বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন দলের বিদ্রোহী প্রার্থীরা। প্রতিদিন বিভিন্ন জেলায় দলের বিদ্রোহী প্রার্থীদের সঙ্গে রাজধানীর গুলশানের কার্যালয়ে কথা বলছেন তারেক রহমান। দলীয় প্রার্থীর স্বার্থে নির্বাচনে সহযোগিতার অনুরোধ করে বিএনপি নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারলে তাঁদের যথাযথ মূল্যায়নের আশ্বাস দিয়েছেন দলের চেয়ারম্যান। তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকের পর বিদ্রোহী প্রার্থীরা সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন এবং দিচ্ছেন। এতে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছে বিএনপি ও সমমনা জোটের প্রার্থীরা। বিএনপির সমমনাদের ছেড়ে দেওয়া ১৭টি আসনের মধ্যে চারটিতে বিদ্রোহী প্রার্থী এখনো অনড় অবস্থানে রয়েছেন। এ ছাড়া বেশ কিছু আসনে দলের বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন ভোটের মাঠে। বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা জানিয়েছেন, দলের হাইকমান্ডের অনুরোধে ইতোমধ্যে অনেকে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেছেন। আর যারা প্রত্যাহার করেননি মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন ২০ জানুয়ারির মধ্যে তারাও প্রত্যাহার করবেন। এরপরও যদি প্রত্যাহার না করেন তাহলে তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেবে বিএনপি। এরই মধ্যে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে প্রার্থী হওয়ায় ১০ জনকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
শরিকদের সঙ্গে বিএনপি যে ১৭টি আসনে সমঝোতা করে ছেড়ে দিয়েছে সেগুলো হলো : বগুড়া-২ আসনে নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না, ভোলা-১ আসনে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপির আন্দালিব রহমান পার্থ, সিলেট-৫ আসনে জমিয়তের মাওলানা মোহাম্মদ উবায়দুল্লাহ ফারুক, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিব, নীলফামারী-১ আসনে মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী, নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে দলটির মনির হোসেন কাসেমী, যশোর-৫ আসনে জমিয়তের (অনিবন্ধিত) রশিদ বিন ওয়াক্কাস, নড়াইল-২ আসনে ‘অনিবন্ধিত’ এনপিপির ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, পটুয়াখালী-৩ আসনে গণঅধিকার পরিষদের নুরুল হক নুর, ঝিনাইদহ-৪ আসনে রাশেদ খান, ঢাকা-১২ আসনে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক, ঢাকা-১৩ আসনে এনডিএমের ববি হাজ্জাজ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসনে গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি, লক্ষ্মীপুর-১ আসনে বাংলাদেশ এলডিপির শাহাদাত হোসেন সেলিম, কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির সৈয়দ এহসানুল হুদা, কুমিল্লা-৭ আসনে এলডিপির ড. রেদোয়ান আহমদ এবং হবিগঞ্জ-১ আসনে ড. রেজা কিবরিয়া।
জোটের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে ড. রেদোয়ান আহমদ, ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, রাশেদ খান, শাহাদাত হোসেন সেলিম, এহসানুল হুদা, রেজা কিবরিয়া ও ববি হাজ্জাজ নিজেদের দল ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দিয়ে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করছেন। তবে ঢাকা-১২, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২, পটুয়াখালী-৩, নারায়ণগঞ্জ-৪ সহ শতাধিক আসনে এখনো বিএনপি নেতারা ‘স্বতন্ত্র প্রার্থী’ হিসেবে নির্বাচনের মাঠে রয়েছেন। এসব প্রার্থীর সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে কথা বলছেন বিএনপি চেয়ারম্যান। এর মধ্যে গত ৮ জানুয়ারি ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসনে গণসংহতির জোনায়েদ সাকির বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে বহিষ্কৃত হওয়া দলের সাবেক সংসদ সদস্য আবদুল খালেককে ঢাকায় ডেকে কথা বলেন তারেক রহমান। এ সময় তাকে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়ে সাকির পক্ষে কাজ করার নির্দেশনা দেন। এ বিষয়ে আবদুল খালেক বলেন, চেয়ারম্যান যখন ডেকেছেন, তাঁকে সম্মান করতেই হবে। একইদিন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ (নাসিরনগর) আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী সৈয়দ এ কে একরামুজ্জামানের সঙ্গেও কথা বলেছেন তারেক রহমান। পরে এক ভিডিওবার্তায় নির্বাচন থেকে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন তিনি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ১২ ফেব্রুয়ারি। ইতোমধ্যে নির্বাচনের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে রাজনীতিতে। বিএনপির ভিতরে-বাইরেও বাড়ছে উত্তাপ। প্রতিপক্ষের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতার পাশাপাশি নিজ দলের স্বতন্ত্র (বিদ্রোহী) প্রার্থীদেরও মোকাবিলা করতে হচ্ছে দলটির। তারেক রহমান ম্যানেজ করেছেন। কিন্তু এখনো মাঠে আছে অনেক বিদ্রোহী প্রার্থী। এদের সামাল দিতে না পারলে হিতে বিপরীত হতে পারে।
এদিকে, দেশের ২৯৮টি আসনের মধ্যে অন্তত ৯৩টি আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন জমা দেওয়া হয়। এ নিয়ে দল মনোনীত প্রার্থীরাই শুধু নন, পুরো দলই এক রকম চাপে ছিল। অবশ্য দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে নির্বাচন করায় ইতোমধ্যে ১০ জনকে বহিষ্কার করা হয়েছে। বাকি বিদ্রোহীদের সঙ্গে কেন্দ্র থেকে যোগাযোগের পাশাপাশি তাদের ডেকে পাঠানো হচ্ছে বলেও জানা গেছে।
এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, আমরা আহ্বান জানিয়েছি দলের সিদ্ধান্তের প্রতি যেন তারা (বিদ্রোহী) শ্রদ্ধাশীল হয়ে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেন। আশা করছি, তারা সেটি করবেন। অনেকেই ইতোমধ্যে প্রত্যাহার করার কথা জানিয়েছেন। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের যে সময়সীমা রয়েছে, এর মধ্যেই পরিস্থিতির অনেক উন্নতি হবে।
বিএনপির কেন্দ্রীয় এক নেতা জানান, দলীয় পদধারী স্বতন্ত্র প্রার্থীদের গুলশান কার্যালয়ে ডাকার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় প্রতিদিনই তাদের ডাকা হচ্ছে। তফসিল ঘোষিত সময়ের মধ্যে তাদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিএনপির বেশ কয়েকটি আসনে দল মনোনীত প্রার্থীর পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে জনপ্রিয় নেতারাই স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন সংগ্রহ করেছেন। এর মধ্যে অনেকের মনোনয়ন বৈধ হয়েছে, বাতিল হয়েছে কারও কারও। বাতিল হওয়া বেশ কয়েকটি মনোনয়নপত্র আপিলের পর গত দুই দিনে বৈধ হয়েছে। এসব এলাকায় জামায়াত জোট, জাতীয় পার্টি ও বাম জোটের প্রার্থীও রয়েছেন। ফলে ঘরে-বাইরে বহুমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পড়তে যাচ্ছেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থীরা। তবে, দলের দায়িত্বশীলরা বলছেন, মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ সময়ে বেশির ভাগ বিদ্রোহীরা দলের সিদ্ধান্ত মেনে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াবেন। তারেক রহমানের নেতৃত্বে স্বস্তিতে ভোট উৎসবে মেতে উঠবে বিএনপি।