদেষ্টা। তারাও ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণায় অংশ নিচ্ছেন, মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে বক্তব্য দিচ্ছেন।

অন্য দিকে, এই গণভোটের বিরুদ্ধে সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠ অবস্থান নিয়েছে জাতীয় পার্টি। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে জাপা চেয়ারম্যান জি এম কাদের ১২ ফেব্রুয়ারির গণভোটে ‘না’ ভোট দেয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, এই গণভোট সংবিধানবিরোধী, অবাস্তব এবং বাস্তবায়িত হলে দেশ অস্থিতিশীলতার দিকে এগিয়ে যাবে। তার দাবি, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সাংবিধানিক সরকারের শপথ নিয়েছে, অথচ সংবিধান সংশোধনের মতো জটিল বিষয় গণভোটের মাধ্যমে আনার কোনো বিধান সংবিধানে নেই। সংবিধান অনুযায়ী, কেবল নির্বাচিত সংসদই নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় সংবিধান সংশোধন করতে পারে।

জি এম কাদের আরো বলেন, এত জটিল বিষয় সাধারণ মানুষের সামনে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ প্রশ্নে উপস্থাপন করা অযৌক্তিক। গ্রাম পর্যায়ের মানুষের কাছে বিষয়টি এভাবে তোলা অবাস্তব বলেও মন্তব্য করেন তিনি। প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলো বাস্তবায়িত হলে দেশ অচল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করে জাপা চেয়ারম্যান বলেন, প্রধান নির্বাহী বা প্রধানমন্ত্রীকে কার্যত ক্ষমতাহীন করে রাষ্ট্র পরিচালনা সম্ভব নয়। স্বৈরাচার ঠেকানোর নামে যদি অকার্যকর সরকার তৈরি করা হয়, তা হলে রাষ্ট্র পরিচালনায় সঙ্কট তৈরি হবে। সংবাদ সম্মেলনে তিনি স্পষ্ট করে জানান, জাতীয় পার্টি এই গণভোট প্রত্যাখ্যান করবে এবং সবাইকে ‘না’ ভোট দেয়ার আহ্বান জানাবে। আওয়ামী ফ্যাসিস্ট বা তাদের সমর্থকদের পক্ষ থেকে সামাজিক মাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে গণভোট বিরোধী বা ‘হ্যাঁ’ ভোটের বিপক্ষে প্রচারণা অব্যাহত রেখেছে। তবে, জাতীয় পার্টির ‘হ্যাঁ’ ভোট-বিরোধী সরাসরি অবস্থান নতুন করে তাদের ফ্যাসিবাদের দোসর হিসেবে চিহ্নিহ্নহ্নত করেছে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ দিকে, ফ্যাসিবাদবিরোধী শক্তির ভেতরের মতভেদ ও সমন্বয়হীনতা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে। জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ কয়েকটি দল জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নিলেও মাঠ পর্যায়ে বিএনপির উপস্থিতি এখনো চোখে পড়েনি। দলটির তৃণমূল নেতাকর্মীদের গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটের বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা না থাকায় কোথাও ‘হ্যাঁ’, কোথাও ‘না’-এর পক্ষে প্রচারণা চালানোর অভিযোগ উঠেছে। এমনকি দলটির সিনিয়র নেতাদের বক্তব্যেও সমন্বয়হীনতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের অভিমত।

সরকারের পক্ষ থেকে মাঠ পর্যায়ে প্রচারণা আরো জোরদার করা হচ্ছে। গতকাল সুনামগঞ্জে জেলা প্রশাসনের আয়োজনে গণভোট ২০২৬ সংক্রান্ত জনসচেতনতামূলক সভায় ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারি দুটি ভোট অনুষ্ঠিত হবে, একটি সংসদ নির্বাচনের, অন্যটি গণভোটের। সাদা ব্যালটে সংসদ নির্বাচনের ভোট এবং গোলাপি ব্যালটে গণভোটের ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’ ভোট দেয়া হবে। তিনি গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেয়ার আহ্বান জানান।

১৯৪৭ সালের সিলেট গণভোটের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, গণভোট ইতিহাস বদলে দেয়, দেশের চেহারা পাল্টে দেয়। আসন্ন গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন আসবে এবং দেশ সর্বগ্রাসী ফ্যাসিজম ও স্বৈরতান্ত্রিক শোষণ থেকে মুক্তি পাবে।

একই দিন খুলনায় শহীদ হাদিস পার্কে গণভোট বিষয়ে জনসচেতনতামূলক সভায় খাদ্য ও ভূমি উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আত্মত্যাগকারীদের আকাক্সক্ষা ছিল প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে দেশ পরিচালনার নতুন স্বপ্ন। সেই লক্ষ্যেই বিভিন্ন সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব সমন্বয় করে প্রণীত হয়েছে জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫। এই সনদের স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেয়ার আহ্বান জানান তিনি। উপদেষ্টা আরো বলেন, এবারের নির্বাচনে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করবে এবং জনগণের রায় অনুযায়ী নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে অন্তর্বর্তী সরকার বিদায় নেবে।

সব মিলিয়ে, ফ্যাসিবাদ-বিরোধী শক্তির ভেতরের বিভাজন ও দ্বিধার সুযোগ নিয়ে ‘না’ ভোটের পক্ষে ফ্যাসিবাদী শক্তির তৎপরতা বাড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এর বিপরীতে, সরকার ও সংস্কারপন্থীরা গণভোটকে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের ঐতিহাসিক সুযোগ হিসেবে তুলে ধরে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। ১২ ফেব্রুয়ারির গণভোটই নির্ধারণ করবে- জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ঘোষিত সংস্কারপথ কতটা এগোতে পারবে।