Image description
 

আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় দর্শনার্থীদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে পরিবেশবান্ধব ব্যাটারিচালিত প্রাইভেটকার। জ্বালানি তেলের ক্রমবর্ধমান দামের এই সময়ে মাত্র ২ টাকা খরচে ১ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে এই বিশেষ গাড়িটি। সাশ্রয়ী যাতায়াতে নতুন দিগন্ত মেলার প্যাভিলিয়নে প্রদর্শিত এই গাড়িটি দেখতে প্রতিদিন ভিড় জমাচ্ছেন শত শত মানুষ। আমদানিকারক ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো জানাচ্ছে, মধ্যবিত্ত পরিবারের বাজেট এবং যাতায়াতের কথা মাথায় রেখেই এটি বাজারে আনা হয়েছে। সাধারণ পেট্রোল চালিত গাড়িতে যেখানে প্রতি কিলোমিটারে খরচ হয় ১০ থেকে ১৫ টাকা, সেখানে এই ইলেকট্রিক কারে খরচ হবে নামমাত্র।

 

বাসার সাধারণ সকেট থেকেই মোবাইল ফোনের মতো চার্জ দেওয়া যাবে। একবার ফুল চার্জ দিলে অনায়াসেই ১০০ থেকে ১২০ কিলোমিটার পথ চলা সম্ভব। কোনো কার্বন নিঃসরণ নেই, ফলে এটি সম্পূর্ণ শব্দহীন ও ধোঁয়ামুক্ত। ইঞ্জিন না থাকায় মোবিল পরিবর্তন বা অন্যান্য জটিল মেইন্টেন্যান্সের ঝামেলা নেই।

প্রযুক্তিগত স্পেসিফিকেশন এই গাড়িগুলো সাধারণত 'লিথিয়াম আয়রন ফসফেট' বা উন্নত মানের 'লিড-অ্যাসিড' ব্যাটারি দিয়ে চালিত হয়। সাধারণত ১০০০ ওয়াট থেকে ৩০০০ ওয়াটের মোটর ব্যবহার করা হয়। ব্যাটারির ধরন ভেদে এটি ২ থেকে ৫ বছর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। লিথিয়াম ব্যাটারি হলে স্থায়িত্ব বেশি হয়। এগুলো মূলত শহরের ভেতরে চালানোর জন্য তৈরি, তাই সর্বোচ্চ গতি সাধারণত ঘণ্টায় ৪০ থেকে ৬০ কিলোমিটারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে।

 

প্রতি কিলোমিটারে ২ টাকা খরচ হওয়ার গাণিতিক হিসাবটি মূলত বিদ্যুত বিলের ওপর ভিত্তি করে। একটি পূর্ণ চার্জ দিতে ৪ থেকে ৫ ইউনিট বিদ্যুৎ খরচ হয়। প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১০ টাকা ধরলে, ৫০ টাকায় গাড়িটি ১০০ কিলোমিটার চলতে পারে। অর্থাৎ, প্রতি কিলোমিটারে খরচ হয় মাত্র ৫০ পয়সা থেকে ১ টাকা (নিউজ রিপোর্টে ২ টাকা বলা হলেও বাস্তবে এটি আরও কম হতে পারে)।

 

বাণিজ্য মেলায় আসা আধুনিক মডেলগুলোতে সাধারণ প্রাইভেটকারের মতোই সব সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। অধিকাংশ মডেলে শক্তিশালী এয়ার কন্ডিশনিং সিস্টেম থাকে। টাচস্ক্রিন ইনফোটেইনমেন্ট সিস্টেম, রিয়ার ভিউ ক্যামেরা এবং ব্লুটুথ কানেক্টিভিটি। সামনে ডিস্ক ব্রেক এবং পেছনে ড্রাম ব্রেক সিস্টেম। রিমোট কন্ট্রোল লক এবং চুরিবিরোধী অ্যালার্ম সিস্টেম।

মেলায় প্রদর্শিত বিভিন্ন ব্র্যান্ড ও আকার ভেদে এই গাড়িগুলোর দামের ভিন্নতা রয়েছে। টু-সিটার (২ জন) ৪ লক্ষ থেকে ৬ লক্ষ টাকা। ফোর-সিটার (৪ জন) ৭ লক্ষ থেকে ১২ লক্ষ টাকা। মেলার বিশেষ অফারে অনেক সময় বুকিং দিলে ডিসকাউন্ট পাওয়া যায়। কিছু সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জ গাড়িটি কেনার আগে এই দিকগুলো অবশ্যই বিবেচনা করবেন।

বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী, অনেক ছোট ইলেকট্রিক গাড়ির (ফোর-হুইলার) রেজিস্ট্রেশন পাওয়া জটিল হতে পারে। কেনার আগে নিশ্চিত হোন এটি BRTA অনুমোদিত কি না। যেহেতু এগুলো আমদানিকৃত, তাই নষ্ট হলে স্থানীয় গ্যারেজে পার্টস পাওয়া কঠিন হতে পারে। বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের সার্ভিস সেন্টার কোথায় আছে তা জেনে নিন। এগুলো ওজনে হালকা হওয়ায় হাইওয়েতে বড় বাসের পাশে চালানো ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরতা কমাতে সরকার বর্তমানে ইলেকট্রিক ভেহিকল (EV) পলিসি করছে। এই গাড়িগুলো জনপ্রিয় হলে শহরের বায়ু ও শব্দ দূষণ অনেকাংশে কমে আসবে।

মেলায় আসা মাসুদ করিম ভূঁইয়া নামে দর্শনার্থী বলেন, "শহরের ভেতরে যাতায়াতের জন্য এটি একটি দারুণ সমাধান হতে পারে। বিশেষ করে অফিস বা স্কুল ড্রপিংয়ের জন্য খরচ অনেক কমে আসবে।

বাজার বিশ্লেষকরা এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও কিছু বিষয়ে সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। গাড়িটি কেনার আগে বিআরটিএ (BRTA) থেকে রেজিস্ট্রেশন পাওয়া যাবে কি না এবং হাইওয়েতে চালানোর উপযুক্ত কি না, তা নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। এছাড়া ব্যাটারির স্থায়িত্ব এবং বিক্রয়োত্তর সেবা সম্পর্কেও স্বচ্ছ ধারণা থাকা জরুরি। সাশ্রয়ী মূল্যের এই গাড়িগুলো দেশের যাতায়াত ব্যবস্থায় কতটুকু প্রভাব ফেলতে পারে, তা এখন দেখার বিষয়।

এবারের মেলায় পলিথিন ব্যাগ এবং সিংগেল ইউজ প্লাস্টিক ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বিকল্প হিসেবে হ্রাসকৃত মূল্যে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব শপিং ব্যাগ সরবরাহ করা হবে।

মেলার লে-আউট প্ল্যান অনুযায়ী বিভিন্ন ক্যাটাগরির ৩২৪টি প্যাভিলিয়ন/স্টল/রেস্টুরেন্ট, দেশীয় উৎপাদক-রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানসহ সাধারণ ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান এবং বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

মেলায় সাধারণ দর্শনার্থীদের যাতায়াতের সুবিধার্থে কুড়িল বিশ্বরোড, ফার্মগেট (খেজুরবাগান/খামারবাড়ি), নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদী থেকে প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে বাণিজ্য মেলার উদ্দেশ্যে বিআরটিসির ২০০টির বেশি ডেডিকেটেড শাটল বাস চলবে।