দেশে গেল ১০ বছর ধরে গ্যাসের উৎপাদন ও সরবরাহ সংকট প্রকট। এরপরও আওয়ামী লীগ আমলে ছয়টি কোম্পানিকে গ্যাসভিত্তিক বৃহৎ বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র (আইপিপি) স্থাপনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, গ্যাস সরবরাহ করতে ব্যর্থ হলে রাষ্ট্রায়ত্ত গ্যাস বিতরণ কোম্পানিকে উলটো জরিমানার শর্ত রেখে এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গ্যাস ক্রয় চুক্তি (জিপিএ) করা হয়েছে। তিতাসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইতোমধ্যে একটি কোম্পানি থেকে জরিমানা আদায়ের জন্য তিতাসকে চিঠি দিয়েছে।
এ বিষয়ে জ্বালানি সচিব সাইফুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, এ ধরনের চুক্তি দেশের স্বার্থবিরোধী। এসব চুক্তি সংশোধনে কাজ করছে সরকার।
তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহনেওয়াজ পারভেজ বলেছেন, সবাই জানে দেশে গ্যাসের উৎপাদন ও সরবরাহ কমছে। এর মধ্যে এ ধরনের চুক্তি বিব্রতকর।
ছয় কোম্পানির বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো হলো-সামিট মেঘনাঘাট-১, সামিট মেঘনাঘাট-২, ইউনিক মেঘনাঘাট, জেরা ৭১৮ মেগাওয়াট, ইউনাইটেড আনোয়ারা ৫৯০ মেগাওয়াট ও নর্থওয়েস্ট পাওয়ার কোম্পানির রূপসা ৮৮০ মেগাওয়াট। এর মধ্যে ইউনাইটেড ও রূপসা এখনো চালু হয়নি। সামিটের মেঘনাঘাট-১ ছাড়া সবকটি বিশেষ আইনে কোনো টেন্ডার ছাড়াই বসাতে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, সামিট পাওয়ার ২০১৯ সালের মার্চে, ইউনিক একই বছরের জুলাইয়ে এবং জেরা (সাবেক রিল্যায়েন্স পাওয়ার) সেপ্টেম্বরে ওই চুক্তি করে। এছাড়া ২০২১ সালের অক্টোবরে ইউনাইটেড ও ২০২৩ সালের মার্চে নর্থওয়েস্টের সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছে।
সরকারি কর্মকর্তারা জানান, বিশেষ সুবিধা নিতেই এসব প্রতিষ্ঠানকে গ্যাসের সংযোগ দেওয়া হয়েছে। এখন এই ৬টির মধ্যে শুধু সামিট মেঘনাঘাট-১ বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়মিত চলে। বাকিগুলো অলস বসে আছে।
পিডিবি জানিয়েছে, মেঘনাঘাটের পুরো এলাকা একটি পাওয়ার হাব। এর মধ্যে গ্যাস সংকটে বেশিরভাগ বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ থাকে। কিন্তু সেই তুলনায় বিদ্যুৎ সঞ্চালনে যথেষ্ট লাইন নেই।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে ৫০টি। এর মধ্যে তিতাসের আওতায় আছে ১৮টি। যার জন্য প্রয়োজন দৈনিক ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস। কিন্তু পেট্রোবাংলার নির্দেশনা অনুযায়ী, এসব কেন্দ্রের জন্য গ্যাস বরাদ্দ রাখা হয়েছে মাত্র ২৭ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে গ্যাস দিতে না পারলে তিতাসকে জরিমানা দিতে হবে এ ধরনের বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে ৫টি। এই ৫টির জন্য দৈনিক লাগবে ৪৩ কোটি ৭০ লাখ ঘনফুট গ্যাস।
তিতাসের কর্মকর্তারা জানান, বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে মেঘনাঘাট কেন্দ্রের জন্য ১৯৯৯ সালে গ্যাস ক্রয় চুক্তি করা হয়েছিল। যেখানে প্রথমবারের মতো গ্যাস দিতে না পারলে জরিমানা দেওয়ার শর্ত দেওয়া হয়েছিল। ওই সময়ে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে ওই শর্ত মেনে নেওয়া হয়েছিল। এরপর এই শর্ত প্রথম দেয় সামিট।
বিদেশি কোম্পানি পাওয়াটেক ১৩ অক্টোবর মেঘনাঘাট কেন্দ্রে গ্যাস দিতে না পারার অভিযোগে ৩১ কোটি ৬০ লাখ টাকা দাবি করে একটি চিঠি দিয়েছে তিতাসকে। সামিট গ্রুপ ২০২৪ সালের ২৯ অক্টোবর তাদের ৩৩৫ মেগাওয়াটের কেন্দ্রে জিএসএ অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ করতে বলেছে। নতুবা আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে।
আইপিপির কর্মকর্তারা জানান, চুক্তি অনুযায়ী বিদ্যুৎ দিতে না পারলে পিডিবি জরিমানা করছে। কিন্তু গ্যাসও পাওয়া যাচ্ছে না। তাই গ্যাস বিতরণ কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিতে জরিমানার শর্ত রাখা হয়েছে।
বেশি বিনিয়োগ দেখিয়ে ৪৮ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা : এদিকে গ্যাসভিত্তিক ৫টি বেসরকারি (আইপিপি) বিদ্যুৎকেন্দ্রে বেশি বিনিয়োগ দেখিয়ে ক্যাপাসিটি চার্জের নামে কমপক্ষে ৪ বিলিয়ন ডলার বা ৪৮ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। তাই ওই ৫ কোম্পানির ক্যাপাসিটি চার্জ কামনোর উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে বিদ্যুৎ বিভাগ।
বিদ্যুৎ খাতের বিশেষজ্ঞদের একটি কমিটি বিভিন্ন আইপিপির ট্যারিফ নিয়ে একটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বিশেষজ্ঞরা পিডিবির ঘোড়াশাল ও নর্থওয়েস্ট পাওয়ারের ৮৮০ মেগাওয়াট কেন্দ্রের সঙ্গে ৫টি বৃহৎ আইপিপির বিনিয়োগ এবং ২৫ বছরে তাদের ক্যাপাসিটি চার্জ তুলনা করে মারাত্মক অনিয়মের তথ্য পেয়েছে। গ্যাসভিত্তিক ওই ৫ আইপিপি হলো-সামিট মেঘনাঘাট-২, ইউনিকের ৫৮৪ মেগাওয়াটের কেন্দ্র, জেরা ৭৮০ মেগাওয়াট, ভোলার ২২৫ মেগাওয়াটের নুতন বিদ্যুৎ ও সিরাজগঞ্জে ৪১৩ মেগাওয়াটের সেমক্রপ বিদ্যুৎকেন্দ্র।
সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রে ২৫ বছর ধরে ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হবে প্রতি কিলোওয়াট প্রতি মাসে প্রায় ১২ ডলার। কিন্তু ঘোড়াশাল এবং অন্যান্যগুলোর বিনিয়োগ ধরলে এ চার্জ দাঁড়ায় ৭ ডলার। এ হিসাবে মনে করা হচ্ছে ওই ৫ কেন্দ্রে ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার বেশি ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হবে পিডিবিকে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বিদ্যুৎ খাতের অনিয়ম নিয়ে যুগান্তরকে বলেন, পতিত সরকার আমলে দলীয় রাজনীতি, সুবিধাবাদী অর্থনৈতিক শক্তি ও সরকারি কর্মকর্তারা মিলে বিদ্যুৎ খাতে ভয়াবহ দুর্নীতি করেছে। যা বিশ্বের কোনো দেশে নজির নেই। এ থেকে বিশেষ করে সরকারি কর্মকর্তারা কোনোভাবেই ছাড় পাওয়ার নয়।