Image description
ভুল নীতি ও ষড়যন্ত্রের ফাঁদে টেক্সটাইল: পর্ব-২

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প ধ্বংসের জন্য সুপরিকল্পিত ও দীর্ঘমেয়াদি ষড়যন্ত্রের ছক কষেছে ভারত। যার প্রথম ধাপ হচ্ছে-কিছুটা কম দামে সুতা ডাম্পিংয়ের (উৎপাদন খরচের চেয়ে কম মূল্যে রপ্তানি) মাধ্যমে বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া। এর সুবাদে পরের ধাপে স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের বিকাশমান টেক্সটাইল মিলগুলো মুখ থুবড়ে পড়বে। তখন ভারতের একচেটিয়া ব্যবসার পথ সুগম হবে। এ কারণে ইতোমধ্যে ভারতীয় সুতার সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না দেশের মিলগুলো। অবিক্রীত সুতার পাহাড় জমছে স্পিনিং মিলগুলোর গোডাউনে। প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার সুতা অবিক্রীত অবস্থায় পড়ে আছে, বন্ধ হয়ে গেছে ৫০টির বেশি মিল। এ বিষয়ে বাণিজ্য ও বস্ত্র উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন রোববার যুগান্তরকে বলেন, টেক্সটাইল শিল্পকে সুরক্ষার বিভিন্ন কৌশল ও পদ্ধতি পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এসব বিষয় নিয়ে কাজ করছে ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন। তাদের সুপারিশ পাওয়ার পর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেবে।

ইন্টারনেট ঘেঁটে ভারতীয় আগ্রাসনের কিছুটা ধারণা পাওয়া গেছে। সরাসরি প্রণোদনা না দিলেও ভিন্ন নামে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার সুতা উৎপাদন ও রপ্তানিতে অন্তত ৮ ধরনের নীতি সহায়তা দিয়ে থাকে। রোডট্যাপ কর্মসূচির আওতায় প্রতি কেজি সুতায় ১৩ সেন্ট বা ১১ রুপি প্রণোদনা এবং ডিউটি ড্র ব্যাক দেওয়া হয় ৬ সেন্ট। এছাড়া রাজ্য সরকারগুলোও টেক্সটাইল মিল স্থাপনে নানা ধরনের প্রণোদনা দিয়ে থাকে। যেমন: মহারাষ্ট্র সরকার নতুন প্রকল্পের জন্য মোট বিনিয়োগের ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ প্রণোদনা দেয়। হ্রাসকৃত হারে বিদ্যুৎ দেওয়া হয়। জমি অধিগ্রহণে স্ট্যাম্প ডিউটি অব্যাহতি দেওয়া আছে। আছে আয়কর সুবিধা। পাশাপাশি মানবসম্পদ উন্নয়নে বিশেষ আর্থিক সহায়তাও বহাল আছে। তামিলনাড়ু মূলধন প্রণোদনা, আয়কর অব্যাহতি ও জমির দামে ৫০ শতাংশ ছাড় দেয়।

একইভাবে গুজরাট সরকার টেক্সটাইলে বিনিয়োগের মোট ৩০ শতাংশ প্রণোদনা দেয়। আয়কর অব্যাহতি, বিদ্যুৎ বিলে ছাড়, মূলধনি বিনিয়োগে ২৫ শতাংশ বিশেষ সহায়তা দেয়। অন্ধ্রপ্রদেশ মূলধনি প্রণোদনা দেয় ৩০-৪০ শতাংশ, আয়কর অব্যাহতি দেয় ৭-১২ শতাংশ এবং বিদ্যুৎ বিলে অব্যাহতি দেয়। জমির দামে ৫০ শতাংশ ছাড় দেওয়া হয়। বিহারে মোট বিনিয়োগের ২৫ শতাংশ মূলধনি প্রণোদনা দেওয়া হয়। এছাড়া কর অব্যাহতি; বিদ্যুৎ বিল, জমির দাম ও ব্যাংক ঋণে ছাড় এবং বিশেষ আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয় ১০ শতাংশ। দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নে নারী কর্মীদের বেতন ও আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। জমি রেজিস্ট্রেশনে স্ট্যাম্প ডিউটি ও রেজিস্ট্রেশন ফিতে ছাড় আছে। বাংলাদেশের পার্শ্ববর্তী রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে কারখানা স্থাপন ও আধুনিক যন্ত্রপাতি ক্রয়ে ১০-২০ শতাংশ ভর্তুকি দেওয়া হয়। জমি রেজিস্ট্রেশনে স্ট্যাম্প ডিউটি ও রেজিস্ট্রেশন ফিতে ছাড় এবং ইটিপি (বর্জ্য শোধনাগার) স্থাপনে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ ফেরত দেওয়া হয়।

সূত্র জানায়, ২০২৪ সালে বস্ত্রশিল্পের উন্নয়নে ভারত রোডম্যাপ করে। পরিকল্পনা অনুযায়ী এ সেক্টরের আকার ২০৩০ সালের মধ্যে ৩৫ হাজার কোটি ডলারে উন্নীত করবে। এ সময়ের মধ্যে বস্ত্রশিল্পে সাড়ে ৪-৬ কোটি কর্মসংস্থান তৈরি করা হবে। বস্ত্র ও পোশাক খাতের রপ্তানি ১০০ বিলিয়ন বা ১০ হাজার কোটি ডলারে উন্নীত করতে চায়। ২০৪৭ সাল নাগাদ ভারত ৬০০ বিলিয়ন বা ৬০ হাজার কোটি ডলার আয় করার লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে।

পক্ষান্তরে টেক্সটাইল খাতের জন্য বাংলাদেশের উদ্যোগ ও নীতিসহায়তা এর ধারেকাছে নেই। এখন পর্যন্ত বস্ত্র খাতের জন্য সরকার যা করেছে তা হলো-শুধু স্থলবন্দর দিয়ে সুতা আমদানি বন্ধ করেছে। অথচ এ সময়ে রপ্তানিমুখী শিল্পের প্রণোদনা ৪ শতাংশ থেকে কমিয়ে দেড় শতাংশ করে এ খাতের বিনিয়োগকারীদের বিপাকে ফেলা হয়। এছাড়া রপ্তানি উন্নয়ন তহবিলের আকার কমানো হয়। এরসঙ্গে গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি, ডলারের সংকট এবং টাকার অবমূল্যায়নের কারণে ওয়ার্কিং ক্যাপিটালের ঘাটতি আগে থেকেই বিরাজমান। উপরন্তু মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে ভর করেছে ব্যাংকের উচ্চসুদ, যা এখন ১৫-১৬ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।

এদিকে আমদানির তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ভারতীয় রপ্তানিকারকরা তাদের প্রণোদনা প্যাকেজ কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশে সুতা ডাম্পিং শুরু করেছে। কেননা ভারত ও বাংলাদেশ উভয় দেশেই সুতার উৎপাদন খরচ প্রতি কেজি ৩ ডলার। কিন্তু শুধু প্রণোদনার ওপর ভর করে দেশটি বাংলাদেশে উৎপাদন খরচের চেয়ে কম মূল্যে সুতা রপ্তানি করছে। স্থানীয় বাজারে ভারত যে সুতা কেজিপ্রতি ২ ডলার ৮৫ সেন্টে বিক্রি করছে, সেই সুতা বাংলাদেশে আড়াই ডলারে রপ্তানি করা হচ্ছে। এর ফলে অসম প্রতিযোগিতায় পড়তে হচ্ছে বাংলাদেশের স্পিনিং মিলগুলোকে।

এ অবস্থায় শিল্পকে টিকিয়ে ভারতীয় সুতায় সেফগার্ড শুল্ক আরোপ করতে ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের দ্বারস্থ হয়েছে টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ)। গত বৃহস্পতিবার সংগঠনটির নেতারা ট্যারিফ কমিশনের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের সঙ্গে দেখা করেন। বৈঠকে টেক্সটাইল মিল মালিকরা ভারতের সুতা ডাম্পিংয়ের বিস্তারিত তথ্যপ্রমাণ উপস্থাপন করেন। একই সঙ্গে স্পিনিং মিলগুলোকে বাঁচাতে ভারতীয় সুতায় সেফগার্ড শুল্ক আরোপের সুপারিশ করেন।

এ বিষয়ে বিটিএমএ-এর সহসভাপতি সালেউদ জামান যুগান্তরকে বলেন, বাংলাদেশ সরকার ও গার্মেন্ট মালিকরা না বুঝে নিজের পায়ে নিজেরাই কুড়াল মারছেন। দীর্ঘদিনের গড়ে ওঠা টেক্সটাইল শিল্পকে সরকার ভুল নীতি গ্রহণের মাধ্যমে ধ্বংস করে দিচ্ছে। উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও বন্ড সুবিধায় সুতা আনার সুযোগ অব্যাহত রেখেছে। এই সুযোগে বানের পানির মতো ভারত থেকে সুতা ঢুকছে। অপেক্ষাকৃত কম দামে সুতা পাওয়ায় বাংলাদেশের গার্মেন্টরা এই সুযোগ লুফে নিচ্ছে। কিন্তু তারা বুঝতে পারছে না, দীর্ঘ মেয়াদে এর ফল ভালো হবে না। ভারত ডাম্পিং মূল্যে সুতা রপ্তানি করতে থাকলে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে একসময় বাংলাদেশের স্পিনিং মিলগুলো বন্ধ হয়ে যাবে। তখন ভারত সুতার মনোপলি ব্যবসার সুযোগ পাবে। চাইলেও বাংলাদেশকে সুতা দেবে না, যেমনটা করেছিল করোনার সময়। বাংলাদেশে যখন সুতার ক্রাইসিস, তখন ভারত সুতা রপ্তানি বন্ধ করে দেয়।

তিনি আরও বলেন, স্পিনিং মিলগুলোকে বাঁচাতে সরকারকে দ্রুততার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। হয় সুতা আমদানিতে সেফগার্ড শুল্ক আরোপ করতে হবে, নয়তো বন্ডের আওতায় সুতা আমদানি বন্ধ করতে হবে। এক্ষেত্রে যতদিন সেফগার্ড শুল্ক আরোপ করা না যায়, ততোদিন বন্ডের আওতায় সুতা আমদানি বন্ধ রাখতে হবে। এ সময় গার্মেন্ট শিল্প যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেজন্য সুতা আমদানির সময় পরিশোধিত শুল্ক ডিউটি ড্র ব্যাক হিসাবে ফেরত দেওয়ার নীতি গ্রহণ করতে হবে। তা না হলে আগামী ৬ মাস পর টেক্সটাইল মিলের ব্যবসা থাকবে না।

আক্ষেপ প্রকাশ করে সালেউদ জামান বলেন, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) বিধিবিধানের তোয়াক্কা না করে ভারত যখন ইচ্ছা তখন বাংলাদেশের পাটপণ্যের ওপর অ্যান্টি ডাম্পিং ডিউটি আরোপ করে। কিন্তু সুতা ডাম্পিংয়ের সব ধরনের তথ্যপ্রমাণ দেওয়ার পরও সরকার সেফগার্ড শুল্ক আরোপ না করায় টেক্সটাইল শিল্প মালিকদের মাঝে হতাশা বাড়ছে।

আউটপেস স্পিনিং মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সাবেক বিটিএমএ পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার রাজিব হায়দার বলেন, সুতা ডাম্পিং করে ভারত বাংলাদেশের ওপর অর্থনৈতিক আগ্রাসন চালাচ্ছে। প্রকারান্তরে এটি পরাধীনতার শামিল। উৎপাদন ব্যয় একই হওয়া সত্ত্বেও শুধু প্রণোদনার কারণে ভারত আড়াই ডলারে সুতা বাংলাদেশে ডাম্পিং করছে। এই আগ্রাসনের পরিণতি যে কত ভয়াবহ হবে, তা তিন মাস পরের পরিসংখ্যানই বলে দেবে। কতজন মিল চালাচ্ছে, কতজন বন্ধ করে দিয়েছেন, তখনই সম্পূর্ণভাবে পরিষ্কার হয়ে যাবে। তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র পারস্পরিক শুল্কের শর্তে স্থানীয় মূল্যসংযোজন বাড়ানোর শর্ত দিয়েছে। আমরা কি সেই শর্ত পূরণে নীতি গ্রহণ করতে পেরেছি, ভারত থেকে সুতা আমদানির মাধ্যমে সেই শর্ত কি পূরণ করা আদৌ সম্ভব? এ বিষয়ে সরকারের সুস্পষ্ট নীতি প্রণয়ন করা উচিত।