যুগান্তর পত্রিকায় ৯ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত “সিআরআইয়ের মাধ্যমে ‘মুজিব ভাই’ সিনেমায় ব্যয় করা হয়েছে ৪২১১ কোটি” শীর্ষক একটি প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক সময়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। ওই প্রতিবেদনের সূত্র ধরে কালেরকণ্ঠ, মানবজমিন, বাংলাভিশন, দৈনিক যায়যায়দিন ও আমাদের সময়সহ একাধিক গণমাধ্যমেও প্রায় একই ধরনের শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়। এর ফলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেক ব্যবহারকারী ভুল তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিক্রিয়া জানাতে শুরু করেন।
প্রতিবেদনের বিস্তারিত অংশে যুগান্তর ‘আইসিটি শ্বেতপত্র টাস্কফোর্স ২০২৫’-এর অধীনে প্রকাশিত শ্বেতপত্রের বরাত দিয়ে লিখেছে, “শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব স্থাপন ও সিআরআইয়ের মাধ্যমে ‘মুজিব ভাই’ চলচ্চিত্র নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৪ হাজার ২১১ কোটি ২২ লাখ টাকা। একইভাবে ‘খোকা’ সিনেমা নির্মাণের নামে নেওয়া হয় ১৬ কোটি টাকা।” এই বক্তব্য থেকেই মূল বিভ্রান্তির সূত্রপাত।
খবরটি প্রকাশের পর সামাজিক মাধ্যমে নানা মন্তব্য ছড়িয়ে পড়ে। সাংবাদিক পলাশ মাহমুদ তার ভেরিফাইড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে লেখেন, “মুজিব ভাই’ সিনেমার খরচ ৪২১১ কোটি। এই টাকায় অন্তত ১০টি বড় হাসপাতাল হতো। অথচ বাঙালির ১টা এয়ারঅ্যাম্বুলেন্স নাই।”
তবে শ্বেতপত্রের মূল নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সেখানে ভিন্ন তথ্য রয়েছে। শ্বেতপত্রে বলা হয়েছে, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ (আইসিটিডি) তহবিল থেকে রাজনৈতিক প্রচারণামূলক কর্মকাণ্ডে মোট ৪২১১.২২ লক্ষ টাকা ব্যয় করা হয়েছে। অর্থাৎ, কোটির অঙ্কে এই ব্যয়ের পরিমাণ প্রায় ৪২ কোটি ১১ লক্ষ টাকা, ৪ হাজার ২১১ কোটি টাকা নয়।
শ্বেতপত্রটির প্রথম ভাগের (Part - I: Context and Vision) ৪১ নম্বর পৃষ্ঠার ‘Fact 12’ অংশে ইংরেজিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, “Taxpayer's money has been wasted by ICTD to finance unproductive partisan activities. The Father of Nation Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman Memorial Trust signed several MoUs with ICTD to facilitate the use of project funds for partisan activities such as the production of the animated series "Khoka" and animated movie "Mujib bhai". In one of the legal documents we have reviewed, there is direct mention of CRI linked with this Bangabandhu Memorial Trust. Based on information received from ICTD officials, a combined total of BDT 4211.22 lakh was spent on political propaganda activities with ICTD funds.”
বাংলায় যার অর্থ দাঁড়ায়, “আইসিটিডি-এর মাধ্যমে করদাতাদের অর্থ অপচয় করা হয়েছে অউৎপাদনশীল দলীয় কর্মকাণ্ডে অর্থায়নের জন্য। আইসিটিডির সঙ্গে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্ট একাধিক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে, যাতে প্রকল্পের তহবিল ব্যবহার করে ‘খোকা’ নামের অ্যানিমেটেড সিরিজ এবং ‘মুজিব ভাই’ নামের অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্রের মতো দলীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা যায়। আমাদের পর্যালোচনা করা একটি আইনি নথিতে বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল ট্রাস্টের সঙ্গে সিআরআই-এর সরাসরি সংযোগের উল্লেখ রয়েছে। আইসিটিডি কর্মকর্তাদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, আইসিটিডির তহবিল থেকে রাজনৈতিক প্রচারণামূলক কর্মকাণ্ডে মোট ৪২১১.২২ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়েছে।”
অর্থাৎ, অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র ‘মুজিব ভাই’ ও অ্যানিমেটেড সিরিজ ‘খোকা’সহ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন দলীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনায় আইসিটিডি তহবিল থেকে ব্যয় হয়েছে মোট ৪২১১.২২ লাখ টাকা, যা প্রায় ৪২ কোটি টাকার সমান। এই অঙ্ককে ভুলভাবে ৪২১১ কোটি টাকা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে কিছু গণমাধ্যমে।
এছাড়া শ্বেতপত্রটি প্রণয়নের কাজে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন আসিফ শাহরিয়ার সুষ্মিত। এ বিষয়ে জানতে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, “সরকারি ডকুমেন্টে ইউনিট লেখা হয় লক্ষ-এর অঙ্কে, কোটি-এর অঙ্কে নয়। এ বিষয়েও হিসাবটি লক্ষ টাকায় লেখা হয়েছে।”
ফলে স্পষ্টভাবে বলা যায়, যুগান্তরে প্রকাশিত “সিআরআইয়ের মাধ্যমে ‘মুজিব ভাই’ সিনেমায় ব্যয় করা হয়েছে ৪২১১ কোটি” শিরোনাম এবং বাংলাভিশনে প্রকাশিত “শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব ও ‘মুজিব ভাই’ সিনেমায় ৪২১১ কোটি টাকা খরচ: শ্বেতপত্রে প্রকাশ” শিরোনামসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রতিবেদন তথ্যগতভাবে বিভ্রান্তিকর এবং শ্বেতপত্রের মূল বক্তব্যের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।