Image description

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের আর মাত্র এক মাস বাকি। সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানে এরই মধ্যে নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। ভোটের দিনক্ষণ যত ঘনিয়ে আসছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক রাখতে ততই নতুন কৌশলে হাঁটছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গ্রেপ্তার অভিযানেও আসছে পরিবর্তন। এখন থেকে ধরে ধরে শুধু ‘ডেভিলদের’ (কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠন) গ্রেপ্তার নয়, আসন্ন নির্বাচনে বাধা বা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে বা করতে পারে—এমন মনে হলেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারের কৌশল নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) পক্ষ থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ইসি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে এ তথ্য মিলেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, যারা আসন্ন নির্বাচনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে, এরই মধ্যে এমন লোকদের তালিকা তৈরি করার নির্দেশনা দিয়েছে ইসি। চলমান অভিযানের সঙ্গে ওই তালিকাভুক্তদের নজরদারির পাশাপাশি প্রয়োজনে আইনের আওতায় নিতেও বলা হয়েছে।

এ নিয়ে গতকাল রোববার পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম কালবেলাকে বলেছেন, ‘যারা নির্বাচনের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে ষড়যন্ত্র করছে, তাদের বিরুদ্ধে ছয় মাস ধরেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, যা সামনের সময়েও অব্যাহত থাকবে।’

ইসি কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্র জানায়, গতকাল ইসির সম্মেলন কক্ষে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সশস্ত্র বাহিনী, বিজিবি, পুলিশসহ ১৬ বিভাগ ও সংস্থার ফোকাল পয়েন্ট বা প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে আইনশৃঙ্খলা বিষয়ে এক বৈঠক হয়। ওই বৈঠকে নির্বাচনে বাধা সৃষ্টি করতে পারে—এমন ব্যক্তিদের বিষয়ে আলোচনা হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ।

বৈঠকে অংশ নেওয়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এক কর্মকর্তা কালবেলাকে বলেন, ‘সম্প্রতি নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ মাঠপর্যায়ে ঘুরে এসেছেন। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি মাঠপর্যায়ে কো-অর্ডিনেশন ও অপারেশন জোরদার করতে বলেছেন। পাশাপাশি বৈঠক থেকে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের পাশাপাশি যারা নির্বাচন অনুষ্ঠানে সমস্যা তৈরি করতে পারে, নির্বাচনের জন্য যারা হুমকি, তাদের তালিকা করে আইনের আওতায় নিয়ে আসার কথা বলা হয়েছে।’

এ তালিকা কারা করবে এবং কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে—জানতে চাইলে ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট পুলিশ সুপার অন্যান্য বাহিনীর সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য সমন্বয় করে তালিকা করবে বলে সিদ্ধান্ত হয়েছে। তাদের কার্যক্রম নজরদারি করা এবং যথোপযুক্ত তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার করতে হবে।’

বৈঠকে অংশ নেওয়া অন্য এক কর্মকর্তা বলেন, ‘নির্বাচনে বাধা সৃষ্টিকারীদের গ্রেপ্তারে নজরদারি ও অভিযান চালানো হলেও অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেস-২ অব্যাহত থাকবে। তবে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সমর্থক হলেই হয়রানি করা যাবে না। শুধু যারা অপরাধের সঙ্গে যুক্ত, ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত থাকবে, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।’

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে ইসি কর্মকর্তাদের বৈঠকে নির্বাচনের আগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত বাহিনীগুলোকে স্থানীয়ভাবে সমন্বয় করে কাজ করতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি যৌথ অভিযান জোরদার করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ রাখার জন্য ইসি থেকে সমন্বয় সেল, ভিজিল্যান্স টিম, মনিটরিং টিমসহ রিটার্নিং কর্মকর্তার সমন্বয়ে অনেক কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে এসব কমিটি ঠিকমতো কাজ করছে না বলে গতকালের বৈঠকের আলোচনায় উঠে এসেছে। বৈঠক থেকে সেগুলো যেন ভালোভাবে কাজ করে, সেটা জোর দিতে বলা হয়েছে। মনিটরিংয়ের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে তথ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং নির্বাচন কমিশনকে সময়ে সময়ে অবহিত করতেও বলেছেন ইসি।

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। এর আগে গত ১১ ডিসেম্বর নির্বাচন কমিশন ওই নির্বাচনের তপশিল ঘোষণা করে। এরপরই ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ও জুলাই অভ্যুত্থানের পরিচিত মুখ শরিফ ওসমান বিন হাদি আততায়ীর গুলিতে শহীদ হন। তিনি ঢাকা-৮ আসনে সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনী কার্যক্রম চালাচ্ছিলেন। ওই ঘটনার পর জাতীয় নির্বাচনের আগে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়। পরে গত ১৩ ডিসেম্বর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সভায় ‘ডেভিল হান্ট ফেস-২’ চালুর সিদ্ধান্ত হয়। ওইদিন সন্ধ্যা থেকে শুরু হওয়া অভিযানে ১ জানুয়ারি পর্যন্ত ১২ হাজার ৬০৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ সময়ে উদ্ধার হয়েছে ১৫৬টি অবৈধ অস্ত্র।

এর আগে গাজীপুরে হামলার পর গত বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি যৌথ বাহিনী সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ শুরু করে। এ অভিযানে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার করা হয়। ব্যাপক ধরপাকড় শুরু হলে এ অভিযান নিয়ে সমালোচনাও হয়। প্রকৃত অপরাধীদের গ্রেপ্তার না করে ‘নিরীহদের’ গ্রেপ্তারের অভিযোগ ওঠে। আলোচনা-সমালোচনার মধ্যেই কোনো ঘোষণা ছাড়াই প্রথম ধাপে শুরু হওয়া ডেভিল হান্ট বন্ধ হয়ে যায়।

তবে পুলিশ সদর দপ্তরের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তখন ডেভিল হান্ট বন্ধ হয়নি। সন্ত্রাসী, অপরাধীদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর নিয়মিত কাজ, তা চলমান ছিল। পরিস্থিতি যেন খারাপের দিকে না যায় এবং সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা যায়, সেজন্য দ্বিতীয় দফায় ডেভিল হান্ট শুরু হয়।

অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের জোর তাগিদ: ইসির সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলোর কর্মকর্তাদের বৈঠকে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের জোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পুলিশ সদর দপ্তর থেকেও মাঠ পুলিশে এই বিষয়ে কড়া নির্দেশনা রয়েছে।

পুলিশ সূত্র জানায়, এখনো পুলিশের থানা ও স্থাপনা থেকে লুণ্ঠিত ১ হাজার ৩৩৫টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং ২ লাখ ৫৭ হাজার ১৮৯ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। অপারেশন ডেভিল হান্ট চালিয়ে এবং পুরস্কার ঘোষণা করেও এসব অস্ত্র-গুলি উদ্ধার করা যায়নি।

পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, এসব অস্ত্র উদ্ধারে পুলিশের প্রতিটি ইউনিটকেই নির্দেশনা দেওয়া আছে। খোয়া যাওয়া অস্ত্রগুলো ছাড়াও দেশের বাইরে থেকে যেন অস্ত্রের চোরাচালান না হয়, সে ব্যাপারেও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, অনেক জায়গায় অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার দেখা যাচ্ছে। যেগুলোর সব খোয়া যাওয়া অস্ত্র নয়। অন্য অস্ত্রও রয়েছে। এসব অস্ত্রের একটা অংশ পরবর্তী সময়ে উদ্ধারও হয়েছে। তবে খোয়া যাওয়া ভারী অস্ত্রগুলোর ব্যবহার দেখা যায়নি। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়েও কিছু অস্ত্র এসেছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। তবে সেটার পরিমাণ খুব বেশি নয়। এসব অস্ত্রের গতিপথ অনুসরণ করে সেগুলোও উদ্ধারের চেষ্টা চলমান আছে।