Image description

দেশে এলপি গ্যাসের তীব্র সংকট শিগগির অবসানের কোনো আভাস নেই । জ্বালানি মন্ত্রণালয় পর্যাপ্ত মজুতের কথা বললেও এলপি গ্যাস আমদানিকারকেরা বলছেন ভিন্ন কথা । তাঁরা বলছেন , সরবরাহ সংকটই এই অবস্থার কারণ । এলপিজি সংকটের মধ্যে পাইপলাইনে গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় মানুষের ভোগান্তি আরও বেড়েছে । সুযোগ বুঝে বেড়েছে বৈদ্যুতিক চুলা ও রাইস কুকারের দাম । এলপিজি সরবরাহে সংকটের চাপ পড়েছে পরিবহন খাতেও । এদিকে এলপি গ্যাসের সরবরাহ ঠিক করতে সরকার কোম্পানিগুলোর আমদানির কোটা বাড়ানোসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে ।

তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন , এলসি ( ঋণপত্র ) খোলার পর এলপি গ্যাস দেশে আসতে কমপক্ষে ১৯ থেকে ৪৩ দিন লাগবে । এলপি গ্যাস সংকটের সমাধান কবে নাগাদ হতে পারে , জানতে চাইলে অন্তর্বর্তী সরকারের জ্বালানি উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান গতকাল শনিবার বলেন, আজকের পত্রিকাকে ‘ এলপিজির ৯৮ শতাংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে । সরকারের কাছে মাত্র ২ শতাংশ । সংকটের কারণগুলো আমরা কয়েক দিন ধরে ব্যাখ্যা করছি । তারা ধর্মঘট করেছিল । এখন প্রত্যাহার করেছে । আশা করি ঠিক হয়ে যাবে । '

এলপিজির সরবরাহ সংকটের কারণে এক মাস ধরে ভোগান্তিতে পড়েছেন গ্রাহকেরা । রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে দ্বিগুণ দামে বিক্রি হচ্ছে এলপিজির সিলিন্ডার । কোথাও কোথাও বাড়তি দামেও পাওয়া যাচ্ছে না । দেশে শীতকালে এলপি গ্যাসের চাহিদা প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার টন । গত ডিসেম্বরে সব মিলিয়ে আমদানি হয়েছে ১ লাখ ২৭ হাজার টন । এরপরও সংকট কমেনি । পাড়ামহল্লার বেশির ভাগ এলপি গ্যাস সিলিন্ডারের দোকান বন্ধ রয়েছে ।

ভোক্তা ও এলপি গ্যাস খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন , ডিসেম্বরের মাঝামাঝি থেকে বাজারে এলপি গ্যাসের সরবরাহে ঘাটতি দেখা দেয় । দিনে দিনে এ সংকট তীব্র হয় । এর সুযোগ লুফে নেন অসাধু ব্যবসায়ীরা । লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়াতে থাকেন দাম । তবে এ সংকট নিরসনে শুরুতে কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি । জ্বালানি মন্ত্রণালয় দেশে পর্যাপ্ত এলপি গ্যাসের মজুত থাকার দাবি করলেও ব্যবসায়ী ও সরবরাহকারীরা এর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন । ৪ জানুয়ারি এলপিজির বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছিল মন্ত্রণালয় । তবে এক সপ্তাহ পরও জোরালো কোনো ব্যবস্থা দেখা যায়নি । সংকটে গ্রাহকদের ভোগান্তি এখন চরমে পৌঁছেছে ।

মগবাজারের বাসিন্দা রতন মল্লিক বলেন , আগে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সকালে কিছুক্ষণের জন্য পাইপলাইনে গ্যাস পাওয়া যেত । কিন্তু এক সপ্তাহ ধরে বাসায় লাইনের গ্যাস নেই বললেই চলে । বাধ্য হয়ে পাশের এলাকায় এক আত্মীয়ের বাসা থেকে রান্না করে আনছেন । বাজারে প্রতিটি ইলেকট্রিক চুলা , রাইস কুকারের দাম ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা বেড়ে গেছে । মানিকদী বাজারের সবজি বিক্রেতা শফিকুল আলম বলেন , গ্যাস সংকটের কারণে মানুষ রান্না কমিয়ে দেওয়ায় কয়েক দিন ধরে সবজি বিক্রিও খুব কম হচ্ছে ।

অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা শফিকুল আলম গতকাল নিজের ফেসবুকে লিখেছেন , “ গ্যাস সংকট । বাসার ছাদবাগানের এক কোণে রান্নার কাজ চলছে লাকড়ি দিয়ে ইটের চুলায় । ' ছাদে রান্না করার চারটি ছবিও দিয়েছেন তিনি । একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা শ্যামল সরকার বলেন , গ্যাসের সংকট কৃত্রিম । কারণ দ্বিগুণ দাম দিলে প্রতিটি দোকানেই গ্যাস সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে ।

ময়মনসিংহ শহরের চরপাড়ার বাসিন্দা মারুফ হাসান ইমন বলেন , ডিসেম্বরের মাঝামাঝিতে ১২ কেজি ওজনের একটি সিলিন্ডার ১ হাজার ৮০০ টাকায় পাওয়া গেছে । যদিও সরকারনির্ধারিত মূল্য ছিল ১ হাজার ২৫৩ টাকা । জানুয়ারির শুরুতে শহরের কোথাও এলপিজি সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না । বাধ্য হয়ে বৈদ্যুতিক চুলায় রান্না করতে হচ্ছে । পরিবহন খাতেও সংকট এলপিজির কারণে পরিবহন খাতও সংকটে পড়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ এলপিজি অটো গ্যাস স্টেশন , অ্যান্ড কনভারশন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার মো . সিরাজুল মাওলা ।

গতকাল ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন , দেশে প্রায় এক হাজার এলপিজি অটো গ্যাস স্টেশন রয়েছে । এর ওপর ভিত্তি করে প্রায় দেড় লাখ যানবাহন এলপিজিতে রূপান্তর করা হয়েছে । কিন্তু বর্তমানে তীব্র এলপিজি সংকটের কারণে প্রায় সব অটো গ্যাস স্টেশন কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে । এতে স্টেশন মালিকদের পাশাপাশি এলপিজিচালিত যানবাহনের মালিক ও চালকেরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন । খোঁজ নিয়ে জানা যায় , এলপিজিতে চলা যানগুলোর বেশির ভাগ এখন জ্বালানি তেলে চলছে । যানবাহনে মাসে এলপিজির চাহিদা ১৫ হাজার টন ।

সরবরাহ সংকটকে কারণ বলছে কোম্পানিগুলো জ্বালানি মন্ত্রণালয় বলেছে , দেশে এলপিজির পর্যাপ্ত মজুত আছে । স্থানীয় খুচরা বিক্রেতারা বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করেছেন । যদিও বিশ্ববাজারে মূল্যবৃদ্ধি এবং জাহাজ সংকট ও কিছু কিছু কার্গোর ( জাহাজ ) ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করায় আমদানি পর্যায়েও কিছু সংকটের উদ্ভব হয়েছে ।

মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী , গত নভেম্বরে এলপিজির আমদানির পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৫ হাজার টন । ডিসেম্বরে বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ২৭ হাজার টন । তবে সরকারি এই হিসাবের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন এলপিজি আমদানির সঙ্গে যুক্ত একাধিক ব্যবসায়ী । দেশে ২৮ টি এলপিজি কোম্পানির মধ্যে ২৩ টির আমদানির অনুমোদন রয়েছে । কোম্পানিগুলোর আমদানির ঊর্ধ্বসীমা রয়েছে । সূত্র বলেছে , কয়েকটি কোম্পানি দীর্ঘদিন ধরে আমদানি সীমা বাড়ানোর দাবি জানালেও অনুমোদন পাচ্ছিল না । তবে গত বৃহস্পতিবার জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে ঊর্ধ্বসীমা বৃদ্ধি ও এলপিজিকে গ্রিন পণ্য হিসেবে বিবেচনাসহ বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে । সংকটের কারণ জানতে চাইলে ওমেরা এলপিজির পরিচালক আজম জে . চৌধুরী বলেন , সরবরাহ সংকটই এর অন্যতম কারণ হতে পারে । প্রকৃত অর্থে সংকট না থাকলে এভাবে দাম বাড়িয়ে দ্বিগুণ করা কিংবা বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা কঠিন । কারণ বাজারে এক ডজনের বেশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এলপিজি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত । তিনি বলেন , তাঁর ধারণা সাম্প্রতিক সময়ে কিছু এলসি পণ্য দেশে আসেনি । সরবরাহ কমে গেলে নানা ধরনের অসাধু ব্যবসা শুরু হয় । এ খাতে সরকারের ব্যবস্থাপনাটাও বেশ দুর্বল , বলতে হবে । না হলে এত লম্বা সময় সংকট থাকে কী করে ? সংকটের সুযোগে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী লাভবান হচ্ছেন । 

এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের ( এলওএবি ) সভাপতি ও ডেলটা এলপিজি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন , “ সাপ্লাই চেইন বাধাগ্রস্ত হয়েছে বলেই এমনটি হয়েছে । এটি তো স্বীকার করতেই হবে । আমরা সরকারকে বিষয়টি অবগত করেছিলাম । সরকার যদি বলে সরবরাহে সংকট নেই , তাহলে সেখানে আমাদের কিছু বলার নেই । তবে বাস্তব চিত্র সবার জানা , আমি কিছু বলতে চাই না । ' সংকট যে শিগগির কাটছে না তার আভাস পাওয়া গেল আমিরুল হকের কথায় । তিনি বলেন , বৃহস্পতিবার সরকার অনেক পদক্ষেপ নিয়েছে । পাঁচটি কোম্পানির আমদানি কোটা বাড়িয়েছে । এলপিজিকে গ্রিন পণ্য হিসেবে বিবেচনার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংককে চিঠি দিয়েছে ।

আগামীকাল সোমবার থেকে সবাই চেষ্টা করবে নতুন করে আমদানি করার । তিনি বলেন , এলসি চালু হওয়ার পর পণ্য যদি জাহাজে লোড হয় তারপর দেশে আসতে ৩৪ থেকে ৪৩ দিন লাগবে ( আর্জেন্টিনা ও ইউএসএর ক্ষেত্রে ) । সৌদি আরব কিংবা কাতার থেকে আনা হলে ১৯ দিন লাগবে । জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার গতকাল এক বিবৃতিতে বলেন , দেশে এলপি গ্যাসের পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও একটি স্বার্থান্বেষী মহল পরিকল্পিতভাবে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে সাধারণ জনগণকে দুর্ভোগে ফেলছে । এ ধরনের অমানবিক ও জনস্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় ।