লেখক ঃ আসিফ শাহিন
২০২৫ সালের জানুয়ারি বা ফেব্রুয়ারিতে আমি একটি ফেসবুক পোস্টে লিখেছিলাম যে জামায়াতে ইসলামীর ভোটের হার খুব বেশি বাড়েনি এবং তা সম্ভবত ১৫ শতাংশের বেশি হবে না।
আমি ভুল ছিলাম।
সাম্প্রতিক সময়ে মাঠপর্যায়ে ঘুরে এবং বাস্তব পরিস্থিতি দেখে আমার ধারণা, জামায়াতের ভোটশেয়ার এখন ৩০ শতাংশের কাছাকাছি—এমনকি এর বেশি হওয়ার সম্ভাবনাও আছে। জামায়াতে ইসলামীর প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলো যদি এখনও এই বাস্তবতা অস্বীকার করে এবং কার্যকরভাবে প্রতিক্রিয়া না জানায়, তাহলে দেশ একটি বড় ধরনের নির্বাচনী চমকের দিকে এগোতে পারে।
২০২৫ সালজুড়ে জামায়াতে ইসলামী অত্যন্ত কৌশলগতভাবে যেটা করেছে, সেটাকে বলা যায় “বিভ্রান্তির রাজনীতি”। একদিকে তারা তৃণমূল পর্যায়ে বিএনপির চাঁদাবাজি ও সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক অবস্থান নিয়েছে। অন্যদিকে জাতীয় পর্যায়ে তারা সংস্কারমূলক কথাবার্তায় জোর দিয়েছে, যার ফলে বিএনপির মনোযোগ অন্যদিকে সরে গেছে। এই কৌশলটি কাজ করেছে। দেশের ভেতরে শীর্ষ নেতৃত্ব না থাকায় বিএনপি যেমন তৃণমূল কর্মীদের নিয়ন্ত্রণে সমস্যায় পড়েছে, তেমনি সংস্কার বিতর্কে আটকে গিয়ে মাঠের রাজনীতিতে পিছিয়ে পড়েছে। এই ফাঁকে জামায়াত নিঃশব্দে একটি শক্ত সংগঠিত গ্রাউন্ড ক্যাম্পেইন গড়ে তুলেছে।
এই পর্যায়ে এসে জামায়াতের কর্মীরা প্রায় সব ভোটারের কাছেই অন্তত একবার করে পৌঁছেছে। বিশেষ করে তারা নারীদের কাছে পৌঁছাতে ‘তালিম গ্রুপ’কে সক্রিয়ভাবে ব্যবহার করেছে। একই সঙ্গে তারা একটি খুব সহজ কিন্তু কার্যকর বার্তা দিয়েছে—ভোট দেওয়া ধর্মীয় দায়িত্বের অংশ। ভোটারদের বলা হয়েছে, তারা চাইলে সরাসরি জামায়াতকে ভোট না-ও দিতে পারে, কিন্তু অবশ্যই এমন কাউকে ভোট দিতে হবে যিনি ‘সৎ’ এবং ইসলামের পক্ষে কাজ করবেন; তা না হলে পরকালে জবাবদিহি করতে হবে। এই বার্তাটি কৌশলগতভাবে খুবই শক্ত ছিল এবং ব্যাপকভাবে প্রভাব ফেলেছে।
এটি প্রভাব ফেলেছে মূলত এজন্য যে এর বিপরীতে কোনো কার্যকর পাল্টা কৌশল ছিল না। অনেক ক্ষেত্রে বিএনপির কর্মীরা “অন্যান্য কাজে” ব্যস্ত ছিলেন। জামায়াত পরিস্থিতি ঠিকভাবে পড়তে পেরেছে। তারা জানত যে শহরের শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে তাদের অবস্থান তুলনামূলকভাবে শক্ত, কিন্তু গ্রামে দুর্বল। তাই তারা কৌশল বদলে গ্রামকেন্দ্রিক কাজ শুরু করেছে।
আমি আগস্ট–সেপ্টেম্বরে একটি সেমিনারে বলেছিলাম যে জরিপের তথ্য অনুযায়ী, বিএনপি শহরের তরুণদের মধ্যে সমর্থন হারাচ্ছে, তবে গ্রামে—বিশেষ করে মধ্যবয়স্ক ও বয়স্ক পুরুষ, কমশিক্ষিত বেকার যুবক এবং সামগ্রিকভাবে গ্রামীণ পুরুষ ভোটারদের মধ্যে—এখনও শক্ত অবস্থানে আছে। আমি তখন পরামর্শ দিয়েছিলাম যে বিএনপির উচিত ছিল দুর্বলতা ঢাকার কৌশল (W–T strategy) বাদ দিয়ে শক্তির জায়গাগুলো কাজে লাগানো (S–O strategy), অর্থাৎ গ্রামীণ ভিত্তিকে রক্ষা ও আরও শক্ত করা।
কিন্তু তা করা হয়নি। বিএনপি গ্রামীণ সমর্থন নিয়ে এতটাই আত্মবিশ্বাসী ছিল—এবং এখনও আছে—যে তারা সেটিকে প্রায় উপেক্ষা করেছে। ফলে বাস্তবে যা ঘটেছে, তা প্রায় পুরোপুরি জামায়াতের কৌশলের সঙ্গেই মিলে গেছে। এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আসে: জামায়াত যদি এত শক্ত অবস্থানে থাকে, তাহলে তারা কেন জোটে গেল এবং অনেক আসন ছেড়ে দিল?
এর পেছনে সম্ভবত দুটি কারণ রয়েছে।
প্রথমত, ১৮–১৯ ডিসেম্বরের ঘটনাগুলো অনেক শহুরে ভোটারকে আতঙ্কিত করেছে, যারা হয় জামায়াতকে ভোট দেওয়া, নয়তো ভোট না দেওয়ার কথা ভাবছিলেন। ‘দুই খারাপের মধ্যে ছোট খারাপ’ যুক্তি তারা তখন মানতে চাইছিলেন না। এখন তাদের মনোভাব কিছুটা বদলেছে। এর মানে এই নয় যে শহরের তরুণ বা মধ্যবিত্তদের মধ্যে জামায়াতের অবস্থান ভেঙে গেছে—তা নয়। তবে আগের মতো দ্রুত বাড়ছে না, বরং ধীরে ধীরে বিপরীত স্রোত দেখা যাচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, তারেক রহমানের ফিরে আসার প্রভাব গ্রামে খুবই স্পষ্ট। ঢাকায় বসবাসকারীদের কাছে এই ‘TR effect’ বোঝা কঠিন হতে পারে, কিন্তু গ্রামাঞ্চলে বিএনপির কর্মীরা নতুন করে চাঙ্গা হয়েছে। আগে যারা বিচ্ছিন্ন ও বিশৃঙ্খল ছিল, তারা এখন অনেকটাই দল হিসেবে কাজ করতে শুরু করেছে। এতে বিএনপির জন্য পাল্টা কৌশল নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
কিন্তু এখানেই বিষয়টি বিএনপির জন্য সবচেয়ে উদ্বেগজনক। এই নতুন গতি সত্ত্বেও বিএনপি তাদের গ্রামীণ শক্তিকে কাজে লাগিয়ে ভিত্তি মজবুত করার দিকে না গিয়ে শহরে আরও লাভের চেষ্টা করছে। এই কৌশল সফল হওয়ার সম্ভাবনা কম। শহরে যারা বিএনপির দিকে আসার ছিল, তারা অনেকেই ইতোমধ্যে চলে এসেছে। যারা আসেনি, তারা সম্ভবত আর আসবে না। শহরের আসনগুলো মোটামুটি স্থির হয়ে গেছে। এই পর্যায়ে শহরে ঘরে ঘরে প্রচারণা মূলত প্রার্থীদের ওপর ছেড়ে দেওয়াই যথেষ্ট।
আসল গুরুত্ব দেওয়া উচিত গ্রামে। সেখানে জামায়াত খুব পরিকল্পিতভাবে ঘরে ঘরে গিয়ে সহজ ভাষায় কথা বলছে, কিন্তু বিএনপির নেতাকর্মীরা তা করছে না।
সবচেয়ে বড় কথা, তারা নারীদের সঙ্গে যোগাযোগই করছে না। এর একটি কারণ হলো জামায়াতের ‘তালিম গ্রুপ’-এর মতো কোনো সংগঠন বিএনপির নেই। আরেকটি কারণ হলো এই ভুল ধারণা যে নারীদের ভোট পরিবারের পুরুষ সদস্যরাই “নিয়ন্ত্রণ” করতে পারেন।
তৃণমূল পর্যায়ে ব্যক্তিগত যোগাযোগের গুরুত্বও বিএনপি ঠিকভাবে বুঝতে পারছে না। তারা এখনও মিছিল ও বড় সমাবেশের ওপর ভরসা করছে। অথচ বাস্তবতা হলো—অনেক ভোটার বড় জমায়েতে যেতে চান না, কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে কথা বলা হলে সাড়া দেন। ভোটাররা চান কেউ তাদের কাছে আসুক, সরাসরি সমর্থন চাইুক, তাদের গুরুত্ব দিক। বিএনপি এই জায়গায় পুরোপুরি ব্যর্থ হচ্ছে। এটি চলতে থাকলে নির্বাচনের ফল দলটির প্রত্যাশার চেয়ে অনেক ভিন্ন হতে পারে।
জনপ্রিয় ধারণার বিপরীতে, জামায়াত গ্রামেও শক্তিশালী হচ্ছে। আওয়ামী লীগের ভোটাররা শেষ পর্যন্ত কী করবেন বা তারা ভোটকেন্দ্রে যেতে নিরাপদ বোধ করবেন কি না—তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে নারী ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে জামায়াত বর্তমানে এগিয়ে আছে। বিএনপি যদি জিততে চায়, তাহলে দ্রুত মাঠপর্যায়ের প্রচারণা নতুন করে সাজাতে হবে। গ্রামে অ্যাপ বা ডিজিটাল কৌশল কার্যকর হবে না; টানা ঘরে ঘরে প্রচারই একমাত্র উপায়।
বিএনপির হাতে দুটি বড় সম্পদ আছে, যেগুলো তারা ঠিকভাবে ব্যবহার করছে না। প্রথমটি তারেক রহমান—তাঁর উপস্থিতি গ্রামীণ ভোটারদের কাছে আরও দৃশ্যমান করা দরকার। দ্বিতীয়টি হলেন জুবাইদা রহমান ও জাইমা রহমান। তাঁরা নারীদের মধ্যে জামায়াতের প্রভাব মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, বিএনপি এখনো তাঁদের গ্রামীণ নারী ভোটারদের কাছে নিয়ে যাওয়ার কোনো কৌশল নেয়নি।
এবার গ্রামীণ নারী ভোটাররাই হয়তো নির্ধারক ভূমিকা রাখবে। যদি তাই হয়, তাহলে ১২ ফেব্রুয়ারি অনেকের জন্যই বড় চমক নিয়ে আসতে পারে।
সবশেষে, নির্বাচনী কৌশল নিয়ে এত আলোচনা ও “হইচই”-এর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রায় উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে—গণভোট বা রেফারেন্ডাম। আমি ক্রমেই আশঙ্কা করছি, এই রেফারেন্ডাম বাতিল হয়ে যেতে পারে। কারণ এখন পর্যন্ত কোনো বড় রাজনৈতিক দলই এটি নিয়ে জোরালো প্রচারণা চালাচ্ছে না, আর সাধারণ ভোটারদের বড় অংশই ঠিক বুঝতে পারছে না, বিষয়টি কেন গুরুত্বপূর্ণ।
এর পাশাপাশি, অন্তর্বর্তী সরকারের ‘আপার হাউস’, সাংবিধানিক কাঠামো ও নানা ধরনের বিমূর্ত সংস্কারমূলক আলোচনা অত্যন্ত এলিট বা অভিজাতকেন্দ্রিক। এসব বিষয় সাধারণ মানুষের ভাষায় বোঝানো হচ্ছে না। এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে, আমরা হয়তো আরেকটি অপ্রত্যাশিত ফলাফলের দিকে এগোচ্ছি।