মেইড ইন নাগপুর, ইন্ডিয়া। পাওয়ার জেল-এর গায়ে লেখা। একটি নয় একাধিক। সঙ্গে ডেটোনেটর। দুটো মিলে হয় ‘উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরক’। কখনো কখনো পাকা দালানও উড়িয়ে দিতে পারে। এগুলো সাধারণত ব্যবহার হয় সিলেটের ওপারে মেঘালয়ের বিস্তীর্ণ পাহাড়ি এলাকায়। শব্দ শুনেন বাংলাদেশের মানুষও। পাথরের পাহাড় ভাঙায় কাজ করে এই বিস্ফোরক। এগুলো এখন বাংলাদেশে ঢুকছে। এক নয়, একাধিক চালান। ইতিমধ্যে কয়েকটি চালান আটকও হয়েছে।
প্রশ্ন উঠেছে কারা ঢুকাচ্ছে এই চালান। চোরাচালানের সঙ্গেই সিলেট সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকছে বিস্ফোরকের চালান। সাম্প্রতিক সময়ে বিষয়টি ভাবিয়ে তুলেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে। তখন আন্দোলনমুখর দেশ। সিলেটেও আন্দোলন চাঙ্গা। গণ-অভ্যুত্থানের পূর্বের কয়েকদিন। সীমান্ত থেকে খবর আসছিল অস্ত্রের চালান ঢুকছে। ধরা পড়ছে না। চোরাচালানের বস্তায় ভরে নিয়ে আসা হচ্ছে এসব অস্ত্র। খবর ছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছেও। নজর দিলেও কাজ হয়নি।
৪ঠা আগস্ট সিলেটের রাজপথে দেখা মিললো এসব অস্ত্রের। মুহুর্মুহু গুলিতে কাঁপলো সিলেট নগর। আন্দোলনকারীদের দমাতে যুবলীগ, ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা প্রকাশ্যেই এসব আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে। রক্ত ঝরে সিলেটে। অস্ত্রের ব্যবহারে আরও বেশি ক্ষোভ বাড়ে মানুষের। এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন। অস্ত্র আসছে। সঙ্গে বিস্ফোরকের চালানও। মঙ্গলবার দুপুরে র্যাব সদস্যরা জৈন্তাপুরের কাটাগাঙ এলাকা থেকে বিস্ফোরকের চালান উদ্ধার করেছে। কাটাগাঙের পাড়ের পরিত্যক্ত একটি ঘর। র্যাবের কাছে খবর ছিল অবৈধ কিছু মজুতের। কর্মকর্তারা সরাসরি নামেন অভিযানে। গোটা এলাকা করেন সার্চ।
এক পর্যায়ে পরিত্যক্ত ঘরেই মিললো বিস্ফোরকের চালান। উদ্ধারকৃত বিস্ফোরকের মধ্যে ১৪টি ইন্ডিয়ান পাওয়ার জেল এবং ১৪টি নন ইলেকট্রিক ডেটোনেটর রয়েছে। অভিযান সম্পর্কে তথ্য নিশ্চিত করেন র্যাব-৯’র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কে এম শহিদুল ইসলাম সোহাগ। তিনি জানান, উদ্ধারকৃত এসব জেল এবং নন ইলেকট্রিক ডেটোনেটর উচ্চমাত্রার বিস্ফোরক তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। এসব নাশকতার কাজে ব্যবহার করার জন্য নিয়ে আসা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা জানিয়েছেন- পাওয়ার জেল ও ডেটোনেটর হচ্ছে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরক। এগুলো এতটাই শক্তিধর যে, বড় বড় পাথরের পাহাড় ভেঙে ফেলে।
সিলেট অঞ্চল দিয়ে ভারত থেকে যেসব এলসি’র পাথর আসে ওই পাথর ভাঙা হয় এই বিস্ফোরক দিয়ে। শুধু জৈন্তাপুরে নয়, মাসখানেক আগে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার একটি বালুর মাঠের গর্তে রাখা আরেকটি চালান উদ্ধার করা হয়। এর আগে সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার সীমান্ত দিয়ে অস্ত্র ও বিস্ফোরকের কয়েকটি চালান ঢুকে। বিজিবি সদস্যরা অভিযান চালিয়ে ওই চালান উদ্ধার করেন। সিলেটের ৪৮ বিজিবি’র কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল নাজমুল হক মানবজমিনকে জানিয়েছেন, অস্ত্র ও আগ্নেয়াস্ত্রের চালান সম্প্রতি বেশি ধরা পড়ছে। কারণ হচ্ছে সীমান্তে বিজিবি সহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সতর্ক রয়েছেন।
তথ্য পেলেই তাৎক্ষণিক অভিযান চালানো হয়। সীমান্ত এলাকার কিছু কারবারি ও বাসিন্দারা বহনকারী হিসেবে এগুলো নিয়ে আসে। এরপর আরেকটি দল সেগুলো সীমান্ত থেকে নির্দিষ্ট গন্তব্যে নিয়ে যায়। ফলে এসব চালানের সঙ্গে কারা জড়িত তাদের ধরা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি বলেন- সীমান্তের ওপারে ভারতে ওই বিস্ফোরকগুলো ভালো কাজে ব্যবহার করা হলেও বাংলাদেশে তো পাথরের পাহাড় নেই। সুতরাং ধারণা করা হচ্ছে বিস্ফোরকের অপব্যবহার বা নাশকতার উদ্দেশ্যেই এগুলো নিয়ে আসা হতে পারে। কেউ কেউ অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির জন্য নিয়ে আসতে পারে। এজন্য সীমান্ত এলাকায় বিজিবি সতর্ক রয়েছে বলে জানান তিনি।
সিলেটের পুলিশ সুপার কাজী আখতার-উল আলম জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত যেসব চালান ধরা পড়েছে সেগুলোর সঙ্গে কেউ আটক হয়নি। ফলে বোঝা যাচ্ছে না এসব বিস্ফোরকের চালান কারা নিয়ে আসছে, কেন নিয়ে আসছে। যদি কেউ ধরা পড়তো তাহলে তদন্তের জন্য ভালো হতো। তিনি বলেন- পুলিশের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে অনুসন্ধান চালানো হচ্ছে। সীমান্ত এলাকা কিংবা সিলেটের কোনো পক্ষ এতে জড়িত থাকলে তাদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে।