আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির সাধারণ সম্পাদক মো. আসাদুজ্জামান ভূঁইয়া (ব্যারিস্টার ফুয়াদ) বরিশাল-৩ (বাবুগঞ্জ-মুলাদী) আসনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী। নিজেকে তিনি তুলে ধরার চেষ্টা করেন ভিন্ন ধারার রাজনীতিক হিসেবে।
নির্বাচনী প্রচারে নিজের কোনো অর্থ ব্যয় করবেন না, এমনকি কারও কাছ থেকে ধারও নেবেন না- সেই ঘোষণাই দিয়েছেন তিনি। এই ব্যতিক্রম দাবির পক্ষে নির্বাচন কমিশনে তাঁর দেওয়া হলফনামায়ও লেখা রয়েছে একই কথা। এই আসনে ফুয়াদকে সমর্থন জানিয়ে প্রার্থী দেয়নি জামায়াতে ইসলামী।
হলফনামা অনুযায়ী, এবি পার্টির তহবিল থেকে ফুয়াদের সম্ভাব্য নির্বাচনী ব্যয় ধরা হয়েছে ২২ লাখ টাকা। অথচ বাস্তবে প্রচারণার মাঠে নামার পর ফুয়াদ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সহায়তা চেয়ে আবেদন করেন। তাতে দেশ ও প্রবাস থেকে অনুদান আসতে থাকে।
কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সেই অঙ্ক পৌঁছে যায় প্রায় ৪০ লাখ টাকায়। সবমিলিয়ে তাঁর সম্ভাব্য নির্বাচনী ব্যয়ের অর্থ গিয়ে প্রায় ৬২ লাখে গিয়ে দাড়িয়েছে। যা নির্বাচন কমিশন ঘোষিত ব্যয়ের প্রায় দ্বিগুন।
জনপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ৭৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্ধারিত ব্যয়সীমা লঙ্ঘন করলে সংশ্লিষ্ট প্রার্থী বেআইনি কর্মকাণ্ডে দোষী সাব্যস্ত হবেন।
এক্ষেত্রে ন্যূনতম দুই বছর থেকে সর্বোচ্চ সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।
গতকাল বুধবার (৭ জানুয়ারি) মধ্যরাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে ফুয়াদ লেখেন, অতিরিক্ত অনুদানের বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তিনি আরো লেখেন, স্বচ্ছতার স্বার্থে অনুদানসংক্রান্ত সব কাগজপত্র নির্বাচন দিবস পর্যন্ত অডিট করে প্রকাশ করা হবে এবং ভোটের পর তা কমিশনে জমা দেওয়া হবে।
নির্বাচনী ব্যয়ের সম্ভাব্য উৎস জানাতে নির্বাচন কমিশনের ফরম-২০ পূরণ করা বাধ্যতামূলক। সেখানে নিজ আয়, আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে ধার বা দান এবং অন্য উৎসের অর্থের বিস্তারিত উল্লেখের বিধান রয়েছে।
ফুয়াদের ফরমে এসব ঘরের বেশিরভাগই ফাঁকা। শুধু ‘অন্যান্য উৎস’ হিসেবে ২২ লাখ টাকার কথা লেখা হয়েছে, যার উৎস হিসেবে উল্লেখ রয়েছে এবি পার্টির তহবিল। সেই ফরমে গত বছরের ২৯ ডিসেম্বর তাঁর স্বাক্ষর রয়েছে। এসব তথ্য নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটেও প্রকাশিত।
তুলনামূলকভাবে একই দলের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মজিবুর রহমান ভূঁইয়া (মঞ্জু) তাঁর হলফনামায় নির্বাচনী ব্যয়ের উৎস বিস্তারিতভাবে দেখিয়েছেন। ফেনী-২ আসন থেকে তিনি নির্বাচন করছেন। সেই নির্বাচনে তিনি নিজ সঞ্চয় থেকে ৫ লাখ টাকা, আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধার ও দান হিসেবে সাড়ে ২৩ লাখ টাকা দেখিয়েছেন। এছাড়াও দলীয় নেতা-কর্মী ও শুভানুধ্যায়ীদের কাছ থেকে মোট ১৪ লাখ টাকা দান ও ঋণের হিসাব দিয়েছেন। এই স্বচ্ছতার পাশে ফুয়াদের ফরমের ফাঁকা ঘরগুলো আলাদা করে চোখে পড়ছে।
বরিশাল-৩ আসনে ভোটার ৩ লাখ ৩২ হাজার ১০১ জন। মাথাপিছু ১০ টাকা হিসাবে এই আসনে নির্বাচনী ব্যয়ের সর্বোচ্চ সীমা ৩৩ লাখ ২১ হাজার ১০ টাকা। কিন্তু চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি পর্যন্ত ফুয়াদের তহবিলে জমা পড়া অর্থের পরিমাণ ৩৯ লাখ ৬৬ হাজার ৫৫৬ টাকা। এর মধ্যে বিকাশে এসেছে ১৯ লাখ ২৩ হাজার ৫৫২ টাকা, নগদ অনুদান ২ লাখ ৩৫ হাজার ৫৬ টাকা এবং ব্যাংক হিসাবে জমা রয়েছে ১৮ লাখ ৭ হাজার ৯৪৮ টাকা। ব্যয়সীমার এই হিসাব নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।
ফুয়াদের ব্যক্তিগত আর্থিক অবস্থার ছবিটাও মিলছে তাঁর হলফনামায়। সেখানে বলা হয়েছে, বছরে তাঁর আয় সাত লাখ ৪১ হাজার ৬০২ টাকা। এর মধ্যে ৩ লাখ ২৬ হাজার টাকা আসে টিভি টক শো, ইউটিউব ও ফেসবুক থেকে। বাকি অংশ আইন পেশার সম্মানী। তাঁর অস্থাবর সম্পদের মোট মূল্য সাত লাখ টাকা। নগদ দুই লাখ, ব্যাংকে সাড়ে তিন লাখ এবং দেড় লাখ টাকার ইলেকট্রনিক সামগ্রী।
স্ত্রীর নামে রয়েছে নগদ ৫০ হাজার টাকা ও ব্যাংকে ১৮ হাজার টাকা। ইলেকট্রনিক সামগ্রী এক লাখ টাকা এবং আসবাব ৫০ হাজার টাকার। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া স্থাবর সম্পদ এখনো বণ্টন না হওয়ায় তার তথ্য দেওয়া হয়নি। ২০২৫ু২৬ করবর্ষে আয়কর রিটার্নে ছয় লাখ চার হাজার ৯৩৫ টাকা আয়ের বিপরীতে তিনি কর দিয়েছেন ২০ হাজার টাকা। সেখানে মোট সম্পদের পরিমাণ দেখানো হয়েছে পাঁচ লাখ ৯১ হাজার ২৮৪ টাকা।