ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে ৪৪ বছর বয়সী এক বিধবা হিন্দু নারীকে ধর্ষণ ও গাছে বেঁধে মাথার চুল কেটে নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ঘটনার একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। এ ঘটনায় ৫ জানুয়ারি বিকালে ভুক্তভোগী বাদী হয়ে কালীগঞ্জ থানায় মামলা করেন। যেখানে আসামি করা হয় চার জনকে। ইতিমধ্যে পুলিশ অভিযান চালিয়ে এক আসামিকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠিয়েছে। বাকিদের গ্রেফতারের চেষ্টা চালাচ্ছে।
তবে ওই নারীকে ধর্ষণ ও নির্যাতন নিয়ে এলাকাবাসী বলছে ভিন্ন কথা। তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে তিনি ‘অসামাজিক’ কাজে লিপ্ত। তাকে ‘হাতেনাতে’ ধরে প্রতিবেশী ও এলাকাবাসী ঘটনাটি ঘটিয়েছেন।
তাদের এই কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কারও বিরুদ্ধে যে অভিযোগ থাকুক না কেন, প্রতিবেশী বা এলাকাবাসী তাকে শাস্তির আওতায় নিতে পারে কিনা। ভিডিও প্রকাশ করে ভুক্তভোগীকে অনিরাপদ করে তোলার কোনও সুযোগ আইনে আছে কিনা। এ ব্যাপারে নারী অধিকারকর্মীরা বলছেন, ‘অসামাজিক কাজ’ বিষয়টির ব্যাখ্যা কে দেবে। এর বিপরীতে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সুযোগ কারও নেই। তারা যা করেছে, তা অপরাধ এবং এর বিচার হতে হবে।
ঘটনা যদি সত্যও হয়ে থাকে তাহলেও আইন হাতে তুলে নেওয়ার কোনও সুযোগ নেই উল্লেখ করে আইনজীবীরা বলছেন, পেনাল কোড-৪৯৭ অনুযায়ী, যদি কোনও স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক বিষয়ে মামলা করতে হয়, তবে সেই ব্যক্তির বিরুদ্ধে স্বামী অভিযোগ আনতে পারে। উৎসাহী হয়ে ধর্মীয় কারণকে পুঁজি করে মব তৈরি করে যা করছে, এটা না আমাদের ধর্ম সমর্থন করে, না আইন সমর্থন করে।
গত ৩১ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় ঘটনাটি ঘটেছিল। আর ৫ জানুয়ারি থানায় ধর্ষণ মামলা করেন ভুক্তভোগী। ওই মামলায় গ্রেফতার হাসান (৪৫) কালীগঞ্জ পৌরসভার বাসিন্দা। ভুক্তভোগী নারী তার ১০ বছর বয়সী ছেলেকে নিয়ে ওই এলাকার নিজ বাড়িতে বসবাস করতেন। আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। পরে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরেন।
ঘটনার সূত্রপাত যেভাবে
নারী নির্যাতনের ঘটনাটি ৩১ ডিসেম্বরের হলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে একদিন পরে। ভারতীয় গণমাধ্যম এটিকে হিন্দু নারী নির্যাতন হিসেবে প্রতিবেদন করলে সেটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এরপর নির্যাতনের ঘটনা যতটা না আলোচনার কেন্দ্রে আসে তার চেয়ে বেশি শোনা যেতে থাকে এলাকাবাসীর চোখে সেই নারী আসলে কেমন, তার জীবনযাপন কেমন। এমনকি ধর্ষণের কোনও মেডিক্যাল রিপোর্ট না দেখেই তারা বলতে থাকেন, ধর্ষণের অভিযোগ মিথ্যা।
এমনকি নির্যাতনের শিকার নারীর ‘অসামাজিক কার্যকলাপ’ বন্ধের দাবিতে গত ৬ জানুয়ারি সকালে শহরের বাসস্ট্যান্ড এলাকায় মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়। এ সময় পুলিশ এসে মানববন্ধনের ব্যানার কেড়ে নেয়। পরে মানববন্ধন পণ্ড হয়ে যায়। তখন পুলিশ বলেছিল, মানববন্ধন করলে নির্বাচনি পরিবেশ বাধাগ্রস্ত হবে। এজন্য করতে দেয়নি।
কী বলছেন ভুক্তভোগী নারী
ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দুই বছর আগে ওই গ্রামের শাহীনুর রহমান শাহীন নামে এক ব্যক্তির ভাইয়ের কাছ থেকে জমিসহ বাড়ি কিনে সন্তানসহ বসবাস শুরু করেন। গত ৩১ ডিসেম্বর সন্ধ্যার পর তার বাড়িতে দুই পুরুষ আত্মীয় আসেন। এ সময় তাদের দেখার নামে শাহীন ও হাসান তার বাড়িতে প্রবেশ করেন। তারা দুই আত্মীয়কে একটি কক্ষে আটকে রেখে নারীকে আরেকটি কক্ষে নিয়ে ধর্ষণ করেন। পরে ওই নারী ও আত্মীয় দুজনকে বাড়ির বাইরে নিয়ে ‘কুকর্মের’ অভিযোগ এনে একটি গাছের সঙ্গে বেঁধে রেখে ভিডিও ধারণ করেন। এ সময় ওই নারীর চুল কেটে মারধর করেন শাহীন ও হাসান। সে সময় তারা ভিডিও মোবাইলে ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেন।
ভুক্তভোগী বলেন, ‘হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরলেও আমি এখনও খুব অসুস্থ। ঠিকমতো কথা বলতে পারছি না। এ ঘটনায় থানায় মামলা করেছি। পুলিশ হাসানকে গ্রেফতার করেছে, শাহীন এখনও গ্রেফতার হয়নি।’
যা বলছেন চিকিৎসক
ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালের চিকিৎসক ও ভর্তি রেজিস্ট্রার খাতা সূত্রে জানা গেছে, ভুক্তভোগী নারী গত ১ জানুয়ারি ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে ভর্তি হন। পরে কাউকে কিছু না জানিয়ে ওই দিনই চলে যান। এরপর ৬ জানুয়ারি দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে আবারও হাসপাতালের গাইনি বিভাগে ভর্তি হন। ওই সময় কালীগঞ্জ থানার একাধিক পুলিশ সদস্য ভুক্তভোগী নারীর সঙ্গে ছিলেন। পরে ধর্ষণের নমুনা প্রদান ও শারীরিক পরীক্ষা শেষে পুলিশসহ হাসপাতাল থেকে চলে যান তিনি।
ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘কালীগঞ্জের ওই নারী ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। এখনও মেডিক্যাল রিপোর্ট আসেনি। রিপোর্ট তৈরি হলে আমরা থানায় পাঠিয়ে দেবো।’
চার জনের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেফতার একজন
কালীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জেল্লাল হোসেন বলেন, ‘৫ জানুয়ারি বিকালে ওই নারী থানায় চার জনের বিরুদ্ধে এজাহার জমা দিলে মামলা রেকর্ড করা হয়। ইতিমধ্যে এক আসামিকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। প্রধান আসামিসহ বাকিদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে।’
যা বলছেন নারী অধিকারকর্মীরা
নারী অধিকারকর্মী জিনাত আরা হক বলেন, ‘এভাবে চাইলেই আপনি কাউকে হেনস্তা করতে পারেন না। এটার আইনগত ভিত্তি নেই। মেয়েটিকে যে হেনস্তা করা হচ্ছে, তার ক্ষতিপূরণ কে দেবে? মেয়েটি ধর্ষণের মামলা করেছেন। এখন ধর্ষণ হয়েছে না হয়নি সেটি আদালতে প্রমাণ হবে। এটা নিয়ে এলাকাবাসী মিডিয়ায় বক্তব্য দেওয়া বা মানববন্ধনের ব্যবস্থা করা কোনোটাই কি করতে পারে? এখনকার দিনে মিডিয়ার এরকম অসংবেদনশীল আচরণ একেবারেই গ্রহণযোগ্য না।’
কোন কাজ অসামাজিক বা অসামাজিক না তা নির্ধারণ করবে কে উল্লেখ করে নিজেরা করির সমন্বয়ক খুশি কবীর বলেন, ‘আমাদের সমাজে একাধিক ধরনের মানুষ বসবাস করে। যারা কোনও নারীকে বড়িশেমিং করে, ওড়না নেই বা টিপ পরা নারীকে হেনস্তা করে। তারাও তো কাজটি অসামাজিকই করছে। ফলে অসামাজিক কাজ জিনিসটা আমি বুঝি না।’
তিনি আরও বলেন, ‘ঝিনাইদহে যে ঘটনা ঘটেছে সেটা আইনের লঙ্ঘন। কারোর কোনও বিষয়ে আপনার আপত্তি থাকলে আপনি আইনের আশ্রয় নেবেন। এভাবে তার চুল কেটে দিয়ে মারধরের ভিডিও ধারণ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার পরে সেই ব্যক্তির মানহানি ঘটলো, সেই দায় কে নেবে।’
এটিকে সামাজিক ব্যাধি বলে উল্লেখ করেছেন মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) সভাপতি ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘অনেক আগে একটা সময় ছিল যখন এসব অনাচার চলতো। এখন সমাজ ও আইন ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন এসেছে। কারও বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ থাকলে ফৌজদারি আইনে ব্যবস্থা নেওয়া যায়। আগেও এমন অনেককে অন্যায়ভাবে নির্যাতন করা হয়েছে। পরে তাদের বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছে। তবে, এখন দেশের অবস্থা অন্যরকম, সবকিছু এলোমেলো চলছে। যাকে তাকে ধরছে-মারছে। সামাজিক দুর্বলতা কাজ করছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ঠিকমতো কাজ করছে না। এখন যারা বিচারের ভার নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। নয়তো এটি সামাজিক ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়বে।’