ঢাকা মহানগরী দীর্ঘদিন ধরেই তীব্র যানজট, জনসংখ্যার চাপ ও অপরিকল্পিত নগরায়নের কারণে এক জটিল যোগাযোগ সমস্যার মুখোমুখি। প্রতিদিন অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও সাধারণ নাগরিকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় আটকে থাকতে হয়। এই বাস্তবতায় ঢাকার যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক যুগান্তকারী সংযোজন হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে মেট্রোরেল। আধুনিক, দ্রুতগামী ও পরিবেশবান্ধব এই গণপরিবহন ব্যবস্থা রাজধানীর যাতায়াত ব্যবস্থায় ইতোমধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে শুরু করেছে। মেট্রোরেল যানজটমুক্ত পরিবহন নিশ্চিত করছে, যা ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরের জন্য অত্যন্ত কার্যকর।
ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)-এর তত্ত্বাবধানে নির্মিত মেট্রোরেলের প্রথম লাইন, এমআরটি লাইন-৬, উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত বিস্তৃত। এই রুটটি রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকাগুলোকে সংযুক্ত করেছে। ফলে অফিসপাড়া মতিঝিল, শিক্ষাকেন্দ্র শাহবাগ, বাণিজ্যিক এলাকা ফার্মগেট ও মিরপুরসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ স্থানে যাতায়াত আগের তুলনায় অনেক সহজ ও দ্রুত হয়েছে।
এবার ঢাকার মেট্রো প্রকল্পে অর্থায়নে এগিয়ে আসছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটি গাবতলী থেকে ডেমরার মধ্যে নির্মিতব্য এমআরটি লাইন-২ এ ঋণ দিতে আগ্রহী। এ প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, বিস্তারিত নকশা, অর্থায়ন কাঠামো ও দরপত্র সম্পর্কিত কাজগুলো শুরুর ব্যাপারে আলোচনা করতে ঢাকায় আসছে বিশ্বব্যাংকের একটি প্রতিনিধি দল।
মেট্রোরেল নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনার দায়িত্বে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) সূত্রে জানা গেছে, সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, নকশা প্রণয়ন, দরপত্র তৈরির কাজগুলোর জন্য একটি কারিগরি সহায়তা প্রকল্প গ্রহণের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। আর এ প্রকল্পে ২৫ লাখ ডলার অনুদান দেবে বিশ্বব্যাংক। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে কত টাকা ব্যয় হবে, তা সমীক্ষা ও নকশা প্রণয়নের পরই নির্ধারণ করা হবে। শুরুতে গাবতলী থেকে নারায়ণগঞ্জ সদর পর্যন্ত এমআরটি লাইন-২ নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। প্রস্তাবিত এ রুটের দৈর্ঘ্য ছিল ৩৫ কিলোমিটার। নির্মাণের জন্য ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছিল প্রায় ৬১ হাজার কোটি টাকা। পরবর্তী সময়ে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) হালনাগাদকৃত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনার চূড়ান্ত প্রতিবেদনে রুটটি গাবতলী থেকে ডেমরা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়। এ রুটের দৈর্ঘ্য ২৩ দশমিক ৫ কিলোমিটার। গাবতলী থেকে শুরু হয়ে ঢাকা উদ্যান, বসিলা মোড়, মোহাম্মদপুর বিআরটিসি বাসস্ট্যান্ড, জিগাতলা, সায়েন্স ল্যাব, নিউমার্কেট, আজিমপুর, লালবাগ, চকবাজার, মিটফোর্ড, নয়াবাজার, ধোলাইখাল, দয়াগঞ্জ, কাজলা, ডেমরা হয়ে তাড়াবো বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত যাবে এ মেট্রোলাইন।
প্রকল্পটির জন্য সমীক্ষাসহ আনুষঙ্গিক কাজ করার জন্য বিশ্বব্যাংকের অনুদানে ‘প্রিপারেটরি প্রজেক্ট অব দ্য প্রপোজড ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (লাইন-২) অ্যান্ড ইনস্টিটিউশনাল স্ট্রেনদেনিং অব ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড আন্ডার গ্র্যান্ড ফাইন্যান্সিং’ শীর্ষক একটি কারিগরি সহায়তা প্রকল্প তৈরি করেছে ডিএমটিসিএল। প্রকল্পটি বর্তমানে পরিকল্পনা কমিশনে অনুমোদনের জন্য প্রক্রিয়াধীন বলে জানা গেছে।
উড়াল ও পাতালপথের সমন্বয়ে গড়ে তোলা হবে এমআরটি লাইন-২। লাইনটির ডিপো ও ডিপো অ্যাকসেস করিডোর এবং কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ড নির্মাণের জন্য ঢাকা জেলার ডেমরা এলাকায় মাতুয়াইল ও দামড়িপাড়া মৌজায় গ্রিন মডেল টাউন এবং আমুলিয়া মডেল টাউনের মধ্যবর্তী স্থানে ১৬৩ দশমিক ৮৬৬ একর ভূমি চিহ্নিত করে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান ড্যাপে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো মেট্রোরেলে অর্থায়ন করতে যাচ্ছে বিশ্বব্যাংক। এর অংশ হিসেবে সোমবার সংস্থাটির একটি প্রতিনিধি দল ঢাকায় আসবে। তারা ২২ জানুয়ারি পর্যন্ত ঢাকায় অবস্থান করে প্রয়োজনীয় কাজগুলো এগিয়ে নেবে। এ সময় সমীক্ষা, নকশা, দরপত্র প্রণয়নসহ আনুষ্ঠানিক কাজগুলোর বিষয়ে আলোচনা হবে বলে জানা গেছে। পাশাপাশি ডিএমটিসিএল, ডিটিসিএ, রাজউক, পরিকল্পনা কমিশন ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গেও প্রতিনিধি দলটি মতবিনিময় করবে।
ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারুক আহমেদ গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, লাইনটিতে অর্থায়নে বিশ্বব্যাংক আগ্রহ দেখিয়েছে। তবে অর্থায়নের ব্যাপারে এখনো তাদের সঙ্গে কোনো আলাপ হয়নি। একটি কারিগরি সহয়তা প্রকল্প গ্রহণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এটা শেষ হওয়ার পর অর্থায়নসহ আনুষ্ঠানিক বিষয়গুলো এগিয়ে নেয়া হবে।