বিএনপির গুরুত্ব পাচ্ছে তরুণদের আকাঙ্ক্ষা
রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতে ইতঃপূর্বে ঘোষিত ৩১ দফাসহ জনকল্যাণমুখী ইস্যুকে প্রাধান্য দিয়ে নির্বাচনি ইশতেহার প্রস্তুত করছে বিএনপি। নতুন ভাবনার মধ্যে ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানপরবর্তী তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশাকে বিবেচনায় রেখে অগ্রসর হচ্ছে দলটি। দেশ গড়ার পরিকল্পনায় ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ক্রীড়া, পরিবেশ, কর্মসংস্থান ও ধর্মীয় নেতাদের জীবনমান উন্নয়নকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। পাশাপাশি বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সাম্প্রতিক নানা বক্তব্যের মূল বিষয়গুলোও ইশতেহারে প্রতিফলিত হবে। আধুনিক রাষ্ট্র বিনির্মাণ ও জনগণের প্রত্যাশা পূরণে তারেক রহমানের ‘আই হ্যাভ অ্যা প্লান’ নির্বাচনি ইশতেহারে যোগ হচ্ছে। দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি বিশেষভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে। বাংলাদেশে যুক্তরাজ্যের আদলে ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ তৈরির পরিকল্পনা ও বিএনপি নির্বাচিত হলে ১৮ মাসে ১ কোটি মানুষের কর্মসংস্থানের বিষয়টিকে রাজনৈতিক অঙ্গীকার হিসাবে রাখছে দলটি। প্রার্থীদের প্রতীক বরাদ্দ ও নির্বাচনি প্রচার-প্রচারণা শুরুর দু-একদিন আগে-পরে আনুষ্ঠানিকভাবে ইশতেহার ঘোষণা করবে বিএনপি। দলটির নীতিনির্ধারণী ফোরাম ও ইশতেহার প্রণয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা এমন তথ্য জানিয়েছেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বাকি আছে ২৮ দিন। সময়ের এই হিসাব বিবেচনায় রেখেই দলটির জনকল্যাণমুখী ইশতেহার তৈরির কাজ প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এখন চলছে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা। সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি সপ্তাহে দলের স্থায়ী কমিটি নির্বাচনি ইশতেহার চূড়ান্ত করবে, যা পরে আনুষ্ঠানিকভাবে দেশবাসীর উদ্দেশে তুলে ধরা হবে। এ প্রসঙ্গে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ইশতেহার তৈরির কাজ প্রায় শেষদিকে। ২০ জানুয়ারির মধ্যে এটা চূড়ান্ত হবে। আশা করি, শিগগিরই আমরা ইশতেহার ঘোষণা করতে পারব।
জানা যায়, এবারের ইশতেহারে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বিএনপি ঘোষিত রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতের ৩১ দফা, ‘ভিশন ২০৩০’, জুলাই জাতীয় সনদ, গণ-অভ্যুত্থানপরবর্তী তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা। এছাড়া বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য ৮টি বিশেষ খাতের বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হবে। ৩১ দফার মূল বিষয়ের মধ্যে নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা, মানবাধিকার সুরক্ষা, বাকস্বাধীনতা, স্বচ্ছ প্রশাসন ও জাতীয় অর্থনীতি পুনরুদ্ধারসহ কয়েকটি প্রতিশ্রুতি অন্তর্ভুক্ত করা হবে। জুলাই জাতীয় সনদের আলোকে মানবাধিকার কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশনসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে পূর্ণ স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা দেওয়ার পরিকল্পনার বিষয়টিও স্থান পাবে ইশতেহারে।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা যায়, এবারের নির্বাচনে মোট ভোটার সংখ্যা পৌনে ১৩ কোটি। এর মধ্যে একেবারে নতুন ভোটার আছে কমবেশি এক কোটি। এই বিশালসংখ্যক ভোটার এবারই প্রথম ভোট দেবেন। ১৮ থেকে ৩৩ বছর বয়সি ভোটারের সংখ্যা প্রায় সাড়ে চার কোটি।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এবার তরুণ ভোটাররা হয়তো নির্বাচনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারেন। গত তিনটি প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনে দেশের বেশির ভাগ মানুষ ভোট দিতে পারেনি। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানপরবর্তী সময়ে তরুণ সমাজের মধ্যে আসন্ন নির্বাচন নিয়ে আগ্রহ-উদ্দীপনা অনেক বেশি। ফলে তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে বিএনপি; যা দলটির নির্বাচনি ইশতেহারে প্রতিশ্রুতি হিসাবে উল্লেখ থাকবে। ৬০ বছরের বেশি বয়সি ভোটারের সংখ্যা ১ কোটি ৯৩ লাখের অধিক। তাদের জীবনযাত্রার বিষয়টি নজরে রেখে ইশতেহার প্রস্তুত করা হচ্ছে। দেশে নারী ভোটার সংখ্যা ৬ কোটির বেশি। এমন অবস্থায় নারীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা, নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থানের বিষয়টিও মাথায় রাখছে দলটি। সম্প্রতি সংসদ নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন করেছে বিএনপি। এই কমিটিসহ ইশতেহার তৈরির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে আরও পরিবর্তন, সংযোজন-বিয়োজন করবে। চলতি সপ্তাহে ইশতেহারের খসড়া বিএনপির স্থায়ী কমিটির হাতে তুলে দেওয়া হবে। এ কমিটির বৈঠকে দলের ইশতেহার চূড়ান্ত করা হবে।
এদিকে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ক্রীড়া, পরিবেশ, কর্মসংস্থান এবং মসজিদ-মাদ্রাসাভিত্তিক ধর্মীয় নেতাদের মাসিক সম্মানি ভাতাসহ জনকল্যাণমুখী এই ৮টি খাতে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পুরোপুরি বিএনপির ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। দলটি রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে দেশের প্রতিটি পরিবারে প্রাপ্তবয়স্ক নারীর নামে ফ্যামিলি কার্ড চালু করবে, যাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সাশ্রয়ী দামে পাওয়া যায়। কৃষক কার্ডের মাধ্যমে স্বল্পমূল্যে সার, উন্নত বীজ ও কৃষিপ্রযুক্তি পাবেন কৃষকরা। প্রত্যেক মানুষের দোরগোড়ায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়াসহ শক্তিশালী প্রাইমারি হেলথ কেয়ার নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার বিষয়টি উল্লেখ থাকবে ইশতেহারে। গুরুত্ব দেওয়া হবে চাহিদাভিত্তিক শিক্ষা এবং দক্ষতা ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার মাধ্যমে তরুণদের ভবিষ্যৎ উন্নয়নে। পাঠ্যক্রমের সঙ্গে শিল্প ও কর্মক্ষেত্রের বাস্তব যোগসূত্র তৈরি করাই দলটির মূল লক্ষ্য হিসাবে গুরুত্ব পাবে।
ক্রীড়াকেও পেশা হিসাবে গ্রহণযোগ্য করতে বিএনপি সব স্তরে খেলাধুলার উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেবে। নবায়নযোগ্য শক্তি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও রিসাইক্লিং বাড়িয়ে প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষা অগ্রাধিকার পাবে। কর্মসংস্থানে এসএমই, বস্ত্র ইকোনমি, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও আইসিটি খাতে ব্যাপক নতুন চাকরির সুযোগ তৈরি করা হবে। তথ্যপ্রযুক্তি, ই-কমার্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, গেমিং ও স্টার্টআপ খাতকে কর্মসংস্থানের প্রধান উৎসে পরিণত করবে। বিদেশি শ্রমবাজারে নতুন সুযোগ খুঁজে বের করে এবং দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে আরও বেশি তরুণকে ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্টে পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে বিএনপির। খতিব, ইমাম, মুয়াজ্জিন এবং অন্যান্য ধর্মের পুরোহিত, পাদরিসহ ধর্মীয় নেতাদের মাসিক সম্মানির ব্যবস্থা করা হবে, যাতে তাদের জীবনমান উন্নয়নসহ আর্থিক সুবিধা ও সহায়তা প্রদানের বিষয়টি নিশ্চিত থাকে।
বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান ও স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান যুগান্তরকে বলেন, বিএনপির ইশতেহারে ৩১ দফা এবং দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বক্তব্য অন্তর্ভুক্ত করা হবে। স্থায়ী কমিটির বৈঠকে আলোচনার মাধ্যমে শিগ্গিরই ইশতেহার ঘোষণা করা হবে। সোমবার বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ইশতেহারে শ্রমিকদের যে দাবি ও আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছে, সেগুলোর বাস্তবায়নে রাজনৈতিক দলের সহযোগিতা পাব বলে প্রত্যাশা করছি।
আসন্ন নির্বাচনে বিএনপি নির্বাচিত হলে প্রথম ১৮ মাসে ১ কোটি মানুষের কর্মসংস্থানের কথা জানিয়েছে দলটি। সম্প্রতি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এটিকে তাদের রাজনৈতিক অঙ্গীকার হিসাবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশে যুক্তরাজ্যের আদলে ক্রিয়েটিভ ইকোনমি তৈরির পরিকল্পনা নিয়েছে বিএনপি। ক্ষমতায় গেলে বড় বড় মেগা প্রকল্প করা নয়, কর্মক্ষম লোকদের পূর্ণাঙ্গ সুযোগ তৈরি করা হবে।
সোমবার বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য ও দলের চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল যুগান্তরকে বলেন, মূলত বিএনপির ঘোষিত ৩১ দফা ও সদ্যপ্রয়াত চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার ‘ভিশন ২০৩০’-এর আলোকেই নির্বাচনি ইশতেহার তৈরি করা হচ্ছে। এর কাজ এখনো চলছে। ইশতেহারে নতুন প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষাকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।
জামায়াতের থাকছে দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ার বার্তা
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় ইশতেহার চূড়ান্ত করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। জুলাই চেতনাকে ধারণ করে তৈরি হবে ইশতেহার। এতে দেশের কর্মসংস্থানভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা, প্রশাসনসহ রাষ্ট্রকাঠামোতে ব্যাপক সংস্কারকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। থাকছে দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ে তোলার কঠোর বার্তা। সততা, দেশপ্রেম, দুর্নীতিকে ‘না’ বলতে হবে। ‘দুর্নীতি করব না-দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেব না।’ এমন স্লোগান থাকছে জামায়াতের নির্বাচনি ইশতেহারে। ২০ জানুয়ারির পর যে কোনোদিন এই ইশতেহার সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে প্রকাশ করা হবে বলে জানিয়েছেন দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব যোবায়ের। দলীয় সূত্র জানায়, বাংলাদেশের প্রধানতম সমস্যা দুর্নীতির ব্যাপারে জিরো টলারেন্স জামায়াত। প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করা দুর্নীতি কমিয়ে আনতে পারলে দেশের বহু সমস্যাই দূর হবে বলে মনে করে দলটি। ফলে ক্ষমতায় গেলে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের জন্য জামায়াত কঠোর ব্যবস্থা নেবে। এ বিষয়ে সুস্পষ্ট ঘোষণা থাকবে দলটির নির্বাচনি ইশতেহারে। প্রশাসনের সর্বস্তরে এ ব্যাপারে নজরদারি বাড়ানো হবে।
এছাড়া শিক্ষা প্রতিটি শিশুর অধিকার। সর্বস্তরে সততার নীতি কায়েম করতে শিশু বয়স থেকেই নৈতিকতা ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। এজন্য নির্বাচনি ইশতেহারে শিক্ষাব্যবস্থার শুরু থেকে সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত নৈতিক শিক্ষা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে দলটির। শিক্ষা ব্যয় কমিয়ে আনা, অপরিকল্পিত শিক্ষা থেকে বেরিয়ে আসা, উচ্চতর গবেষণার সুযোগ বৃদ্ধি করা থাকছে ইশতেহারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি নেওয়ার পরও চাকরি মিলছে না। এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য জামায়াত গড়ে তুলতে চায় কর্মসংস্থানভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা।
জামায়াতের ইশতেহারে সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার ঘোষণা থাকবে বলে জানা গেছে। স্বাস্থ্যসেবা জনগণের দোরগড়ায় নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। অসততা দূর করে স্বাস্থ্য ব্যয় কমিয়ে আনা জামায়াতের অন্যতম লক্ষ্য। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবায় জড়িত চিকিৎসক, নার্সসহ সংশ্লিষ্ট সবার সমস্যা সমাধানেও জামায়াতের থাকবে সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি।
অর্থনীতিতে ব্যাপক সংস্কারের মাধ্যমে এই খাতের নৈরাজ্য দূর করার সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা থাকছে জামায়াতের নির্বাচনি ইশতেহারে। জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি আনতে শুধু চাকরির পেছনে না দৌড়িয়ে উদ্যোক্তা তৈরির বড় পরিকল্পনা থাকবে জামায়াতের ঘোষণায়। এজন্য দেশীয় শিল্পের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে তার সমাধান করে দেশকে আত্মনির্ভরশীল করার পরিকল্পার কথা থাকবে তাদের ইশতেহারে। আমদানি-রপ্তানিতে গতি ও সততা আনতে বদ্ধপরিকর জামায়াত। মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে বাণিজ্য বৃদ্ধিতে সহায়ক নীতি প্রণয়ন করবে দলটি।
কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে জামায়াতের ইশতেহারে থাকবে পরিকল্পনার কথা। বিশেষ করে দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করার উপায় বের করতে কৃষি গবেষণার ওপর জোর দেওয়া হবে। দেশকে সামরিক দিক থেকে শক্তিশালী করার পরিকল্পনা থাকবে জামায়াতের ইশতেহারে। আধুনিক সমরাস্ত্র বৃদ্ধি করে দেশমাতৃকার স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষার পরিকল্পনাও থাকবে।
প্রশাসনিক সংস্কার জামায়াতের একটি বড় এজেন্ডা। প্রশাসনের কাজে গতি আনা, ঘুস, দুর্নীতি দূর করা দলটির অন্যতম অঙ্গীকার। এজন্য নিয়োগ এবং প্রশিক্ষণে সততা ও দেশপ্রেমকে গুরুত্ব দেওয়ার ঘোষণা থাকবে তাদের ইশতেহারে। বিশেষ করে পুলিশ প্রশাসনে ব্যাপক সংস্কারের পরিকল্পনা থাকছে জামায়াতের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতিতে। এজন্য তাদের বেসিক প্রশিক্ষণে গুণগত পরিবর্তন আনা এবং দেশপ্রেম ও সেবার মানসিকতা তৈরিতে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম নেওয়ার কথা জানাবে দলটি। ভুক্তভোগী মানুষ যেন প্রতিকার পায়, প্রকৃত সেবা পায় সেটা নিশ্চিত করার থাকবে কার্যকর পদক্ষেপের কথাও গুরুত্ব পাচ্ছে জামায়াতের ইশতেহারে।
এছাড়া জামায়াতের পররাষ্ট্রনীতিতে সংবিধানের মৌলিক নীতি, ‘কারও সঙ্গে শত্রুতা নয়, সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব’ নীতি অনুসরণ করা হবে। সমমর্যাদার বিষয়টিকে পররাষ্ট্রনীতিতে গুরুত্ব দেওয়া হবে। তবে মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। দক্ষ জনশক্তি তৈরির বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে জামায়াত। বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য সরকারিভাবে প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া এবং এটাকে সম্প্রসারণ করার প্রতিশ্রুতি থাকছে তাদের ইশতেহারে। এছাড়া বিদেশে কর্মসংস্থান বাড়ানোর পদক্ষেপ নেওয়া এবং এক্ষেত্রে ব্যয় কমানোর জন্য সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া ঘোষণা থাকছে দলটির ইশতেহারে।
এনসিপির সরকার পরিচালনার রূপরেখা
‘দ্বিতীয় রিপাবলিক’ প্রতিষ্ঠায় জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ইতোমধ্যে নতুন সংবিধান প্রণয়ন, জুলাই অভ্যুত্থানের স্বীকৃতি ও বিচার, গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সংস্কারসহ ২৪ দফা ঘোষণা করেছে। এবার এই ২৪ দফার আলোকে নির্বাচনি ইশতেহার চূড়ান্ত করতে যাচ্ছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের দল এনসিপি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে দলটি ‘ইশতেহার তৈরি সেল’ গঠন করতে যাচ্ছে।
এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রথম নির্বাচনি ইশতেহারে তারা নতুনত্ব রাখার চেষ্টা করছেন। ২৪ দফার সঙ্গে আরও বিভিন্ন বিষয় যুক্ত হবে। সরকারে গেলে কীভাবে দেশ পরিচালনা করা হবে-সেটির রূপরেখাসহ নানা প্রতিশ্রুতি থাকবে ইশতেহারে। এছাড়া তরুণ ও ছাত্রসমাজকে অগ্রাধিকারে রাখা হবে। একই সঙ্গে নারীর উন্নয়নসহ ন্যায়ভিত্তিক বিচারব্যবস্থা ও আইন সংস্কার গুরুত্ব পাবে।
জানতে চাইলে এনসিপির যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক ও নির্বাচনি মিডিয়া উপকমিটির প্রধান মাহাবুব আলম যুগান্তরকে বলেন, নির্বাচন সামনে রেখে ইশতেহার তৈরির কাজ আগেই শুরু হয়েছে। এখন চূড়ান্ত রূপ দেওয়া হবে। এ নিয়ে আমরা আলোচনা করছি। আমরা চাই একটি আদর্শ ইশতেহার তৈরি করতে। এ ইশতেহারের আলোকে দেশ পরিচালনা এবং দেশের মানুষের কল্যাণ করা হবে। তিনি বলেন, আমাদের ২৪ দফা তো আছেই। এখন নির্বাচনি ইশতেহারে আরও কিছু বিষয় যুক্ত হবে। সরকারে গেলে কীভাবে দেশ পরিচালনা করা হবে, এর রূপরেখাসহ নানা প্রতিশ্রুতি থাকবে ইশতেহারে।
মাহাবুব আলম আরও বলেন, ইশতেহারবিষয়ক একটি শক্তিশালী সেল গঠন করা হতে পারে। শুধু নির্বাচনি ইশতেহার সেল নয়, আরও বেশ কয়েকটি সেল গঠন করা হচ্ছে। একেকটি সেলে ৭-৮ জন সদস্য থাকতে পারেন।
ইশতেহার প্রণয়নের সঙ্গে জড়িত এনসিপির শীর্ষ এক নেতা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক যুগান্তরকে জানান, আগের ইশতেহার তৈরিতে বিশেষ ভূমিকা ছিল দলটির যুগ্ম-আহ্বায়ক খালেদ সাইফুল্লাহর। সম্প্রতি দল থেকে তিনি পদত্যাগ করেছেন। এখন ইশতেহার তৈরিতে বিশেষভাবে লক্ষ রাখছেন দলটির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। ইতোমধ্যে সাতটি ইউনিট ও সেলের প্রধানের দায়িত্ব পেয়েছেন তিনি।
দলীয় সূত্রে জানা যায়, বৈষম্যহীন বাংলাদেশ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দুর্নীতি প্রতিরোধে পদক্ষেপ, সন্ত্রাসমুক্ত দেশ, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণসহ আর্থিক খাতের সুশাসনের ওপর ইশতেহারে জোর দেওয়া হবে। নারী উন্নয়ন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ দফা থাকবে। ধর্ম, বর্ণ, সম্প্রদায় ও জাতিসত্তার মর্যাদা, সর্বজনীন স্বাস্থ্য, জনবান্ধব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং ন্যায়ভিত্তিক বিচারব্যবস্থার ওপর জোর দেওয়া হবে। ইশতেহারে তরুণ ও ছাত্রসমাজকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে উপস্থাপন করা হবে। জুলাই অভ্যুত্থানে অবদান রয়েছে-এমন মানুষ ছাড়াও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে ইশতেহার চূড়ান্ত করা হবে।
উল্লেখ্য, গত বছরের ৩ আগস্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জনসমাবেশ থেকে ২৪ দফার ‘নতুন বাংলাদেশের ইশতেহার’ ঘোষণা করে এনসিপি। এর মধ্যে ছিল-নতুন সংবিধান ও সেকেন্ড রিপাবলিক; জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের স্বীকৃতি ও বিচার; গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সংস্কার; ন্যায়ভিত্তিক বিচারব্যবস্থা ও আইন সংস্কার; সেবামুখী প্রশাসন ও দুর্নীতি দমন; জনবান্ধব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী; গ্রাম পার্লামেন্ট ও স্থানীয় সরকার; স্বাধীন গণমাধ্যম ও শক্তিশালী নাগরিক সমাজ; সর্বজনীন স্বাস্থ্য; জাতিগঠনে শিক্ষানীতি; গবেষণা, উদ্ভাবন ও তথ্যপ্রযুক্তি বিপ্লব; ধর্ম, সম্প্রদায় ও জাতিসত্তার মর্যাদা; নারীর নিরাপত্তা, অধিকার ও ক্ষমতায়ন; মানবকেন্দ্রিক ও কল্যাণমুখী অর্থনীতি; তারুণ্য ও কর্মসংস্থান; বহুমুখী বাণিজ্য ও শিল্পায়ননীতি; টেকসই কৃষি ও খাদ্য সার্বভৌমত্ব; শ্রমিক-কৃষকের অধিকার; জাতীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনা; নগরায়ণ, পরিবহণ ও আবাসন পরিকল্পনা; জলবায়ু সহনশীলতা ও নদী-সমুদ্র রক্ষা; প্রবাসী বাংলাদেশির মর্যাদা ও অধিকার এবং জাতীয় প্রতিরক্ষা কৌশল।