আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হলে সংবিধানের প্রস্তাবনার শুরু থেকে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ বা ‘আল্লাহর নাম’ বাদ দেওয়া হবে -এরকম দাবি সম্বলিত পোস্ট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
এরকম কিছু পোস্ট দেখুন এখানে, এখানে এবং এখানে।
১১ জানুয়ারি বিকেলে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় বিএনপির এক অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে জেলা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের নেতা জুয়েল আরমান নারায়নগঞ্জ-৪ (ফতুল্লা) আসনের ভোটারদের ‘না’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, “আগামী ১২ তারিখ গণভোটের একটি আয়োজন করেছে। এ গণভোটটার দিকে আমরা সবাই লক্ষ্য করবো। যদি ‘না’ ভোট জয়যুক্ত হয়, তাহলে সংবিধানে বিসমিল্লাহ এবং আল্লাহর নাম জয়যুক্ত হবে; যদি ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়যুক্ত হয়, তাইলে সংবিধানে বিসমিল্লাহ এবং আল্লাহর নামে শুরু করলাম, এটা পরাজিত হবে।”
এ বক্তব্যের ভিডিও সংবাদমাধ্যম কালের কণ্ঠের ফেসবুক পেজ থেকেও পোস্ট করা হয়।
এছাড়াও একাধিক বক্তব্যে ইসলামী বক্তা ড. এনায়েত উল্লাহ আব্বাসীকে গণভোটে ‘হ্যা’ ভোট দেওয়ার বিপক্ষে প্রচারণা চালাতে দেখা যায়।
Abbasi Monjil Joinpur নামের একটি ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে ২০২৫ সালের ৭ নভেম্বর প্রকাশিত ৬ মিনিট ২৯ সেকেন্ডের একটি ভিডিওতে এমন বক্তন্য পাওয়া যায়।
ভিডিওটির ৪:৫৫ মিনিট থেকে ৫:৫০ মিনিটের মধ্যে গণভোটে ‘না’ ভোট দেওয়ার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে তিনি বলেন, “আর বর্তমান যে গণভোট, এটা যদি হয় বর্তমান সনদকে স্বীকৃতি দেবার জন্যে, যদি গণভোটে কোন মুসলমান যায়, আল্লাহর কাছে তাকে কঠিন জবাবের সম্মুখীন হতে হবে। প্রশ্ন হলো কেন? সংবিধানে এই ধারাটা আছে নীতি। রাষ্ট্রের মূলনীতি কী? মহান আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস। বর্তমান সনদে এই কথাটাকে বাদ দেয়া হয়েছে। অতএব, যদি গণভোট দিতে আপনি হাতে ভোট দেন, তার মানে সংবিধানে মহান আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, এই কথা থাকুক, আপনি এটা চান না সেজন্য আপনি ভোট দিছেন। আমি মনে করি, এটা ঈমানের উপর কঠিন একটা আঘাত হবে।”
এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ভিডিওটি ৪০ হাজারের বেশি বার শেয়ার হয়েছে।
মাওলানা সালামতউল্লাহ মজু নামের একজন ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, “হ্যাঁ” ভোট দিলে নাকি সংবিধান থেকে বিসমিল্লাহ, আল্লাহর নাম ও রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বাদ দেয়া হবে। এই কথাটি গুজব নাকি সত্যি? দয়া করে আমাকে একটু জানান। আমি সত্যিটা জানতে চাই।”
তবে দ্য ডিসেন্টের যাচাইয়ে দেখা গেছে, গণভোটের সাথে সংবিধানের শুরুতে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ বাদ পড়ার কোনো সম্পর্ক নেই।
গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫ অনুযায়ী, এই গণভোট হচ্ছে জুলাই জাতীয় সনদে প্রস্তাবিত সংবিধান সংস্কার ও রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামোগত পরিবর্তনের একটি পূর্ণাঙ্গ প্যাকেজের ওপর জনগণের সম্মতি নেওয়ার জন্য। এর আওতায় রয়েছে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান গঠনের প্রক্রিয়া নির্ধারণ এবং দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ চালু ও সংবিধান সংস্কারের ক্ষেত্রে উচ্চকক্ষের ক্ষমতা সংক্রান্ত বিষয়।
এছাড়া জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে অংশগ্রহণকারী সব রাজনৈতিক দলের মধ্যে যেসব বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে, সেগুলোও গণভোটের আওতাভুক্ত। গণভোটের তফসিল অনুযায়ী, এ ধরনের বাধ্যতামূলক সংস্কারের সংখ্যা ৩০টি। এসব বিষয়ের মধ্যে রয়েছে সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, মৌলিক অধিকার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ এবং রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ইত্যাদি।
জুলাই জাতীয় সনদ কিংবা গণভোটের তফসিলে উল্লিখিত এই ৩০টি বাধ্যতামূলক সংস্কারের মধ্যে সংবিধানের শুরুতে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ সংযোজন বা রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ইসলাম বহাল বা পরিবর্তনের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত নয়। ফলে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম কিংবা সংবিধানের প্রস্তাবনার শুরুতে বিসমিল্লাহ সংক্রান্ত বিষয়গুলো গণভোটের ওপর নির্ভরশীল নয়।

তবে সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন (প্রথম খণ্ড)-এর দ্বিতীয় অধ্যায়ে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ইসলাম বহাল এবং সংবিধানের প্রস্তাবনার শুরুতে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ অন্তর্ভুক্তির সুপারিশ করা হয়েছে।
‘রাষ্ট্রধর্ম’ শীর্ষক প্রস্তাবনায় কমিশন দুটি সুপারিশ করেছে। প্রথম প্রস্তাবে বলা হয়েছে, “কমিশন সুপারিশ করছে যে, রাষ্ট্রধর্মের বর্তমান বিধান বহাল রাখা হোক। এ বিষয়ে অংশীজন ও কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রদত্ত বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ রাষ্ট্রধর্ম বহাল রাখার পক্ষে মত দেন। সুতরাং, কমিশন সুপারিশ করছে যে এই বিধানটি বহাল রাখা হোক। তবে, এ ব্যাপারে কমিশন সদস্যরা সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারেননি।”
দ্বিতীয় প্রস্তাবে বলা হয়েছে, “কমিশন সুপারিশ করছে যে, সংবিধানের প্রস্তাবনার শুরুতে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’/আল্লাহর নামে, যিনি পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু’ অন্তর্ভুক্ত করা হোক।”
সংবিধান সংস্কার কমিশনের সদস্য মোঃ মুসতাইন বিল্লাহর সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি দ্য ডিসেন্টকে জানান, সংবিধান সংস্কার কমিশন ও ঐকমত্য কমিশনের কোনো প্রস্তাবনাতেই রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম এবং সংবিধানের শুরুতে ‘বিসমিল্লাহ’ বাদ দেওয়ার কথা নেই।
এছাড়া সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে উল্লিখিত রাষ্ট্রধর্ম বা ধর্ম সংক্রান্ত প্রস্তাবনাসহ কোনো প্রস্তাবনার সঙ্গেই গণভোটের কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পর্ক নেই।
ফলে, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হলে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ইসলাম বা সংবিধানের প্রস্তাবনার শুরুতে থাকা ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ বাদ পড়বে, এমন দাবির কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই।