Image description

বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক জাকির তালুকদার মনে করছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের 'মেটিকুলাস প্ল্যানের' সর্বশেষ খেলা দেখা যাবে আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারির ভোটে। ভোটের বাক্সে কার কত ভোট পড়বে জানি না। কিন্তু বিজয়ী ঘোষিত হবে জামায়াতের ইসলামীর নেতৃত্বের জোট। বিএনপির আশার পরিণতি ১৯৯১ সালের আওয়ামী লীগের মতো হলে অবাক হবেন না। জাতীয় নাগরিক পার্টিকে (এনসিপি) এত গুরুত্ব ও টাকা-পয়সা দিয়ে জামায়াত প্রধান উপদেষ্টার 'সিগন্যালে' জোটে নিচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন জাকির তালুকদার।

গতকাল বুধবার (৭ই জানুয়ারি) গভীর রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে দেওয়া এক পোস্টে লেখক জাকির তালুকদার এসব কথা বলেন। তার পোস্ট এর মধ্যে ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। তার বক্তব্যের পক্ষে-বিপক্ষে মতামত জানিয়ে নানা শ্রেণি-পেশার নেটিজেন ফেসবুক আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন। প্রসঙ্গত, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণের তারিখ হিসেবে ১২ই ফেব্রুয়ারিকে নির্ধারিত করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।

বাংলা একাডেমি তার মান ধরে রাখতে পারেনি, এই অভিযোগ জাকির তালুকদার ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে আওয়ামী লীগের সরকারের আমলে বাংলা একাডেমির পুরস্কার ফেরত দিয়ে আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছিলেন। জাকির তালুকদার তার ‘মুসলমানমঙ্গল’ গ্রন্থের জন্য বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেয়েছিলেন। ১০ বছর পর তিনি এটি ফেরত দেন। ওই বছরের ৫ই আগস্ট আওয়ামী লীগের সরকার ক্ষমতাচ্যুত ক্ষমতাচ্যুত হয়।

বুধবার রাতের ফেসবুক পোস্টে জাকির তালুকদার বলেন, 'ইউনূস সাহেবের (প্রধান উপদেষ্টা) মেটিকুলাস প্ল্যানের সর্বশেষ খেলা দেখা যাবে ১২ই ফেব্রুয়ারির ভোটে। কেন বলছি? অনেকগুলো লক্ষণ আছে। তার মধ্যে একটার কথাই শুধু বলি। জামায়াত কি জানে না এনসিপির কোনো ভোট-ভবিষ্যৎ নাই? নিশ্চয়ই জানে। তবু এত গুরুত্ব দিয়ে, এত টাকা দিয়ে এনসিপিকে সাথে নিচ্ছে কেন?'

তিনি বলেন, 'উত্তর--ইউনূস সাহেবের সিগন্যালে। ভোটের বাক্সে কার কত ভোট পড়বে জানি না। কিন্তু বিজয়ী ঘোষিত হবে জামায়াত জোট। বিএনপির আশার পরিণতি ১৯৯১ সালের আওয়ামী লীগের মতো হলে অবাক হবেন না।'

যোগাযোগ করলে বিএনপির প্রতি সহানুভূতিশীল বুদ্ধিজীবী হিসেবে পরিচিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ্ সুখবর ডটকমকে মুঠোফোনে ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রসঙ্গে বলেন, '১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করবে এমন ধারণা সবার মনে ছিল। কিন্তু সবার সেই চিন্তাকে ভুল প্রমাণ করে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। কিন্তু সেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা সরকার গঠনের জন্য যথেষ্ট ছিল না। যে কারণে সরকার গঠনের জন্য জামায়াতে ইসলামীর সমর্থন নিতে হয়েছিল।'

দৈনিক প্রথম আলোর উপসম্পাদক এ কে এম জাকারিয়া বলছেন, 'জামায়াত তার রাজনৈতিক ইতিহাসে এখন সবচেয়ে ভালো সময় পার করছে। একাত্তরের বাংলাদেশবিরোধী অবস্থান ও অপকর্মকে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান দিয়ে ঢেকে ফেলার চেষ্টায় তারা অনেকটাই সফল হয়েছে।...বড় জয়ের আত্মবিশ্বাস অনেক সময় ভোটের বাক্সে গিয়ে ভেঙে যায়। ১৯৯১ সালের নির্বাচনকে আমরা এ ক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত মানতে পারি। আওয়ামী লীগ জিতেই গেছে, সরকার গঠন করছে—এমন আওয়াজের মধ্যে তখন জয় পায় বিএনপি।'

জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক এ কে এম জাকারিয়া প্রথম আলোতে প্রকাশিত এক উপসম্পাদকীয়তে এসব কথা বলেন। তার লেখাটি গতকাল ৭ই জানুয়ারি প্রথম আলোর ছাপা সংস্করণে মধ্য ও ডানপন্থার ভোটের লড়াই—শিরোনামে প্রকাশিত হয়।

এদিকে চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে জায়গা করে নেয় জামায়াত, যা অতীতে ছিল না। এবার ভোটের হিস্যায় দলটি বেশ প্রভাব বিস্তার করবে বলে মনে করেন লেখক ও গবেষক আলতাফ পারভেজ। তিনি বলেন, ‘জামায়াতের প্রভাব বাড়ছে। তবে সেটিকে পুরো জামায়াতের কৃতিত্ব বলা যাবে না। সমাজে ধর্মের প্রভাব বেড়েছে এবং তা কালেক্টিভ। অর্থাৎ রাজনৈতিকভাবে স্মার্ট হওয়ায় ইসলামের সামগ্রিক প্রভাবকে নিজেদের বলে তুলে ধরছে দলটি। ফলে পুরো ইসলামিক ঘরানার নেতৃত্বও নিজেদের হাতে বলে দাবি করছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘সমাজের কত শতাংশ মানুষকে জামায়াত প্রতিনিধিত্ব করে তা বোঝা যাচ্ছে না, যেহেতু ১৫ বছর ধরে কোনো নির্বাচন ছিল না। এবার নির্বাচন হলে এবং তা সুষ্ঠু হলে সেটি বোঝা যাবে। তবে এটি সত্য, শহরের তুলনায় গ্রামে বিশেষ করে উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলে জামায়াতের প্রভাব বৃদ্ধি পেয়েছে। আসন্ন নির্বাচনে আসন কয়টি পাবে জানি না। তবে ভোটের হার অপ্রত্যাশিতভাবে অনেক বাড়বে। আমি মনে করি ভোটের হিস্যায় জামায়াত সারপ্রাইজ দেবে।’

রাজনৈতিক দল হিসেবে যাত্রার আট দশকেরও অধিক সময় পার করেছে জামায়াত। দেশের রাজনীতিতে কখনো জোটে কখনো বা বিভিন্ন সংগঠনের আড়ালে মাঠে নেমে নিজেদের অবস্থান জানান দিয়েছে দলটি। তবে বরাবরই ছিল দ্বিদলীয় রাজনীতির বাইরের শক্তি। পেয়েছে ‘কিং মেকারের’ তকমাও। প্রথমবারের মতো এবারই জাতীয় রাজনীতিতে একক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে জামায়াত। আসন্ন নির্বাচনেও ধর্মভিত্তিক দলটির প্রভাব জারি থাকবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

স্বাধীনতার পর প্রথমবারের মতো জামায়াত দেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় উঠে আসে প্রয়াত স্বৈরাচারী রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের শাসনামলে। এরশাদ সরকারের অধীনে ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে ১০টি আসন পায় দক্ষিণপন্থী দলটি। যদিও ১৯৮৮ সালের একতরফা নির্বাচনে তারা অংশ নেয়নি। বরং বিএনপি ও আওয়ামী লীগের সঙ্গে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেয়। নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের ঠিক পর পরই ১৯৯১ সালের নির্বাচনে ১৮টি আসনে জয়ী হন জামায়াতের প্রার্থীরা। সে সময় বিএনপিকে সরকার গঠনে সমর্থনও করেন তারা।

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় জামায়াতে ইসলামী স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বেশ প্রশ্নবিদ্ধ হয়। এরই সূত্র ধরে ১৯৭২ সালে সাংবিধানিকভাবে সব ধরনের ধর্মভিত্তিক দলের রাজনীতি নিষিদ্ধ হলে বন্ধ হয়ে যায় জামায়াতেরও সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড। পাকিস্তান আমলে ১৯৫৮ সালেও সেনাশাসক আইয়ুব খানের সময় প্রথমবার নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে হয় জামায়াতকে।

দলটি আরো একবার ১৯৬৪ সালে নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েছিল। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে ১৯৭৭ সালের দিকে জিয়াউর রহমান জনসমর্থন আদায়ের জন্য জামায়াতের মতো দলগুলোর সহযোগিতা নিতে থাকেন। কিন্তু তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে জামায়াত আবারো ছিটকে পড়ে। সেখান থেকে আবার ঘুরে দাঁড়ায় বিএনপি কিংবা বড় দলগুলোর হাত ধরেই।