জুলাই গণ-আন্দোলনে পলাতক শেখ হাসিনার সাবেক সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে নেওয়া অপ্রয়োজনীয় ১২ হাজার ৩২৬ কোটি টাকার ২৯টি উন্নয়ন প্রকল্প বাতিল করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরকারি উন্নয়ন ব্যয়ে শৃঙ্খলা ফেরাতে তাৎপর্যপূর্ণ এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। প্রকল্পগুলো বাতিলের ফলে সরকার প্রায় পাঁচ হাজার ৮৪৭ কোটি টাকা সাশ্রয় করতে সক্ষম হয়েছে বলে জানিয়েছে পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)।
আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাতিল হওয়া অনেক প্রকল্প অর্থনৈতিকভাবে অযৌক্তিক ছিল এবং রাজনৈতিক বিবেচনায় অনুমোদন দেওয়া হয়।
বাতিল হওয়া প্রকল্পের তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ের একটি বড় প্রকল্প। ২০১৬ সালে নেওয়া ২০০টি মিটার গেজ যাত্রীবাহী কোচ কেনার এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৯২৮ কোটি টাকা।
পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ কালের কণ্ঠকে বলেন, অতীতে অনেক প্রকল্প রাজনৈতিক বিবেচনায় অনুমোদন পেয়েছে, যার পেছনে কোনো অর্থনৈতিক যুক্তি ছিল না। ফলে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় ঠেকাতে এসব প্রকল্প বর্তমান অবস্থায়ই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
বাতিল হওয়া প্রকল্পগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় হয়েছে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের অধীনে। পার্বত্য তিন জেলায় সীমান্ত সড়ক নির্মাণ প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে তিন হাজার ৭৫২ কোটি টাকা, যা প্রায় পুরো বরাদ্দের সমান। এ ছাড়া জামালপুর-ধনুয়া-কামালপুর-রৌমারী-দাটভাঙ্গা জেলা মহাসড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্প প্রায় অর্ধেক কাজ হওয়ার পরও বাতিল হয়েছে।
কিছু বড় প্রকল্প আবার একেবারেই প্রস্তুতি ছাড়া অনুমোদন পাওয়া ছিল। বাংলাদেশ টেলিভিশনের ছয়টি পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্র স্থাপন প্রকল্পে এক টাকাও খরচ না করেই প্রকল্প বাতিল করা হয়েছে। এতে পুরো অর্থই সাশ্রয় হয়েছে। খুলনায় বঙ্গবন্ধু নভোথিয়েটার প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে মাত্র ০.১৩ শতাংশ, তবু সেটিও বাতিল করা হয়।
এ ছাড়া সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে এনজিওদের মাধ্যমে বাস্তবায়নযোগ্য সাতটি প্রকল্পও বাতিল করা হয়েছে। এসব প্রকল্পে প্রায় আট কোটি ৮৬ লাখ টাকা খরচ হলেও কর্মকর্তারা বলছেন, রাজনৈতিক প্রভাবে নেওয়া এসব প্রকল্পে প্রশিক্ষণ ও সামাজিক সেবার নামে সরকারি অর্থের অপব্যবহার হয়েছে। এসব প্রকল্প বাতিলের মাধ্যমে প্রায় ১৭৭ কোটি টাকা সাশ্রয় হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে চলা কয়েকটি ঐতিহাসিক স্মৃতিসংশ্লিষ্ট প্রকল্পও বাদ দেওয়া হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি জাদুঘর নির্মাণ প্রকল্পে ২২০ কোটি টাকা খরচের পর তা বন্ধ করা হয়।
পরিকল্পনা কর্মকর্তাদের মতে, দীর্ঘসূত্রতা ও বারবার সংশোধনের কারণে এসব প্রকল্পের অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা নষ্ট হয়ে গেছে।
পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা জানান, বাতিল হওয়া প্রকল্পগুলোর একটি বড় অংশই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও প্রভাবের মাধ্যমে এডিপিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। এসব প্রকল্প গ্রহণের সময় যথাযথ সম্ভাব্যতা যাচাই, ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণ এবং বাস্তবায়ন প্রস্তুতির ঘাটতি ছিল। ফলে বছরের পর বছর প্রকল্প চললেও কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি; কোথাও আবার কাগজে-কলমে প্রকল্প থাকলেও মাঠ পর্যায়ে কাজ কার্যত শুরুই হয়নি।
আইএমইডির মূল্যায়নে উঠে এসেছে, কিছু প্রকল্প দুই থেকে ৯ বছর পর্যন্ত চলমান থাকার পরও দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখাতে পারেনি। দীর্ঘসূত্রতা, বারবার প্রকল্প সংশোধন এবং বাস্তবায়নকারী সংস্থার দুর্বল সক্ষমতার কারণে এসব প্রকল্প কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলে। অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্পের প্রাথমিক উদ্দেশ্য ও বাস্তব চাহিদার মধ্যে অসামঞ্জস্য তৈরি হয়; ফলে অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এগুলো আর টেকসই থাকেনি।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় শুধু অর্থ ব্যয়ের বিষয়টি নয়, বরং ভবিষ্যতে আরো বড় অঙ্কের অপচয় ঠেকানোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। বাতিল হওয়া প্রকল্পগুলো চালু রাখলে আরো হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের ঝুঁকি ছিল, কিন্তু বাস্তব সুফল পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল খুব কম। এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই প্রকল্পগুলো বর্তমান অবস্থায় বন্ধ করে দেওয়া হয়।
পরিকল্পনা কমিশনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, একটি প্রকল্পে এর মধ্যে কিছু অর্থ ব্যয় হয়েছে বলেই যে সেটি জোর করে চালিয়ে যেতে হবে—এই মানসিকতা থেকে সরকার বেরিয়ে এসেছে। অর্থনৈতিক যুক্তি না থাকলে এবং বাস্তবায়নের সক্ষমতা না থাকলে প্রকল্প বাতিল করাই উত্তম সিদ্ধান্ত।
পরিকল্পনা কমিশন জানিয়েছে, ভবিষ্যতে যাতে রাজনৈতিক বিবেচনায় অযৌক্তিক প্রকল্প অনুমোদন না পায়, সে জন্য নতুন প্রকল্প নেওয়ার ক্ষেত্রে কঠোর যাচাই-বাছাই চালু করা হচ্ছে। একই সঙ্গে চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর কার্যকারিতাও নিয়মিত পর্যালোচনা করা হবে।