Image description

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রার্থিতা ফিরে পাওয়া কিংবা প্রার্থিতা বাতিলের দৌড়ে রীতিমত আদালত পাড়ায় রূপ পেয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নির্বাচন ভবন এখন আইনজীবীদের পদচারণায় মুখরিত।

সরেজমিন আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবন ঘুরে এমন চিত্র মিলছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ সময় ছিল গত ২৯ ডিসেম্বর।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি, জাতীয় পার্টি-জাপা, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামীসহ ৫১টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল ২ হাজার ৯১টি মনোনয়নপত্র জমা দেয়। এছাড়া স্বতন্ত্র থেকে জমা পড়ে ৪৭৮টি মনোনয়নপত্র। এরপর ৩০ ডিসেম্বর থেকে ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত রিটার্নিং কর্মকর্তারা মনোনয়নপত্র বাছাই করে রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ৭২৩টি মনোনয়নপত্র বাতিল করেন। বৈধ হয় ১৮৪২ জন।

বাতিল ৭২৩টি মনোনয়নপত্রের মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছেন ৩৫০ জনের মতো। বাকিগুলো ৫১টি নিবন্ধিত দলের। আবার দলগুলোর মধ্যে বিএনপির ২৭, জামায়াতে ইসলামীর ৯, জাতীয় পার্টির ৫৭ ও ইসলামী আন্দোলনের ৪১ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়। বিএনপির বাতিল হওয়া ২৭ জনের মধ্যে বেশিরভাগই দলীয় পরিচয়ে মনোনয়নপত্র দাখিল করলেও মনোনয়নপত্রের সঙ্গে দলীয় প্রার্থী হওয়ার প্রত্যয়ন ছিল না।

বিএনপির পরিচয়ে ৩৩১ জন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন।

জামায়াতে ইসলামীর ৯ প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়। দলটি থেকে ২৭৬ জন মনোনয়নপত্র দাখিল করেছিলেন। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ২৬৮ জন প্রার্থীর মধ্যে ৪১ জনের প্রার্থিতা বাতিল হয়। বৈধতা পান ২২৭ জন।

দলগতভাবে সবচেয়ে বেশি প্রার্থিতা বাতিল হয় জাতীয় পার্টির। দলটির ২২৪ জনের মধ্যে ৫৭ জন বাদ পড়েন। বৈধতা পান ১৬৭ জন।

কেন বিরাট সংখ্যক প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হলো:

ইসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রিটার্নিং কর্মকর্তারা বাছাইয়ের সময় আইনে নির্ধারিত নিয়মকানুন মানার বিষয়ে কোনো ঘাটতি আছে কিনা, মূলত সেটা দেখেন। এক্ষেত্রে এক ডজনের মতো কারণ ওঠে এসেছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে হলফনামায় স্বাক্ষর না থাকা, ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে উপস্থিত থেকে স্বাক্ষর না করা, ‍ঋণ খেলাপ, ইউটিলিটি বিল পরিশোধ না করা, আয়কর বিবরণী না দেওয়া, মনোনয়ণপত্র পূরণে অসম্পূর্ণতা রাখা, দ্বৈত নাগরিকত্ব, মামলা সংক্রান্ত তথ্য উল্লেখ না করা, তথ্য গোপন করা, জামানতকারী হিসেবে ঋণ খেলাপ, সরকারি চাকরি থেকে অবসরের তিন বছর অতিবাহিত না হওয়া, দলের প্রত্যয়ন না দেওয়া ও ১ শতাংশ ভোটারের সমর্থনসূচক স্বাক্ষর না থাকায় প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে (স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্য প্রযোজ্য বিধান)।

শুনানির আইনি কাঠামো:

ইসি কর্মকর্তারা বলছেন, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী রিটার্নিং কর্মকর্তাদের দেওয়ার আদেশের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনে আপিল করা যায়। এছাড়া কমিশনেও সুচিবার না পেলে সংক্ষুব্ধ প্রার্থী হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চে যেতে পারেন। আইনের এ সুযোগটি দেওয়ার জন্য কমিশন ৫ থেকে ৯ জানুয়ারি আপিল আবেদন গ্রহণ করে। এতে আবেদন জমা পড়ে ৬৪৫টি। গত ১০ জানুয়ারি থেকে আপিল আবেদনের শুনানি শুরু করেছে ইসি, যা চলেবে আগামী ১৭ জানুয়ারি পর্যন্ত। আপিলের শুনানিতে আইনজীবীর মাধ্যমেও যুক্তি-তর্ক উপস্থাপনের সুযোগ রয়েছে। আর এ কারণেই এখন নির্বাচন কমিশন রূপ পেয়েছে আদালত চত্বরের।

প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে তিন দফা বিরতি দিয়ে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত চলছে শুনানি। এতে কোনো প্রার্থীর যুক্তি-তর্ক উপস্থাপনে সর্বোচ্চ তিনজন করে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিনের সভাপতিত্বে পাঁচ সদস্যের কমিশন শুনানি নিয়ে রায় দিচ্ছেন। এরই মধ্যে ১৩২ প্রার্থীর শুনানি হয়েছে। আটজনের শুনানি এখনো সম্পন্ন হয়নি। দুদিনের শুনানিতে অনেক প্রার্থীই একাধিক আইনজীবী সঙ্গে নিয়ে আসছেন। কারো কারো সঙ্গে একজন লিড আইনজীবী, সঙ্গে চার-পাঁচজন করে আসছেন সহকারী। নিম্ন আদালত কেবল নয়, হাইকোর্টের আইনজীবী নিয়েও কেউ কেউ লড়ছেন ভোটের লড়াই। এটা অবশ্য প্রার্থীদের জন্য ভালোই হচ্ছে। বেশিরভাগই শুনানিতে ফিরে পাচ্ছেন প্রার্থিতা। দুদিনের (১০ ও ১১ জানুয়ারি) শুনানিতে ১০৯ জন প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন। আবার একজনের প্রার্থিতা বাতিলও হয়েছে।

প্রার্থী ও আইনজীবীদের অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শুনানিতে বেশিরভাগ আইনজীবীই নিয়োগ হচ্ছেন চুক্তিতে। এক্ষেত্রে অনেকের টিমে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত চুক্তি হচ্ছে। তবে এর ব্যতিক্রমও আছে। পেশায় নবীন আইনজীবীদের অনেকে নিয়োগ করেছেন দৈনিক ভিত্তিতে। তাদের পেছনে আবার কম ব্যয় করতে হচ্ছে।

এ কদিনে হেভিওয়েট প্রার্থীরাও তাদের আইনজীবীর মাধ্যমেই যুক্তি উপস্থাপন করেছেন। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ, নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্নার মতো প্রার্থীরাও আইনজীবী নিয়োগ করেই ফিরে পেয়েছেন প্রার্থিতা। জাতীয় পার্টির প্রার্থীদের জন্যও লড়ছেন দলটির মহাসচিব ও আইনজীবী শামীম হয়দার পাটোয়ারী।

এদিকে বিভিন্ন শুনানিতে সুবিধা পেতে অনেকেই কর্মকর্তাদের সঙ্গেও দফা করতে চাচ্ছেন। নির্বাচন ভবনে প্রবেশের জন্য তদবির আসছে বলেও জানা গেছে। তাই স্টাফদের চোখে চোখে রাখছেন কর্মকর্তারাও। তবে সুনির্দিষ্ট কারণ ও প্রমাণ ছাড়া নির্বাচন ভবনে প্রবেশে কড়াকড়ি চলায় তেমন সুবিধা করতে পারছেন না সংশ্লিষ্টরা। কেউ কেউ এসে রিসিপশনের সামনেই বসে থাকছেন।

এ বিষয়ে ইসির নির্বাচন ব্যবস্থাপনা শাখার (সংযুক্ত) উপ-সচিব মো. ফরহাদ হোসেন বলেন, নির্বাচন কমিশনের আপিল শুনানি কার্যক্রম আধাবিচারিক। তাই কেউ চাইলে নিজেই নিজেদের যুক্তি উপস্থাপন করতে পারেন। আবার আইনজীবীও নিয়োগ করতে পারেন। এতে কোনো আইনি বাধা নেই।

ইসির আইন শাখার সিনিয়র সহকার সচিব আরিফুর রহমান জানিয়েছেন, ১২ জানুয়ারি ১৪১ থেকে ২১০ নম্বর, ১৩ জানুয়ারি ২১১ থেকে ২৮০ নম্বর, ১৪ জানুয়ারি ২৮১ থেকে ৩৮০ নম্বর, ১৫ জানুয়ারি ৩৮১ থেকে ৪৮০ নম্বর, ১৬ জানুয়ারি ৪৮১ থেকে ৫১০ নম্বর, ১৭ জানুয়ারি ৫১১ থেকে ৬১০ নম্বর ও ১৮ জানুয়ারি ৬১১ থেকে ৬৪৫ নম্বর আপিলের শুনানি অনুষ্ঠিত হবে।

ইসি ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, আপিল নিষ্পত্তির পর প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ২০ জানুয়ারি। রিটার্নিং কর্মকর্তা চূড়ান্ত প্রার্থীর তালিকা প্রকাশ করে প্রতীক বরাদ্দ করবেন ২১ জানুয়ারি। নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হবে ২২ জানুয়ারি। প্রচার চালানো যাবে ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে সাতটা পর্যন্ত। আর ভোটগ্রহণ হবে ১২ ফেব্রুয়ারি।

৫৯টি নিবন্ধিত দলের মধ্যে আটটি দল প্রার্থী দেয়নি। দলগুলো হলো-বাংলাদেশ সাম্যবাদী দল (এমএল), কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, বিকল্পধারা বাংলাদেশ, বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন, তৃণমূল বিএনপি, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন-বিএনএম। এছাড়া নিবন্ধন স্থগিত হওয়ায় আওয়ামী লীগ ভোটের বাইরে রয়েছে।