Image description

ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহিদ শরিফ ওসমান হাদি হত্যার প্রধান অভিযুক্ত ফয়সাল করিম মাসুদ পালানোর সব পথ তৈরি করেছিল আগেই। একই সঙ্গে করেছিল পরিবারের ভরণপোষণের ব্যবস্থাও। হাদি হত্যার ঠিক ১ মাস আগে এনআরবিসি ব্যাংক থেকে স্ত্রী সাহেদা পারভীন সামিয়ার নামে কিনেছিলেন ৬৫ লাখ টাকার পারিবারিক সঞ্চয়পত্র। দেশের বাইরে পালাবে জানিয়ে স্ত্রী সামিয়াকে সেই সঞ্চয়পত্র দিয়েই পরিবার চালাতে বলেছিল বলে ডিবির জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেন সামিয়া।

ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহিদ ওসমান হাদি হত্যার পর থেকেই আলোচনায় প্রধান অভিযুক্ত ফয়সাল করিম মাসুদ। হত্যা করে ভারতে পালিয়ে নিজেকে নির্দোষ দাবি করলেও সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতেই তাকে আসামি করে চার্জশিট আদালতে জমা দিয়েছে ডিবি।

 
হাদি হত্যায় ফয়সালের নাম আসার পর থেকেই তার ও পরিবারের সদস্যদের ব্যাংক হিসাবের খোঁজে নামে সিআইডি। ৫৩টি ব্যাংক হিসাবে ১২৭ কোটি টাকার অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্যের পর তার সব হিসাব আদালতের নির্দেশে অবরুদ্ধ করে সিআইডি। একই সঙ্গে এসব ব্যাংক হিসাবে থাকা সাড়ে ৬৫ লাখ টাকা অবরুদ্ধ করে সংস্থাটি।
 
 
ফয়সালের এসব লেনদেনের মধ্যে ৬৫ লাখ টাকার একটি লেনদেন নিয়ে অনুসন্ধানে নামে সময় সংবাদ। হাদিকে হত্যার ঠিক এক মাস আগে কেন ফয়সাল ৬৫ লাখ টাকার এই সঞ্চয়পত্র কিনেছিল স্ত্রীর নামে, তা খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হয়।
 
ব্যাংকের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা ক্যামেরার সামনে কথা না বললেও জানান, ‘ব্যবসার কথা বলে ২০২৩ সাল থেকে এই ব্যাংকে লেনদেন করে ফয়সাল। কখনোই মনে হয়নি তার ব্যাপারে এরকম একটা অভিযোগ উঠতে পারে। আমরাই খুব অবাক হয়েছি, এখন আমরা নিজেরাই এটা নিয়ে বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে রয়েছি।’
 
 
তবে লেনদেনের তথ্য বলছে, ফয়সালের ব্যক্তিগত ও প্রতিষ্ঠান অ্যাপল সফট আইটির নামের হিসেবে গত বছরের ৩ নভেম্বর জমা হয়েছে ৪২ লাখ টাকা। যা আবার এসেছে মিডল্যান্ড ব্যাংকে থাকা তার অ্যাকাউন্ট থেকে। সেই টাকা একজন পাঠিয়েছিল পে-অর্ডারের মাধ্যমে। পরে ৩ নভেম্বর অ্যাপল আইটির হিসাব থেকে ৬৫ লাখ টাকা দিয়ে স্ত্রী সামিয়ার নামে সঞ্চয়পত্র কেনে ফয়সাল।
 
সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) জসীম উদ্দিন খান বলেন, ‘ফাইনান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিট মূল শুটারের অ্যাকাউন্টে অস্বাভাবিক লেনদেনের অস্তিত্ব পায় এবং এই প্রেক্ষিতে সিআইডির সংশ্লিষ্ট টিম কাজ করে। তারা 'ফলো দি ফ্লো অফ মানি' প্রিন্সিপাল মেনটেইন করে দেখতে পায় অভিযুক্তের অ্যাকাউন্টে বেশ বড় রকমের টাকা লেনদেন হয়েছে ঘটনার কয়েকদিন আগে। সেই টাকা সিআইডির আবেদনের প্রেক্ষিতে বিজ্ঞ আদালত ফ্রিজ করেছে।’
 
 
এদিকে, ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ সামিয়াকে জিজ্ঞাসাবাদে জানতে পারে ফয়সাল দেশ ছাড়বে জানিয়ে পরিবারে জন্যই এই টাকা রেখে গিয়েছিল। ডিএমপির উপ কমিশনার (গণমাধ্যম বিভাগ) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান বলেন, ‘শহীদ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় একেকজন একেক ধরনের ভূমিকা পালন করেছে। কেউ ঘটনার পূর্ববর্তী সময়ে সেগুলো জানা সত্ত্বেও গোপন করেছে। আবার ঘটনার পরবর্তী সময়ে কেউ অভিযুক্তদের পালিয়ে যেতে সহায়তা করেছে। অস্ত্র সরবরাহ করেছে কেউ এবং সেগুলো লুকানোর ক্ষেত্রে অনেকে ভূমিকা রেখেছে; সেগুলো আমরা বিবেচনা করেছি এবং সেই অনুযায়ী যার যার ভূমিকা সেই ভিত্তিতেই আমাদের চার্জশিটে দাখিল করা হয়েছে।’
 
ফয়সালের দেশের বাইরেও দুবাইয়ে সম্পদ থাকার তথ্য পেয়েছে তদন্তকারীরা। সে বিষয়ে তথ্য চেয়ে চিঠিও পাঠিয়েছে সিআইডি।
 
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের তফসিল ঘোষণার পরদিন ১২ ডিসেম্বর ঢাকার পুরানা পল্টনের বক্স-কালভার্ট রোডে একটি চলন্ত মোটরসাইকেল থেকে রিকশায় থাকা হাদিকে মাথায় গুলি করা হয়। আশঙ্কাজনক অবস্থায় প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও পরে এভারকেয়ার হাসপাতালে তাকে চিকিৎসা দেয়া হয়।
 
 
অবস্থার অবনতি হলে ১৫ ডিসেম্বর এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে তাকে সিঙ্গাপুরে নেয়া হয়। তিন দিন পর ১৮ ডিসেম্বর তার মৃত্যু হয়। ফয়সাল করিম মাসুদকে আসামি করে ১৪ ডিসেম্বর পল্টন থানায় হত্যাচেষ্টার মামলা করেন ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের। হাদি মারা যাওয়ার পর মামলাটি হত্যা মামলায় রূপ নেয়।
 
ওসমান বিন হাদি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ফয়সাল করিম মাসুদসহ ১৭ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দেয়া হয়েছে। চার্জশিট দেয়া ১৭ জনের মধ্যে ১২ জন গ্রেফতার এবং ৫ জন পলাতক রয়েছেন।