ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের সময় ও পরে দেশের বিভিন্ন কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া বন্দিদের মধ্যে এখনো ৭১৩ জন ফেরারি। এসব বন্দির মধ্যে দুর্ধর্ষ অপরাধীও রয়েছেন। পাশাপাশি দেড় বছর হতে চললেও এখনো কারাগার থেকে লুট হওয়া সব অস্ত্রও উদ্ধার হয়নি। এসব অস্ত্রের মধ্যে আছে চাইনিজ রাইফেল, শটগানও। এ অস্ত্র ব্যবহার করে পালিয়ে যাওয়া বন্দিদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। পলাতক বন্দিদের বিষয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ব্যবস্থা নিতে বলেছে কারা অধিদপ্তর।
কারা অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে সরকার পতনের আগে-পরে দেশের ১৭টি কারাগারের বন্দিরা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেন। পালিয়ে যান নরসিংদী, শেরপুর ও সাতক্ষীরা কারাগারের সব বন্দি। নরসিংদী কারাগার থেকে ৮২৬, শেরপুর থেকে ৫০০, সাতক্ষীরা থেকে ৬০০, কুষ্টিয়া কারাগার থেকে ১০৫ ও কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগার থেকে ঝুঁকিপূর্ণ ২০০ বন্দি পালিয়ে যান। এর বাইরে জামালপুর কারাগারে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলেও সেখান থেকে বন্দি পালিয়ে যাওয়ার কোনো ঘটনা ঘটেনি। সব মিলিয়ে দেশের কারাগার থেকে সে সময় ২ হাজার ২৩২ জন বন্দি পালিয়ে যান। পরে তাদের মধ্যে ১ হাজার ৫১৯ জনকে ফেরানো সম্ভব হলেও এখনো ফেরারি ৭১৩ জন। পাশাপাশি এ সময় দেশের কারাগারগুলো থেকে ৬৭টি অস্ত্র লুট হয়। এর মধ্যে এখনো ২৭টি অস্ত্র উদ্ধার হয়নি, যা মোট লুট হওয়া অস্ত্রের ৪০ দশমিক ৪ শতাংশ।
অপরাধ বিশ্লেষকরা মনে করেন, পলাতক বন্দিদের বিরুদ্ধে ডাকাতি, হত্যা, অস্ত্র, মাদক, ধর্ষণ, নারী নির্যাতনসহ বিভিন্ন অভিযোগে ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা রয়েছে। বন্দিদের মধ্যে দুর্ধর্ষরা আবার নানা ধরনের অপরাধ সংঘটিত করতে পারেন, যা আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণ হতে পারে। বিশেষ করে কারাগার ভেঙে পালিয়ে যাওয়া বন্দিরা দেশের নিরাপত্তার জন্য হুমকি। তারা বিভিন্ন মামলার আসামি ছিলেন। জেল ভেঙে পালিয়ে তারা আরো বেশি অপরাধ করার সুযোগ পেয়েছেন। দেশে চলমান খুন, ডাকাতি, ছিনতাইয়ের মতো অপরাধগুলোর পেছনে পালিয়ে যাওয়া অপরাধীদের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে পালানো এসব বন্দিকে আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কারাগার থেকে যেসব বন্দি পালিয়েছে, তাদের সবাইকে ফেরানো সম্ভব হয়নি। পালিয়ে যাওয়া বন্দিরা গুরুতর অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত। তাদের মধ্যে কেউ কেউ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিও ছিলেন। তারা খুব সহজ প্রকৃতির অপরাধী না। এসব অপরাধী নির্বাচনী প্রেক্ষাপটে বা কারো হয়ে রাজনৈতিক সহিংসতায় জড়াতে পারেন। কারণ তাদের সাধারণ একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তারা টাকার বিনিময়ে অন্যের হয়ে কাজ করেন। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বিশেষ অভিযান চালিয়ে তাদের আইনের আওতায় আনার ব্যবস্থা করতে হবে। তারা যে যে অপরাধের দায়ে কারাগারে ছিলেন, তার বাকি সাজা সম্পন্ন করার ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি তারা এই যে দীর্ঘ সময় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরের বাইরে থাকলেন, এ সময়ের হিসাবটাও তাদের কাছ থেকে নেয়া এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া দরকার।’
ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই সর্বপ্রথম নরসিংদী কারাগারে হামলা ও অগ্নিসংযোগের পর বন্দি পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। সে সময় হাজার হাজার মানুষ মিছিল নিয়ে নরসিংদী জেলা কারাগারে হামলা চালিয়ে সেলের তালা ভেঙে দেয়। এতে নিষিদ্ধ সংগঠনের নয়জনসহ মোট ৮২৬ জন বন্দি পালিয়ে যান। এ সময় অস্ত্র, গোলাবারুদ ও খাদ্যপণ্য লুট এবং ব্যাপক ভাংচুরের ঘটনা ঘটে। প্রাথমিকভাবে কারা কর্তৃপক্ষ ও রক্ষীরা প্রতিহত করার চেষ্টা করলেও অবস্থা বেগতিক দেখে শেষ পর্যন্ত পিছু হটতে বাধ্য হন। একপর্যায়ে জীবন বাঁচাতে কয়েদিদের সঙ্গে মিশে যান তারাও।
দেশের কারাগারগুলোর মধ্যে কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগারকে সর্বাধুনিক নিরাপত্তা প্রস্তুতি সংবলিত কারাগার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সাধারণত এ কারাগারে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত, একাধিক গুরুতর অপরাধে ও জঙ্গিবাদ বা সন্ত্রাসে জড়িত দুর্ধর্ষ বন্দিদের রাখা হয়। গণ-অভ্যুত্থানে সরকার পতনের পরদিন ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট বিকালে কাশিমপুর কারাগারের ভেতরে থাকা বন্দিরা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেন। এ সময় তারা কারাগার ভেঙে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কারারক্ষীরা নিবৃত্ত করার চেষ্টা করলে তাদের ওপর চড়াও হন বন্দিরা। কারারক্ষীদের মারধর করে বন্দিদের কেউ দেয়াল ভেঙে, কেউ টপকে, আবার কেউ দেয়ালের সঙ্গে বিদ্যুতের পাইপ লাগিয়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে সেনাবাহিনীকে খবর দিলে তারা অভিযান চালিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে বন্দিদের মধ্যে ২০৯ জন দেয়াল টপকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। পালানোর সময় নিরাপত্তাকর্মীদের গুলিতে মৃত্যু হয় ছয়জনের।
কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগারের পর বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ে জামালপুর কারাগারে। ৮ আগস্ট বেলা দেড়টার দিকে কারাগারের কিছু কয়েদি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে মারামারি শুরু করেন। পরে ১৩ কারারক্ষীকে জিম্মি ও মারধর করে কারাগারের ভেতরের ফটক ভেঙে পালানোর চেষ্টা করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কারারক্ষীরা গুলি ছুড়লে নিহত হন ৬ জন। প্রায় ২ ঘণ্টার গোলাগুলিতে কারা কর্মকর্তা ও বন্দিসহ আহত হন ১৯ জন। তবে শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসায় জামালপুর কারাগার থেকে কোনো বন্দি পালিয়ে যেতে পারেননি।
সহকারী কারা মহাপরিদর্শক (উন্নয়ন) মো. জান্নাত-উল ফরহাদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্যে দেশের ১৭টি কারাগার বিশৃঙ্খলার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ সময় সেখান থেকে পালিয়ে যাওয়া বন্দি ও লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয় করা হচ্ছে। এসব বন্দির অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা চলছে।’
পলাতক বন্দিদের ধরতে পুলিশের প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে জানিয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (গণমাধ্যম ও জনসংযোগ) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া বন্দিদের মধ্যে এখনো যাদের ফেরানো যায়নি তাদের অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারের জন্যও অভিযান অব্যাহত রয়েছে।’