‘ক্যারিয়ার রাজনীতিকদের’ অনেকটা কোণঠাসা করে জাতীয় সংসদে ব্যবসায়ীদের উপস্থিতি বেশ কিছুদিন ধরেই বেড়ে চলেছে। একাধিক চরম বিতর্কিত ভোটের পর হতে যাওয়া বহুল প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরও এ চিত্র বহাল থাকতে পারে। কারণ এবারের প্রার্থী তালিকায়ও পেশাজীবীদের মধ্যে ব্যবসায়ীদের জয়জয়কার। যাচাই-বাছাইয়ে বৈধ হওয়া প্রার্থীদের ৪৪ শতাংশের বেশি ব্যবসায়ী।
ব্যবসায়ীদের পর পেশাজীবীদের মধ্যে বেশি প্রার্থী হওয়ার তালিকায় রয়েছেন শিক্ষকেরা। এর বাইরে আছেন আইনজীবী, কৃষিজীবী, চিকিৎসক, সাবেক সরকরি কর্মচারী ও পরামর্শক।
সংসদ নির্বাচনের ৩০০ আসনের জন্য মোট ৩ হাজার ৪০৬টি মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছিলেন প্রার্থীরা। শেষ পর্যন্ত জমা পড়ে ২ হাজার ৫৬৮টি মনোনয়নপত্র। এর মধ্যে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ ৫১টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের ২ হাজার ৯০ এবং স্বতন্ত্র ৪৭৮ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করেন। যাচাই-বাছাই শেষে ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত ১ হাজার ৮৪২টি মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেন রিটার্নিং কর্মকর্তারা। তবে আপিলের পর কিছুসংখ্যক প্রার্থী বৈধতা ফিরে পাওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছেন।
৪ জানুয়ারি পর্যন্ত বৈধ ঘোষিত প্রার্থীদের হলফনামা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এর মধ্যে ব্যবসায়ী রয়েছেন ৮১৪ জন। অর্থাৎ বৈধ ঘোষিত প্রার্থীদের প্রায় অর্ধেক। আবার এ ব্যবসায়ী প্রার্থীদের সবচেয়ে বেশি, ১৯৪ জনই বিএনপির। অর্থাৎ প্রায় এক-চতুর্থাংশ। বিএনপির পর সর্বোচ্চ ব্যবসায়ী প্রার্থী রয়েছেন ইসলামী আন্দোলনের, ৯৬ জন। এরপর জাতীয় পার্টির ৮৯, জামায়াতের ৭৭, গণঅধিকার পরিষদের ৪২, খেলাফত মজলিসের ২৬, এনসিপির ১৬, এবি পার্টির ৮ ও খেলাফত আন্দোলনের ৩ জন ব্যবসায়ী প্রার্থী রয়েছেন।
রাজনৈতিক দলগুলোর তরফ থেকে সংসদ নির্বাচনের প্রার্থী মনোনয়নে ব্যবসায়ীদের এত অগ্রাধিকার দেওয়াকে ভালো ইঙ্গিত বলে মনে করছেন না বিশ্লেষকেরা। তাঁরা বলছেন, স্বার্থের জায়গা থেকে ব্যবসায়ী এবং রাজনীতিকেরা একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে গেছেন।
ক্ষমতার সঙ্গে জাদুর কাঠি যুক্ত আছে। সংসদ সদস্য হওয়াকে এখন অনেকে বিনিয়োগ মনে করেন, যাতে অনেক মুনাফা পাওয়া যায়। ব্যবসায়ীদের বেশি প্রার্থী হওয়া সেটারই প্রতিফলন। বদিউল আলম মজুমদার সম্পাদক, সুজন
ক্ষমতায় যেতে রাজনীতিকদের যেমন ব্যবসায়ীদের সহায়তা দরকার হয়, একইভাবে ব্যবসায়ীরাও সুযোগ চান। নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নে ক্রমেই বেশি করে এই ‘বিনিময় প্রথার’ বাস্তব রূপ দেখা যাচ্ছে।
প্রার্থীদের হলফনামা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ১ হাজার ৮৪২ জন বৈধ প্রার্থীর মধ্যে রাজনীতিই ‘একমাত্র পেশা’, এমন ব্যক্তি প্রার্থী হয়েছেন হাতে গোনা কয়েকজন। রাজনীতি ছাড়া আর কিছু করেন না, এমন প্রার্থী হয়েছেন মোট ২৬ জন। তাঁদের মধ্যে বিএনপির ৪, জামায়াতের ৩ এবং জাতীয় পার্টির মাত্র ১ জন। বাকিদের মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছেন ২ এবং ১৬ জন অন্যান্য দলের। এনসিপি, গণঅধিকার পরিষদ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, এবি পার্টি এবং খেলাফত আন্দোলনের একজন প্রার্থীও নেই, যাঁর একমাত্র পেশা রাজনীতি।
প্রার্থীদের পেশায় ব্যবসায়ীর পরপরই তালিকায় রয়েছেন শিক্ষকেরা। এই শ্রেণির ২৪৪ প্রার্থীর মধ্যে ৮০ জনই জামায়াতের। ইসলামী আন্দোলন থেকে ৭২ ও খেলাফত মজলিস থেকে ২৩ জন পেশাদার শিক্ষক প্রার্থী হয়েছেন। বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও এবি পার্টি থেকে এই পেশার প্রার্থী হয়েছেন ৪ জন করে। এনসিপি ও খেলাফত আন্দোলনের ৩ জন করে প্রার্থী শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত।
ব্যবসায়ী ও শিক্ষকদের পর প্রার্থীদের তালিকার সংখ্যায় এগিয়ে রয়েছেন আইনজীবীরা। এই শ্রেণির ২০৮ প্রার্থীর ৩৫ জন জামায়াতে ইসলামীর। এরপর পর্যায়ক্রমে বিএনপি থেকে ২৫, জাতীয় পার্টি থেকে ২৩, স্বতন্ত্র থেকে ১২, ইসলামী আন্দোলন থেকে ১১, এবি পার্টি থেকে ১০ এবং গণঅধিকার পরিষদ থেকে ৯ জন আইনজীবী প্রার্থী হয়েছেন।
মোট ৯৭ জন কৃষিজীবী প্রার্থীর মধ্যে জামায়াতের ভাগে আছে সবচেয়ে বেশি ১২ জন। এই শ্রেণিতে জামায়াতের পরই অবস্থান বিএনপি ও জাতীয় পার্টির। দল দুটি থেকে ১১ জন করে কৃষিজীবী প্রার্থী হয়েছেন। চিকিৎসকের হিসাবেও এগিয়ে রয়েছে জামায়াত। মোট ৪৮ জন চিকিৎসক প্রার্থীর মধ্যে জামায়াত থেকে আছেন ১৩ জন। এরপর রয়েছে বিএনপি। এই দল থেকে ১০ জন চিকিৎসক প্রার্থী হয়েছেন। এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলন থেকে ৩ জন চিকিৎসক প্রার্থী হয়েছেন।
সাবেক সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে প্রার্থী হয়েছেন ২১ জন। এই শ্রেণিতে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক প্রার্থী বিএনপির, ৫ জন। এরপর রয়েছে জামায়াতে ইসলামীর ৩ জন।
প্রার্থীদের মধ্যে ১৩ জন আছেন পরামর্শক পেশায় যুক্ত। এই শ্রেণিতে এনসিপির প্রার্থী সবচেয়ে বেশি (৩ জন)। এ ছাড়া জামায়াতের ২, বিএনপির ১, গণঅধিকার পরিষদের ১, ইসলামী আন্দোলনের ১ ও এবি পার্টির ১ জন প্রার্থী রয়েছেন পরামর্শক পেশায়।
ওপরের আট শ্রেণির বাইরেও রাজনীতি ও ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ৯, কৃষি ও অন্যান্য পেশার ৬, ব্যবসা ও অন্যান্য পেশার ১১, ব্যবসা ও আইন পেশার ৪, ব্যবসা ও কৃষি পেশার ৩৫, রাজনীতি ও অন্যান্য পেশার ১, ব্যবসা ও শিক্ষকতা পেশার ২০, ব্যবসা, কৃষি ও পরামর্শক পেশার ১, ব্যবসা ও সাবেক সরকারি কর্মচারী ১, শিক্ষকতা, চিকিৎসক ও অন্যান্য পেশার ১, আইনজীবী ও অন্যান্য পেশার ১, ব্যবসা ও পরামর্শক পেশার ২, শিক্ষকতা ও কৃষি পেশার ৪, শিক্ষকতা ও অন্যান্য পেশার ৭, ব্যবসা ও চিকিৎসা পেশার ৩, কৃষি ও সাবেক সরকারি কর্মচারী ১, ব্যবসা, কৃষি ও অন্যান্য পেশার ১, রাজনীতি, ব্যবসা, শিক্ষকতা ও আইনজীবী পেশার ১ জন প্রার্থী হয়েছেন। আরও ২৫৮ জন প্রার্থী গৃহশিক্ষকতা, বেসরকারি চাকরিসহ অন্যান্য কিছু পেশার সঙ্গে সম্পৃক্ত। এর মধ্যে পেশা হিসেবে গৃহিণী উল্লেখ করা কয়েকজনও রয়েছেন।
নির্বাচনে প্রার্থিতার সঙ্গে ব্যবসায় যুক্তদের এই প্রাধান্যের বিষয়ে জানতে চাইলে সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘ক্ষমতার সঙ্গে যাদুর কাঠি যুক্ত আছে। সংসদ সদস্য হওয়াকে এখন অনেকে বিনিয়োগ মনে করেন, যাতে অনেক মুনাফা পাওয়া যায়। ব্যবসায়ীদের বেশি প্রার্থী হওয়া সেটারই প্রতিফলন।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বললেন, ‘ক্ষমতায় যেতে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখাটা দলগুলোর জন্য জরুরি। এর অর্থ এই নয়, সংসদে ব্যবসায়ীদের একচেটিয়াভাবে আনতে হবে। কারণ তার ফলে দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষদের সমন্বয়ে সংসদ হওয়ার পথ বাধাগ্রস্ত হবে।’