ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের দুই অভিযুক্ত হালুয়াঘাট সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেছে, সম্প্রতি বাংলাদেশের পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম এমন দাবি করেছিলেন। কিন্তু ভারত বলছে ভিন্ন কথা। ইতোমধ্যেই তার বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে গণমাধ্যমে কথা বলেছে মেঘালয় পুলিশ। এরপরেও একই দাবি করলেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন।
বাংলাদেশের গণমাধ্যমে ডিএমপির উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছিল, ওসমান হাদি হত্যার দুই অভিযুক্ত ফয়সাল করিম মাসুদ এবং আলমগীর শেখ ময়মনসিংহ জেলার হালুয়াঘাট সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে গেছে এবং বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছে। গতকাল শনিবার (৩ জানুয়ারি) এমন বক্তব্যের সপক্ষে কথা বলেছেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন।
তিনি বলেছেন, শহীদ শরিফ ওসমান হাদি হত্যার বিচার নিয়ে তাড়াহুড়া করার কোনো সুযোগ নেই। তিনি জানান, ‘ইন্টারোগেশন (জেরা) থেকে আমরা কিছু ইঙ্গিত পেয়েছি যে তারা (মূল সন্দেহভাজন) সম্ভবত সীমান্ত পার হয়ে গেছে। অবশ্যই আমরা তাদের ফেরত আনার চেষ্টা করছি।’ শনিবার দুপুরে মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে জেলায় কর্মরত বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের প্রধানদের সাথে এক মতবিনিময় সভা শেষে সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন।
হাদি হত্যা মামলার আসামিদের অবস্থান সম্পর্কে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ‘এখনো শতভাগ নিশ্চিতভাবে আমরা বলতে পারছি না। অন্তত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে আমাকে এখনো নিশ্চিত করে বলা হয়নি যে জড়িতরা নির্দিষ্ট কোনো জায়গায় অবস্থান করছেন। যদি আমরা খুব সুনির্দিষ্ট কোনো অবস্থান শনাক্ত করতে পারি, তাহলে ভারতকে বলতে পারব যে অমুক জায়গায় তিনি আছেন, তাকে ধরে আমাদের কাছে হস্তান্তর করা হোক।’ তিনি আরো বলেন, ‘ভারতের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ বজায় রয়েছে। দেখা যাক, এ ব্যাপারে আমরা কতটা অগ্রগতি করতে পারি।’
তবে মেঘালয় পুলিশের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বাংলাদেশের এমন দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন। বাংলাদেশের এই দাবিকে মেঘালয় পুলিশের পক্ষ থেকে ‘অসত্য’ এবং ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা’বলে অভিহিত করা হয়েছে। পুলিশ কর্মকর্তা দাবি করেছেন, বাংলাদেশ পুলিশের কাছ থেকে কোনও আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ করা হয়নি। পুলিশ সংবাদ সংস্থাকে জানিয়েছে, অভিযুক্তদের কাউকে গারো পাহাড়ে খুঁজে পাওয়া যায়নি এবং কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।
মেঘালয় পুলিশ এই দাবিগুলিকে সরাসরি খারিজ করে দিয়ে বলেছে যে, পুর্ত্তি এবং সামি নামে স্থানীয় দুইজন অভিযুক্তকে সীমান্ত অতিক্রম বা ভূমিকার সমর্থনে কোনও গোয়েন্দা তথ্য বা অপারেশনাল প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এর আগে রোববার (২৮ ডিসেম্বর) রাজধানীর শাহবাগে ইনকিলাব মঞ্চের অবস্থান কর্মসূচিতে গিয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী বলেন, শহীদ শরিফ ওসমান হাদি হত্যা মামলার চার্জশিট আগামী ৭ জানুয়ারির মধ্যে আদালতে পেশ করা হবে। ডিএমপি কমিশনার বলেন, শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য উদঘাটন করা হবে। যারা ঘটনার পিছনে আছে তাদের সবার নাম ও ঠিকানা উন্মোচিত করে দেব। তিনি বলেন, হত্যাকাণ্ডের তদন্ত চলছে। সরকার পুলিশ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), র্যাবসহ সব গোয়েন্দা সংস্থাকে ঘটনার পেছনে কারা জড়িত, তা উদঘাটনের দায়িত্ব দিয়েছে। ইতোমধ্যে তদন্তে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে।
একই দিন হাদির হত্যা মামলার তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির অতিরিক্ত কশিমনার এসএন নজরুল ইসলাম বলেন, সরকার ইতোমধ্যে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে মামলাটি নিষ্পত্তি করার ঘোষণা দিয়েছে। সেই লক্ষ্যে আমরা কাজ করছি। এই জঘন্য ঘটনার ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে আমাদের ও রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
হাদি হত্যার বিচার দাবিতে ঢাকার ৬ পয়েন্টে অবস্থানের ঘোষণা
জুলাই অভ্যুত্থানের নেতা শরিফ ওসমান হাদি হত্যার বিচার দাবিতে মার্চ ফর ইনসাফ কর্মসূচি করছে ইনকিলাব মঞ্চ। শনিবার থেকে নতুন এ কর্মসূচি শুরু হয়েছে। রবিবার (৪ জানুয়ারি) কর্মসূচির দ্বিতীয় দিনে ঢাকার ৬ স্পটে (জায়গায়) অবস্থান নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। সেগুলো হল— শাহবাগ, ধানমন্ডি, পল্লবী, মিরপুর-১০, উত্তরা ও মোহাম্মদপুর।
এতে উল্লেখ করা হয়, ভারতীয় আধিপত্যবাদবিরোধী আন্দোলনের অগ্রসেনানি, ইনসাফের বাংলাদেশ গড়ার রূপকার শহীদ শরিফ ওসমান হাদি হত্যার বিচারসহ ইনকিলাব মঞ্চ ঘোষিত চার দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে ‘মার্চ ফর ইনসাফ’ কর্মসূচি রবিবার দুপুরে শুরু হয়। এদিন ঢাকার শাহবাগ, মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, মিরপুর ১০, পল্লবী ও উত্তরায় অবস্থান কর্মসূচি পালন কালে পুলিশ ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে দফায় দফায় সংঘর্ষ ও ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া হয়েছে।
ইনকিলাব মঞ্চের চার দফা দাবি হল— খুনি, খুনের পরিকল্পনাকারী, খুনের সহায়তাকারী, পলায়নে সহযোগী, আশ্রয়দাতাসহ পুরো খুনিচক্রের আগামী ২৪ দিনের মধ্যে বিচারকার্য সম্পন্ন করা, বাংলাদেশে অবস্থানরত সব ভারতীয়র ওয়ার্ক পারমিট বাতিল করা, ভারত তার অভ্যন্তরে আশ্রয় নেওয়া সব খুনিকে ফেরত দিতে অস্বীকৃতি জানালে ভারতের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করা এবং সিভিল মিলিটারি ইন্টেলিজেন্সের মধ্যে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে থাকা ফ্যাসিস্টের দোসরদের চিহ্নিত করে গ্রেপ্তার ও বিচারের মুখোমুখি করা।
উল্লেখ্য, গত ১২ ডিসেম্বর জুমার নামাজের পর গণসংযোগ শেষে ফেরার পথে রাজধানীর বিজয়নগরে বক্স কালভার্ট সড়কে চলন্ত রিকশায় থাকা ওসমান হাদিকে গুলি করে সন্ত্রাসীরা। এরপর উন্নত চিকিৎসার জন্য ওসমান হাদিকে সিঙ্গাপুরে পাঠিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। তবে তাকে বাঁচানো যায়নি। গত ১৮ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
১৯ ডিসেম্বর তার মরদেহ দেশে আনাহয়। ২০ ডিসেম্বর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে লাখো মানুষের অংশগ্রহণে হাদির জানাজা হয়। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধির পাশে তাকে শায়িত করা হয়।