Image description
 

রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের সেই নামহীন কবরগুলো আজ আর অজানা নেই। ২০২৪ সালের জুলাই মাসের উত্তাল দিনগুলোতে রাজপথে প্রাণ হারানো ৮ জন শহীদের পরিচয় ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে শনাক্ত করেছে বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।সোমবার এক মর্মস্পর্শী অনুষ্ঠানে এই তথ্য নিশ্চিত করে স্বজনদের হাতে তুলে দেওয়া হয় তাদের প্রিয়জনের কবর চিহ্নিতকরণের দলিল।

শীতের নরম রোদে ঝলমল করছিল নতুন বসানো নামফলকগুলো। একদিকে শেরপুরের ড্রাইভার আসাদুল্লাহ (৩১), যিনি উত্তরা থেকে নিখোঁজ হয়েছিলেন ১৯ জুলাই। অন্যদিকে ময়মনসিংহের মাহিম (৩২), যার নিখোঁজের তারিখ মনে নাই পরিবারের। মুন্সিগঞ্জের সোহেল রানা (৩৮), যিনি ছিলেন চার ভাই-এক বোনের সংসারের ‘ছাদ’। ফেনীর টাইলস মিস্ত্রি রফিকুল ইসলাম (২৯), পিরোজপুরের কম্পিউটার প্রশিক্ষক রফিকুল ইসলাম (৫৫), চাঁদপুরের ফার্নিচার শিল্পী পারভেজ বেপারী (২৩)—একটি একটি নাম আজ ইতিহাসের পাতায় ও কবরের ফলকে স্থান পেয়েছে।

জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ মরিস টিডবল-বিন্জ ও ড. লুইস ফনডেরিডার তত্ত্বাবধানে, আন্তর্জাতিক ‘মিনেসোটা প্রটোকল’ অনুসরণ করে গত ৭ থেকে ২৭ ডিসেম্বর কবর উত্তোলন ও ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়।

এই মানবিক অভিযানের নেতৃত্বদানকারী সিআইডি প্রধান, অতিরিক্ত আইজিপি মো. ছিবগাত উল্লাহ বলেন, ‘আমরা শুধু মরদেহ শনাক্ত করছি না। আমরা ইতিহাস সংরক্ষণ করছি, ন্যায়বিচারের ভিত্তি তৈরি করছি।’ তার কণ্ঠে আবেগ ধরা পড়ে যখন তিনি জানান, এ পর্যন্ত ৯টি আবেদনের ৮টিরই ফলাফল ইতিবাচক।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত সরকারের তিন উপদেষ্টা এই প্রক্রিয়ার গভীর মানবিক তাৎপর্য তুলে ধরেন। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফারুক ই আজম বলেন, ‘পরিচয়হীনভাবে তারা আর পড়ে থাকবে না—রাষ্ট্র এখন তাদের আপনজন হিসেবে গ্রহণ করছে।’

এলজিআরডি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান একে মানবিক দায়িত্ব আখ্যায়িত করে বলেন, “রাষ্ট্র দেখিয়েছে, প্রতিটি নাগরিকের মৃত্যু সম্মানিত হওয়া উচিত।” স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা ডা. সায়েদুর রহমান ফরেনসিক বিজ্ঞানের ভূমিকার প্রশংসা করে বলেন, “আমরা নিশ্চিত করেছি যাতে কোনো ধাপে অবহেলা না ঘটে।”

কবরের পাশে দাঁড়িয়ে আসাদুল্লাহর বৃদ্ধ মা কিংবা সোহেল রানার ভাইয়ের বুকফাটা কান্নায় কেঁপে উঠেছিল পুরো এলাকা। এক স্বজন ফুঁপিয়ে বলেছিলেন, “অন্তত এখন জানি, ও কোথায় ঘুমিয়ে আছে।” এই ‘জানতে পারা’ই ছিল দেড় বছরেরও বেশি সময়ের অনিশ্চয়তার অবসান।

রায়েরবাজারের বাতাস আজ ভারী বেদনায়, তবে তাতে মিশেছে এক গভীর মর্যাদার স্বাদ। নামহীন কবরগুলো আজ নাম ফিরে পেয়ে ইতিহাসের অংশ হয়ে রইলো। রাষ্ট্রের এই কার্যক্রম যেন ঘোষণা করছে: প্রতিটি জীবনই মূল্যবান, এবং কোনো নামই চিরতরে হারিয়ে যাবে না।