আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১৮ থেকে ২৯ বয়সী তরুণদের সবচেয়ে বেশি সমর্থন রয়েছে জামায়াতে ইসলামীর প্রতি বলে এক জরিপে দেখা গেছে। প্রজেকশন বিডি, ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল অ্যান্ড ডিপ্লোমেসি (আইআইএলডি), জাগরণ ফাউন্ডেশন এবং ন্যারাটিভের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ‘প্রি-ইলেকশন পালস: অ্যান ইন-ডেপথ অ্যানালাইসিস অব দ্য বাংলাদেশি ইলেক্টোরেট শীর্ষক’ এক জনমত জরিপে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
আজ সোমবার (১২ জানুয়ারি) জাতীয় প্রেসক্লাবের তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে এই জরিপের ফলাফল প্রকাশ করা হয়। জরিপ উপস্থাপন করেন ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ল এণ্ড ডিপ্লোম্যাসির নির্বাহী পরিচালক শফিউল আলম শাহীন।
জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে, ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণ ভোটারদের মধ্যে জামায়াতের সমর্থন সর্বোচ্চ ৩৩ দশমিক ৬ শতাংশ। উচ্চশিক্ষিত জনগোষ্ঠী অর্থাৎ স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীদের মধ্যে দলটির সমর্থন ৩৭ দশমিক ৪ শতাংশ, যা অন্য যেকোনো দলের চেয়ে বেশি। এছাড়া ডিজিটাল মিডিয়া ও সোশ্যাল মিডিয়ায় তরুণ ও শিক্ষিত ভোটারদের সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রে দলটি এগিয়ে আছে।
জরিপের পরিধি ও পদ্ধতি প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, জরিপটি ২০২৫ সালের ২১ নভেম্বর থেকে ২০ ডিসেম্বর পর্যন্ত পরিচালিত হয়। এতে বাংলাদেশের ৬৪টি জেলার ২৯৫টি সংসদীয় আসনের অন্তর্ভুক্ত মোট ২২ হাজার ১৭৪ জন নিবন্ধিত ভোটার অংশগ্রহণ করেন। ভৌগোলিক, শহর-গ্রাম ও জনসংখ্যাগত ভারসাম্য নিশ্চিত করতে স্ট্রার্টিফায়েড স্যাম্পলিং ডিজাইন অনুসরণ করা হয় এবং ২০২২ সালের জাতীয় আদমশুমারির ভিত্তিতে পোস্ট-স্ট্রাটিফিকেশন ওয়েটিং প্রয়োগ করা হয়েছে।
জরিপে জাতীয় পর্যায়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ চিত্র উঠে এসেছে। জরিপ অনুযায়ী, বর্তমান জনসমর্থনের ভিত্তিতে ভোটের সম্ভাব্য বণ্টন হচ্ছে— বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ৩৪.৭ শতাংশ, জামায়াতে ইসলামী ৩৩.৬ শতাংশ, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ৭.১ শতাংশ, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ৩.১ শতাংশ এবং অন্যান্য দল ৪.৫ শতাংশ। তবে জরিপে শরিক বড় একটি অংশ এখনও সিদ্ধান্ত নেননি, এ সংখ্যাটি ১৭ শতাংশ।
জরিপকারী প্রতিষ্ঠান বলছে, মেশিন লার্নিং প্রজেকশন অনুযায়ী সিদ্ধান্তহীন ভোটারদের ঝোঁক বিবেচনায় নিলে বিএনপির সমর্থন ৪৩.২ শতাংশ এবং জামায়াতে ইসলামীর সমর্থন ৪০.৮ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
ভোটারদের প্রধান উদ্বেগ ও দলের সমর্থনের ভিত্তি হিসেবে বিএনপির ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা ও রাষ্ট্র পরিচালনার সক্ষমতা তুলে ধরা হয়েছে। অপরদিকে জামায়াতের ক্ষেত্রে ভোটাররা সততা ও পরিবর্তনের রাজনীতি আকৃষ্ট হচ্ছেন। জরিপের ফল অনুযায়ী, বিএনপির ৭২.১ শতাংশ সমর্থক দলটির অতীত অভিজ্ঞতা ও প্রশাসনিক সক্ষমতাকে সমর্থনের প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ডেমোগ্রাফিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৩০ থেকে ৪৪ বছর (৩৮.৪%) এবং ৪৫ থেকে ৫৯ বছর (৩৭.৪%) বয়সী কর্মক্ষম ভোটারদের মধ্যে বিএনপির সমর্থন বেশি। পেশাজীবীদের মধ্যে কৃষক (৪২.৬%) এবং শ্রমিকদের (৪০.৬%) মধ্যে বিএনপির শক্ত অবস্থান রয়েছে।
জামায়াতে ইসলামীর সমর্থকরা দলটিকে মূলত ‘কম দুর্নীতিগ্রস্ত’ (৪৪.৮%) এবং ‘সততার ভাবমূর্তি’র (৪০.৭%) কারণে সমর্থন করছেন। তরুণ প্রজন্মের (১৮-২৯ বছর বয়সী) মধ্যে জামায়াতের সমর্থন সর্বোচ্চ (৩৩.৬%)। উচ্চশিক্ষিত জনগোষ্ঠী বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীদের মধ্যে দলটির সমর্থন ৩৭.৪%, যা অন্য যেকোনো দলের চেয়ে বেশি। ডিজিটাল মিডিয়া ও সোশ্যাল মিডিয়ায় তরুণ ও শিক্ষিত ভোটারদের সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রে দলটি এগিয়ে আছে।
অপরদিকে নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে জাতীয় নাগরিক পার্টিকে (এনসিপি) সমর্থন করার পেছনে ৩৬.৭% মানুষ ‘জুলাই বিপ্লবে ভূমিক’কে প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন।
জরিপে ১৭ শতাংশ ভোটার এখনও সিদ্ধান্তহীন। তাদের মধ্যে ৩০.১% ভোটার জানিয়েছেন তারা কোনো রাজনৈতিক দলকেই বিশ্বাস করতে পারছেন না এবং ৩৮.৬% ভোটার কোনো মতামত দেননি। এই ভোটাররাই শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণে ‘গেম চেঞ্জার’ হিসেবে আবির্ভূত হতে পারেন।
জরিপের ফলাফল অনুযায়ী, ২০২৬ সালের নির্বাচনটি হবে ‘প্রয়োজনের শ্রেণিবিন্যাস’ (বিএনপির অভিজ্ঞতা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা) এবং ‘মূল্যবোধের শ্রেণিবিন্যাস’ (জামায়াতের সততা ও ন্যায়বিচার)-এর মধ্যে এক দার্শনিক ও রাজনৈতিক লড়াই। ভোটারদের একটি বিশাল অংশ প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, দুর্নীতি দমন এবং জুলাই অভ্যুত্থানের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছে।
প্রেসব্রিফ্রিং এ উপস্থিত ছিলেন ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল এন্ড ডিপ্লোম্যাসির চেয়ারম্যান ড. মাহফুজুল হক, সোয়াস ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের প্রফেসর রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. মুশতাক খান, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির স্কুল অব বিজনেসের ডিন ড. একেএম ওয়ারেসুল করিম, ইউনিভার্সিটি অফ রেজিনার এসোসিয়েট প্রফেসর ড. মুহাম্মদ আসাদুল্লাহ, বিডিজবসের প্রধান নির্বাহী একেএম ফাহিম মাশরুর, গণবিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রফেসর দিলারা চৌধুরী এবং সেন্টার ফর সিকিউরিটি এন্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব) আমসা আমিন প্রমুখ।