চট্টগ্রামের বাসিন্দা সুমি আক্তার ব্লাড ক্যানসারের চতুর্থ স্টেজের রোগী। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার পরও তিনি ফেসবুকে বিজ্ঞাপন দেখে রাজধানীর পল্টনে অবস্থিত গণস্বাস্থ্য হোমিওতে চিকিৎসা নিতে আসেন। চার মাসে ক্যানসার ভালো হয়ে যাবে—এ নিশ্চয়তা পেয়ে প্রথম মাসে ৪০ হাজার টাকার ওষুধ নিয়ে তিনি চিকিৎসা শুরু করেন। তাকে ব্যবস্থাপত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান এস এম সরওয়ার ১৩০টি ওষুধ দেন। প্রতি দুই মিনিট পর পর এক ফোঁটা করে সব ওষুধ একবার খেতে হবে। এভাবে ঘুমানোর আগ পর্যন্ত চলবে। ঘুম থেকে উঠে আবার এ নিয়মে ওষুধ চলবে। দুই মাস নিয়মিত ওষুধ খাওয়ার পর তার পরিস্থিতি আরও অবনতি হওয়ায় তিনি চিকিৎসা বন্ধ করে দেন।
কথা হয় সুমি আক্তারের স্বামী আক্তার হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘ইউটিউবের বিজ্ঞাপনের প্রলোভনে পড়ে গণস্বাস্থ্য হোমিওতে আসি। পরবর্তী সময়ে খোঁজ নিয়ে জানতে পারি, ক্যানসার চিকিৎসার নামে ভয়ংকর প্রতারণার স্বীকার হয়েছি।’ শুধু সুমি আক্তারই নন, ক্যানসারসহ জটিল রোগে আক্রান্ত হাজার হাজার ব্যক্তি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুখরোচক বিজ্ঞাপনে প্রভাবিত হয়ে গণস্বাস্থ্য হোমিতেও এসে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। খোদ হোমিও চিকিৎসকরাই বলছেন, এস এম সরওয়ারের চিকিৎসাপদ্ধতি পুরোটাই নজিরবিহীন প্রতারণা।
জানা যায়, গণস্বাস্থ্য হোমিওর দুটি কার্যালয় আছে। শনি থেকে সোমবার রোগী দেখা হয় রাজধানীর পল্টনের বায়তুল ভিউ টাওয়ারের ১১ তলায়। মঙ্গল থেকে বৃহস্পতিবার রোগী দেখা হয় হবিগঞ্জের পৌর বাস টার্মিনাল এলাকায়। সম্প্রতি ঢাকা কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, শত শত রোগী ভিড় করছেন। এর মধ্যে ক্যানসারের বিভিন্ন পর্যায়ের রোগীই বেশি। অন্তত ২০ জন রোগীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা ফেসবুক-ইউটিউব বিজ্ঞাপন দেখে দেশের দূরদূরান্ত এলাকা থেকে এসেছেন। আর ১০ জন ক্যানসার রোগী জানিয়েছেন, তারা বিভিন্ন হাসপাতালে গণস্বাস্থ্যের প্রতিনিধিদের মাধ্যমে এখানে এসেছেন চিকিৎসা নিতে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এস এম সরওয়ার এসএসসি পাস করার পর হোমিওপ্যাথির ওপর চার বছরের ডিপ্লোমা করে বনে যান এশিয়ার সবচেয়ে সফল ক্যানসার গবেষক। ইউটিউবে বাংলা ইংরেজি বিভিন্ন নাম দিয়ে অন্তত ৩০০ অ্যাকাউন্ট খুলে তিনি ক্যানসার চিকিৎসার সাফল্যের ভিডিও বিজ্ঞাপন আকারে প্রচার করছেন। এসব কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছেন অন্তত ৪০ জন ডাক্তার, ৬০ জন বিজ্ঞাপন প্রতিনিধি এবং ১০০ জনের বেশি এজেন্ট বা দালাল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের নামে রয়েছে আলাদা আলাদা অ্যাকাউন্ট। এসব অ্যাকাউন্টে ক্যানসার থেকে পূর্ণ সুস্থ হয়েছেন এমন রোগীদের ভিডিও পোস্ট করা হয়। প্রতিটি ভিডিও ভুয়া রোগীদের দ্বারা তৈরি। মূলত অর্থের বিনিময়ে এসব ভিডিও করা হয়েছে।
গণস্বাস্থ্য হোমিওর অন্তত পাঁচজন ডাক্তার জানিয়েছেন, ‘বিজ্ঞাপনে প্রভাবিত হয়ে এখানে প্রতিদিন শত শত রোগী আসেন। কিন্তু এখানের দেওয়া চিকিৎসাপদ্ধতি হোমিও নীতির বিপরীত। এখানে হোমিও, আয়ুর্বেদিক, হামদর্দ সব ধরনের ওষুধ বিক্রি করা হয়, যা হোমিও নীতিবিরুদ্ধ।’
সরকারি হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সাবেক প্রিন্সিপাল এবং মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. শফিকুল আলম বলেন, ‘হোমিও চিকিৎসার নিয়ম হলো সিঙ্গেল মেডিসিন দিয়ে চিকিৎসা করা। হোমিও ডাক্তার অন্য কোনো চিকিৎসা পদ্ধতির ওষুধও বিক্রি করতে পারবেন না।’
১৩০টি ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা করার পদ্ধতি অপহোমিও বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথিক পরিষদের সভাপতি ডা. শেখ ফারুক এলাহী। তিনি লন্ডনের ফ্যাকাল্টি অব হোমিওপ্যাথি থেকে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন শেষে ওই প্রতিষ্ঠানের সহযোগী সদস্যপদ লাভ করেন। তিনি বলেন, ‘ক্যানসারের আর্লি স্টেজে হোমিওপ্যাথির চিকিৎসায় সুফল পাওয়া যায়। কিন্তু শেষ স্টেজে চলে গেলে ক্যানসার আর ভালো হয় না।’
বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের প্রিন্সিপাল কাম সুপারিনটেনডেন্ট অধ্যাপক ডা. মো. নাসির উদ্দিন শেখ কালবেলাকে বলেন, ‘ক্যানসার, থ্যালাসেমিয়া বা এইডস পুরোপুরি নির্মূলের দাবি করা হোমিওর নামে সুস্পষ্ট প্রতারণা মনে করি। হোমিওপ্যাথিতে শেষ ক্যানসার সম্পূর্ণ নিরাময় হয় না। যদি সত্যিই নিরাময় হতো, তাহলে তো ক্যানসার বিশেষায়িত সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলো রোগীর অভাবে বন্ধ হয়ে যেত।’
হোমিও নীতিবিরুদ্ধ ব্যবস্থাপত্র দিয়ে চিকিৎসা এবং নিজেকে বেআইনিভাবে গবেষক দাবি করার বিষয়ে জানতে চাইলে গণস্বাস্থ্য হোমিওর চেয়ারম্যান এস এম সরওয়ার উত্তেজিত হয়ে বলেন, ‘আমাকে কিছু বললে হোমিও কাউন্সিল ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলবে। আপনি প্রশ্ন করার কে?’
বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা শিক্ষা কাউন্সিলের রেজিস্ট্রার ডা. মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘একের অধিক ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা করানো এবং নিজেকে বিশেষজ্ঞ বা গবেষক দাবি করা হোমিও আইন অনুযায়ী বেআইনি ও প্রতারণা। আমরা এ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেব।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. আবু জাফর কালবেলাকে বলেন, ‘এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে আমি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।’