ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতা ভঙ্গ ও ‘ওয়ান বক্স পলিসি’ হাইজ্যাকের অভিযোগ তুলেছেন দলটির নেতারা। শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) কুয়াকাটায় ইসলামী আন্দোলনের নেতা মুফতি হাবিবুর রহমান মিসবাহ নিজের ফেসবুক পোস্টে এসব অভিযোগ তুলে ধরেন।
পোস্টে তিনি দাবি করেন, আসন সংখ্যা মূল সমস্যা নয় বরং ভিন্ন একটি গভীর সংকটের কারণে সমঝোতা ভেঙে পড়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, পীর সাহেব চরমোনাই হাফিজাহুল্লাহ ইসলামী শক্তিকে ক্ষমতায় আনতে ‘ওয়ান বক্স পলিসি’ বা সমঝোতার একটি ফর্মুলা সামনে আনেন। তবে জামায়াত আমীর এটিকে ‘ইসলামী সমঝোতা নয়, রাজনৈতিক সমঝোতা’ বলে উল্লেখ করায় সমঝোতার নীতিগত ভিত্তিই ভেঙে যায়।
মুফতি হাবিবুর রহমান মিসবাহ লেখেন, সমঝোতার শুরুতেই পীর সাহেব চরমোনাই আন্তরিকতার সঙ্গে জামায়াত আমীরকে আকীদা বিষয়ে জাতির সামনে স্পষ্ট অবস্থান জানানোর আহ্বান জানান। তবে সে আহ্বানে সাড়া দেওয়া হয়নি। তিনি আরও দাবি করেন, ইসলামী আন্দোলন যেখানে নীতি ও শরিয়াহ বাস্তবায়নে ‘ইবাদাতের রাজনীতি’ করে, সেখানে জামায়াত আমীর নারী-পুরুষের বৈষম্য দূর করার নামে পুরুষদের সরিয়ে নারীদের সঙ্গে সেলফি তোলাকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন—যা শরিয়াহবিরোধী বলেও মন্তব্য করা হয়।
পোস্টে বলা হয়, এসব বিষয় নিয়ে পীর সাহেব চরমোনাই গভীরভাবে চিন্তাভাবনা শুরু করেন এবং আলেমদের সঙ্গেও পরামর্শ চালিয়ে যান। এরই মধ্যে আসন বণ্টন নিয়ে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। অভিযোগ করা হয়, ইসলামী আন্দোলনের চাহিদাসম্পন্ন আসনের অধিকাংশ জামায়াত নিজেদের এবং এনসিপির জন্য বরাদ্দ রাখে। নিজেদের আসন কমানো ছাড়াই ইসলামী আন্দোলনের কোটা থেকে এনসিপিকে ৩০টি আসন ঘোষণা দেওয়া হয়।
মুফতি মিসবাহর দাবি, ইসলামী আন্দোলনের জন্য যে ৪০–৪৫টি আসন প্রস্তাব করা হয়, সেখানে জামায়াতের পর্যাপ্ত ভোট নেই, যার সহযোগিতায় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ (আইএবি) নির্বাচনে উত্তীর্ণ হতে পারে। তিনি প্রশ্ন তোলেন—এ ধরনের প্রস্তাব আদৌ কীভাবে সমঝোতা হতে পারে?
তিনি আরও অভিযোগ করেন, বিভিন্ন অপকৌশলের মাধ্যমে ইসলামী আন্দোলনের রাজনীতি সংকুচিত করার ‘নীলনকশা’ আঁকছে জামায়াত। তাঁর ভাষায়, “যে দল সমঝোতার রূপকার, তাকেই রাজনৈতিকভাবে নিশ্চিহ্ন করতে চাইলে ঐক্য টিকে থাকে কীভাবে?”
পোস্টে উল্লেখ করা হয়, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ৪০–৪৫ কিংবা ৫০ আসনেও নির্বাচনে অংশ নিতে প্রস্তুত ছিল। পীর সাহেব চরমোনাই ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত অপেক্ষা করতেও রাজি ছিলেন এবং সমঝোতা ভাঙতে চাননি। তবে এর মধ্যেই জামায়াতের আরেকটি অবস্থান সামনে আসে। অভিযোগ অনুযায়ী, জামায়াত নেতারা জানান—ক্ষমতায় গেলে তারা প্রচলিত সংবিধান পরিবর্তন করবেন না এবং শরিয়াহ আইনও বাস্তবায়ন করবেন না। এতে করে ‘ওয়ান বক্স পলিসি’র মূল উদ্দেশ্যই ভেঙে পড়ে।
এই প্রেক্ষাপটে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ দেশের শীর্ষ মুরুব্বীদের দ্বারস্থ হয় এবং শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) বিকাল ৩টায় সংবাদ সম্মেলনের ঘোষণা দেয়। সংবাদ সম্মেলনে তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হবে বলে উল্লেখ করা হয়।
পোস্টের শেষাংশে অতীত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলা হয়, জামায়াতের সঙ্গে না থাকলেই কাউকে ‘ঐক্যবিরোধী’ আর থাকলেই ‘বিপ্লবী’ বানানো হয়—এমন বয়ান সঠিক নয়। ২০০১ সালে শরিয়াহ প্রশ্নে ইসলামী আন্দোলন বিএনপি জোটে যোগ দেয়নি এবং সে সময় পীর সাহেব চরমোনাই আট দফা দাবি উত্থাপন করেছিলেন। তখন বিএনপি স্পষ্ট করেছিল তারা নীতির নয়, ক্ষমতার রাজনীতি করে।
এ প্রসঙ্গে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়, ২০২৫ সালের ২৮ জুন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ইসলামী আন্দোলনের জাতীয় মহাসমাবেশে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল গোলাম পরোয়ার পীর সাহেব চরমোনাইকে ‘ঐক্যের মহাকাণ্ডারী’ বলে আখ্যা দেন। অথচ স্বার্থ পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে জামায়াতের বয়ানও বদলে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়।
পোস্টে আরও বলা হয়, সমঝোতা ভাঙার প্রাক্কালে জামায়াত এখন বয়ান তৈরি করছে—‘আইএবি বিএনপির দালাল’। এ ধরনের বক্তব্যকে দ্বিচারিতা ও স্বেচ্ছাচারিতার উদাহরণ হিসেবেও উল্লেখ করা হয়।