Image description

সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যকার কৌশলগত সামরিক জোটে যোগ দিতে যাচ্ছে তুরস্ক, যা আন্তর্জাতিক মহলে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সৌদি আরবের বিপুল অর্থায়ন, পাকিস্তানের পারমাণবিক শক্তি এবং তুরস্কের আধুনিক সামরিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই সম্ভাব্য জোটকে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো ‘ইসলামিক ন্যাটো’ হিসেবে অভিহিত করছে। এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, এই তিন মুসলিম প্রধান দেশের ক্রমবর্ধমান সামরিক ঘনিষ্ঠতা এবং সম্মিলিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পরিকল্পনা দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে এই জোটের প্রতিটি পদক্ষেপের ওপর বিশেষ সতর্ক নজর রাখছে নয়াদিল্লি।

ব্লুমবার্গের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যকার একটি বিশেষ নিরাপত্তা চুক্তিতে যুক্ত হওয়ার বিষয়ে আলোচনা চালাচ্ছে তুরস্ক। এই চুক্তিটি অনেকটা ন্যাটোর সম্মিলিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মতো করে সাজানো হচ্ছে। প্রস্তাবিত এই চুক্তিতে ন্যাটোর ‘আর্টিকেল ৫’-এর আদলে একটি ধারা রাখা হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে—জোটের কোনো এক সদস্যের ওপর আক্রমণ হলে তা সবার ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য করা হবে।

প্রাথমিকভাবে রিয়াদ ও ইসলামাবাদের মধ্যে এই সমঝোতা হলেও এখন আঙ্কারার অংশগ্রহণের মাধ্যমে এর ব্যাপক অগ্রগতি হয়েছে। আঙ্কারাভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ‘টেপাভ’ এর কৌশলবিদ নিহাত আলি ওজকান এই জোটের সম্ভাব্য রূপরেখা নিয়ে জানান যে, সৌদি আরব এখানে আর্থিক জোগান দেবে, পাকিস্তান তার পরমাণু শক্তি ও ব্যালিস্টিক মিসাইলের সক্ষমতা ব্যবহার করবে এবং তুরস্ক তাদের উন্নত সামরিক প্রযুক্তি ও নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্পের শক্তি যোগ করবে।

নিহাত আলি ওজকান আরও বলেন, 'যেহেতু যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে নিজের এবং ইসরায়েলের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, তাই আঞ্চলিক সংঘাতের পরিবর্তনশীল পরিস্থিতি দেশগুলোকে বন্ধু ও শত্রু চেনার জন্য নতুন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বাধ্য করছে।' সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের কৌশলগত স্বার্থ এখন একই বিন্দুতে মিলিত হওয়ায় এই জোট গঠন একটি যৌক্তিক পদক্ষেপ।

এই তিন দেশ ইতিমধ্যে মাঠপর্যায়ে সমন্বয় শুরু করে দিয়েছে। তুরস্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, চলতি সপ্তাহের শুরুতে আঙ্কারায় তারা প্রথমবারের মতো একটি ত্রিপক্ষীয় নৌ-বৈঠক সম্পন্ন করেছে। এই জোটে তুরস্কের অন্তর্ভুক্তি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ তারা মার্কিন নেতৃত্বাধীন ন্যাটোর দীর্ঘদিনের সদস্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের পর ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সেনাবাহিনী তাদেরই।

যদিও সৌদি আরব ও তুরস্কের মধ্যে শিয়া প্রধান ইরানকে নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে, তবুও দেশ দুটি সামরিক সংঘাতের বদলে আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান চায়। পাশাপাশি সিরিয়ায় স্থিতিশীল সুন্নি নেতৃত্ব এবং স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের বিষয়েও দেশগুলোর মধ্যে ঐকমত্য রয়েছে।

পাকিস্তানের সঙ্গে তুরস্কের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক আগে থেকেই বেশ শক্তিশালী। আঙ্কারা বর্তমানে পাকিস্তানের নৌবাহিনীর জন্য রণতরি তৈরি করছে এবং দেশটির কয়েক ডজন এফ-১৬ যুদ্ধবিমান আধুনিকায়ন করেছে। এছাড়া রিয়াদ ও ইসলামাবাদের সাথে ড্রোন প্রযুক্তি শেয়ার করার পাশাপাশি তুরস্ক তাদের নিজস্ব ‘কান’ পঞ্চম প্রজন্মের ফাইটার জেট কর্মসূচিতেও এই দুই দেশকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে।

ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে গত মে মাসে হওয়া চার দিনের সামরিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এই ত্রিপক্ষীয় আলোচনা আরও গতি পেয়েছে। উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের মে মাসে ‘অপারেশন সিঁদুর’ নামে পরিচিত সেই সংক্ষিপ্ত যুদ্ধে তুরস্ককে সরাসরি ইসলামাবাদের পক্ষ নিতে দেখা গিয়েছিল, যা এখন ভারতের জন্য বিশেষ দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।