সরকারের ভুল নীতি ও ষড়যন্ত্রের ফাঁদে আটকা পড়েছে দেশের টেক্সটাইল শিল্প। এমনকি বিগত আওয়ামী লীগ আমলের ‘কালো নীতি’ও বহাল রয়েছে। এ কারণে দেশি-বিদেশি সুদূরপ্রসারী চক্রান্তে পড়ে ব্যাপক সম্ভাবনার জানান দেওয়া দেশীয় টেক্সটাইল এখন একরকম কোমায় চলে যাচ্ছে। ফলে এ খাতের ৩ লাখ কোটি টাকার বিনিয়োগ বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এর মধ্যে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগের পরিমাণ ২ লাখ কোটি টাকা। নানা কারণে বাজার প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে ইতোমধ্যে ৫০টির বেশি স্পিনিং মিল বন্ধ হয়ে গেছে। আর যেগুলো টিকে আছে, সেগুলোর উৎপাদনও চলছে ঢিমেতালে।
গণ-অভ্যুত্থানের মুখে পতনের আগে আওয়ামী লীগ সরকার ২০২৪ সালের জুনে এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) উত্তরণের অজুহাতে রপ্তানির নগদ প্রণোদনা কমিয়ে আনে। তখন টেক্সটাইল শিল্পের প্রণোদনা ৪ শতাংশ থেকে কমিয়ে দেড় শতাংশ করা হয়। এ কারণে রপ্তানিমুখী টেক্সটাইল শিল্পের সক্ষমতা আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পায়। পক্ষান্তরে ভারত ২০০৪ সালে এলডিসি থেকে বেরিয়ে গেলেও টেক্সটাইল শিল্পে ভিন্ন নামে প্রণোদনা সুবিধা দিয়ে আসছে। যে কারণে দেশটির টেক্সটাইল খাত ক্রমেই শক্তিশালী হয়েছে। দেশের চাহিদা মিটিয়ে তারা বাংলাদেশের বাজারেও ঢুকে পড়েছে। এমনকি দীর্ঘমেয়াদি টার্গেট নিয়ে তারা কম দামে সুতা ঢাকায় ডাম্পিং করছে।
বাংলাদেশে এক কেজি সুতা উৎপাদন করতে খরচ হয় ৩ ডলার। অপরদিকে একই মানের সুতা ভারত উৎপাদন করে ২ ডলার ৮৫ সেন্টে। অথচ ৩৫ সেন্ট কমে ভারত সেই সুতা বাংলাদেশে আড়াই ডলারে রপ্তানি করছে। এজন্য দেশটির সরকার নানা পন্থায় তাদের টেক্সটাইল শিল্পকে ভর্তুকিও দিচ্ছে। মূলত এই অসম প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে দেশের স্পিনিং মিলগুলোকে ক্রমাগত লোকসান গুনতে হচ্ছে। এতে বোঝা যায়, বাংলাদেশের টেক্সটাইল খাতকে ধ্বংস করতে ভারত সুপরিকল্পিতভাবে এমন পথ বেছে নিয়েছে।
এদিকে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে বেশকিছু পদক্ষেপ নেয়। এর মধ্যে ব্যাংক ঋণের সুদ ও মুদ্রা বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করা হয়। খেলাপি ঋণের লাগাম টানতে সংজ্ঞায় পরিবর্তন এনে এমন শর্ত আরোপ করা হয়, যেখানে বিনিয়োগকারীদের ওপর চাপ বাড়ে। ফলে আগে যেখানে ঋণের কিস্তি পরিশোধে ৯ মাস বিলম্ব করলে খেলাপি হিসাবে চিহ্নিত করা হতো, এখন সেখানে তিন থেকে সর্বোচ্চ ছয় মাসের সীমা বেঁধে দেওয়া হয়। এছাড়া ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত ব্যাংক ঋণে সুদহারের সর্বোচ্চ সীমা ছিল ৯ শতাংশ। এরপর ধাপে ধাপে এই হার বাজারভিত্তিক করা হয়, যা বর্তমানে ১৫-১৬ শতাংশ গিয়ে ঠেকেছে।
বস্ত্র খাতের উদ্যোক্তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে যুগান্তরকে বলেন, দুঃখের বিষয় হলো-বিগত আওয়ামী লীগ সরকার শিল্পবিরোধী যত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, এর সবই বহাল রেখেছে অন্তর্বর্তী সরকার। কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। উলটো শিল্পের ওপর নতুন নতুন বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। বাজেটে টেক্সটাইল শিল্পের প্রধান কাঁচামাল তুলা আমদানিতে শুল্ক বসানো হয়েছে। করপোরেট কর সাড়ে ১২ থেকে বাড়িয়ে ২৭ শতাংশ করেছে। যদিও স্থলবন্দর দিয়ে ভারতীয় সুতা আমদানি বন্ধের মতো সাহসী সিদ্ধান্তও সরকার নিয়েছে, যা প্রশংসার দাবি রাখে। তবে বিদ্যমান বাস্তবতায় সরকার সহায়ক নীতি গ্রহণ করতে ব্যর্থ হলে এ শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা যাবে না। কেননা শুধু অতিরিক্ত আমদানির কারণে দেশীয় স্পিনিং মিলের উৎপাদনক্ষমতা ৩০ এবং উইভিং মিলের ১৯ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) তথ্যমতে, বাংলাদেশের টেক্সটাইল মিলগুলো সুতা ও কাপড়ের চাহিদার পুরোটাই জোগান দিতে সক্ষম। বর্তমানে বছরে ৪০০ কোটি কেজি নিট ও ওভেন সুতার চাহিদা রয়েছে, এর বিপরীতে স্পিনিং মিলগুলোর ক্যাপাসিটি রয়েছে ৩৯৭ কোটি কেজি। অর্থাৎ সুতার উৎপাদন ঘাটতি মাত্র ৩ কোটি কেজি। অন্যদিকে নিট ও ওভেন কাপড়ের চাহিদা রয়েছে ৩৭০ কোটি কেজি, এর বিপরীতে টেক্সটাইল মিলগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে ৩২৫ কোটি কেজি। অর্থাৎ কাপড়ের উৎপাদন ঘাটতি আছে ৪৫ কোটি কেজি। অথচ আমদানির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, নিট ও ওভেন সুতা আমদানি হয়েছে ১২১ কোটি কেজি। আর কাপড় আমদানি হয়েছে ১০৮ কোটি কেজি। সুতা বেশির ভাগ আমদানি হচ্ছে ভারত থেকে। আর কাপড় আমদানি হচ্ছে চীন থেকে।
২৮ ডিসেম্বর গুলশান ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, বর্তমানে স্পিনিং মিলগুলোয় প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার সুতা অবিক্রীত পড়ে আছে। স্থলবন্দর দিয়ে আমদানি বন্ধ রাখায় গত এপ্রিল থেকে এ পর্যন্ত নৌপথে সুতা আমদানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৩৭ শতাংশ। যেটা আমদানির প্রকৃত চিত্র বলা যায়। স্থলবন্দর দিয়ে সুতা আমদানি হলে অবস্থা আরও ভয়াবহ হতো।
তিনি আরও বলেন, ২০ মাসে সরকার টেক্সটাইল শিল্পবিরোধী অনেক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বাজেটে টেক্সটাইল শিল্পের প্রধান কাঁচামাল তুলা আমদানিতে শুল্ক বসিয়েছে। করপোরেট কর সাড়ে ১২ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৭ শতাংশ করেছে। নগদ প্রণোদনা ক্রমেই কমিয়েছে। শ্রম আইন সংশোধন করে শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন করার বিধান সংশোধন করেছে-এই সিদ্ধান্তগুলো কি আত্মঘাতী নয়? এসময় বন্ধ হয়েছে ২৫০টি গার্মেন্ট এবং ৫০টিরও বেশি টেক্সটাইল মিল।
বিটিএমএ-এর সহসভাপতি সালেউদ জামান বলেন, গত ৫-৬ বছরে শিল্পবিরোধী অনেক নীতি নেওয়া হয়েছে। যেমন: গ্যাসের দাম ৩০০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। রপ্তানি প্রণোদনা যেটা ২৫ শতাংশ থেকে শুরু হয়েছিল, সেটা পর্যায়ক্রমে দেড় শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। পক্ষান্তরে প্রতিযোগী দেশ ভারত নানা নামে প্রণোদনা দিয়েছে। অথচ সরকারের কাছে ২ বছর ধরে একাধিকবার প্রণোদনা বাড়ানোর জন্য আবেদন জানিয়েও সুরাহা হয়নি। ফলে ৫০টির বেশি মিল ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। তিনি আরও বলেন, এ শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে প্রণোদনা বাড়ানো দরকার, এ বিষয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো একমত। কিন্তু আশ্চার্যজনক বিষয় হচ্ছে, এখনো সিদ্ধান্ত আসছে না। টেক্সটাইল শিল্পে ৫০ কোটি ডলার প্রণোদনা দিলে রপ্তানি খাতে এ শিল্প আরও বেশি মূল্য সংযোজন করতে পারে।
আউটপেস স্পিনিং মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বিটিএমএ-এর সাবেক পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার রাজীব হায়দার বলেন, সাম্প্রতিককালে সরকার বাংলাদেশ টেক্সটাইল সংক্রান্ত যেসব নীতি গ্রহণ করেছে, এর বেশির ভাগই টেক্সটাইল শিল্পবান্ধব নয়। এলডিসি উত্তরণের অজুহাতে আমাদের প্রণোদনা কমানো হয়েছে। অন্যদিকে ভারত সরকার রোডট্যাপ (ভারত সরকারের রপ্তানি প্রণোদনা)-সহ নানা প্রণোদনা দিয়েছে। রাজ্য সরকারগুলোও কেন্দ্রের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে জমি কেনা ও বিদ্যুৎ বিলে বিভিন্ন হারে প্রণোদনা দিচ্ছে। অর্থাৎ ভারত নীতি সহায়তা বাড়িয়েছে, আর আমরা সংকুচিত করেছি। কেন এ নীতিগুলো নেওয়া হয়েছে, কার স্বার্থে নেওয়া হলো-এই প্রশ্নের উত্তর কারও কাছে নেই। মূলত এসব কারণে ভারত বাংলাদেশের চেয়ে কম দামে সুতা বিক্রি করতে পারছে। তিনি আরও বলেন, বস্ত্র খাতের স্পিনিং, উইভিং, ডাইং-প্রিন্টিং ও ফিনিশিং মিলে বিনিয়োগের পরিমাণ ৩ লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি। সরকার এভাবে ভুল নীতি গ্রহণ করায় এ খাতে বিপুল অঙ্কের বিনিয়োগ এখন বড় ঝুঁকিতে।