রাজধানীতে জাল টাকা উদ্ধারের এক অভিযানে জব্দ করা ২ কোটি ৮০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। এই অভিযোগের ব্যাপারে ইতিমধ্যে বিভাগীয় তদন্তও শুরু হয়েছে।
গোয়েন্দা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ৮ নভেম্বর রাজধানীর ওয়ারী এলাকায় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে জাল টাকা ও নগদ টাকাসহ দুজনকে গ্রেপ্তার করে ডিবি।
অভিযানের পর তৈরি করা জব্দ তালিকায় ৬ লাখ টাকার জাল নোট এবং ১৯ লাখ টাকা নগদ উদ্ধারের কথা উল্লেখ করা হয়।
কিন্তু জিজ্ঞাসাবাদের সময় গ্রেপ্তার দুই রোহিঙ্গা—টেকনাফের নুরুল হক (৩২) ও সাইদুল আমিন (২৪) দাবি করেন, অভিযানের সময় ডিবি কর্মকর্তারা তাদের কাছ থেকে মোট ৩ কোটি টাকার নগদ অর্থ জব্দ করেছিলেন। অর্থাৎ জব্দ তালিকায় ২ কোটি ৮০ লাখ টাকার হিসাব নেই।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার ও ডিবি প্রধান শফিকুল ইসলাম দ্য ডেইলি স্টারকে বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, এ নিয়ে তদন্ত চলছে।
এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ডিবি প্রধান শফিকুল ইসলাম ওই অভিযানের নেতৃত্ব দেওয়া ডিবি তেজগাঁও বিভাগের তৎকালীন সহকারী কমিশনার (এসি) তারেক সেকান্দারের বিরুদ্ধে তদন্তের নির্দেশ দেন। তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত উপকমিশনার (ডিসি) রাকিব খানকে।
রাকিব খান গত ৪ ডিসেম্বর তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন। কিন্তু নিরপেক্ষতার স্বার্থে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ দ্বিতীয় আরেকটি তদন্তের নির্দেশ দেয়, যা এখনো চলছে।
এই সিদ্ধান্তের পেছনে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার ঠিক আগে রাকিব, তারেক এবং ওই অভিযানের তথ্যদাতা দিদারুল ইসলামের মধ্যে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনার সংযোগ থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ঘটনাটি ঘটে ফার্মগেটের হোটেল গিভেন্সি ইন্টারন্যাশনালের বাইরে। দ্য ডেইলি স্টারের হাতে আসা সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, গত ২ ডিসেম্বর ভোর ৪টার দিকে তারেক হোটেলের সামনে এসে রাকিবকে দেখতে পান। এরপর দুই কর্মকর্তার মধ্যে হাতাহাতি হয়।
পুলিশের মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) কাছে দেওয়া এক লিখিত অভিযোগে তারেক দাবি করেন, তার নিখোঁজ তথ্যদাতা দিদারুলকে উদ্ধার করতে গেলে রাকিব তাকে মারধর করেন। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তিনি জানতে পেরেছিলেন দিদারুল হোটেল গিভেন্সিতে আছেন।
যোগাযোগ করা হলে তারেক জানান, দিদারুল তার সোর্স ছিলেন এবং ২৯ নভেম্বর কক্সবাজার থেকে নিখোঁজ হন। তিনি বলেন, 'যখন জানতে পারলাম দিদারুল ফার্মগেটে আছেন এবং আমার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাও সেখানে উপস্থিত, তখন আমিও সেখানে যাই।' তারেকের অভিযোগ, তাকে দেখেই রাকিব ক্ষিপ্ত হয়ে হামলা চালান।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে রাকিব বলেন, কোনো সিনিয়র কর্মকর্তা জুনিয়রকে মারধর করেন না। তিনি বলেন, 'সে (তারেক) একটি অভিযান চালিয়েছিল, যা পূর্বপরিকল্পিত বলে মনে হয় এবং ওই অভিযানে বড় অঙ্কের টাকা আত্মসাতের ইঙ্গিত রয়েছে।'
দিদারুলের বিষয়ে রাকিব বলেন, ব্যক্তিগত সমস্যায় সাহায্যের জন্য ওই সোর্স ডিবিতে এসেছিলেন। তিনি বলেন, 'একজন সোর্স যদি কোথাও থাকতে চায়, আপনি কি তার জন্য রুমের ব্যবস্থা করবেন না?' তিনি দিদারুলকে তুলে আনার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, 'কাউকে আটক করলে আমরা ডিবি হেফাজতে রাখি, হোটেলে নয়।'
ডিবি প্রধান শফিকুল ইসলাম বলেন, তথ্যদাতা দিদারুল আটক ছিলেন না, বরং অভিযানের মূল সূত্র হিসেবে সাক্ষ্য দিতে ঢাকায় এসেছিলেন।
গত ১ ডিসেম্বর দিদারুলের স্ত্রী মমতাজ বেগম কক্সবাজারের উখিয়া থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে জানিয়েছিলেন, ২৯ নভেম্বর উখিয়া বোট বাজার এলাকা থেকে তার স্বামী নিখোঁজ হন। ৪ ডিসেম্বর দিদারুল বাড়ি ফিরে আসার পর জিডিটি প্রত্যাহার করা হয়।
হোটেলের নথিপত্রে দেখা গেছে, ৩০ নভেম্বর থেকে ২ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৮০৫ নম্বর কক্ষটি 'মিস্টার দিদার' নামে বুক করা ছিল, যার পাশে বন্ধনীতে 'ডিবি' লেখা ছিল।
রাকিব বর্তমানে কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটে কর্মরত। অন্যদিকে অভিযোগ ওঠার পর তারেককে রাঙামাটিতে বদলি করা হয়েছে।
জব্দ তালিকার গরমিল নিয়ে দ্বিতীয় দফার তদন্ত বর্তমানে সিটিটিসি ইউনিটের যুগ্ম কমিশনার মুন্সি সাহাবুদ্দিন পরিচালনা করছেন বলে নিশ্চিত করেছেন ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (প্রশাসন) মো. সারোয়ার। তবে এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি মুন্সি সাহাবুদ্দিন।