Image description

জাতীয় সরকার একটা ভয়াবহ রকম খারাপ আইডিয়া। গণঅভ্যুত্থানের পর জাতীয় সরকার গঠনে চাপাচাপি একটা খারাপ ধারণা ছিল এবং আল্লাহর অশেষ নেয়ামত যে বিএনপি ধারণাটা গ্রহণ করে নাই। 

নির্বাচনের পূর্বেও এইটা একটা খারাপ ধারণা। 

আম পাবলিকের ফেটিশ এখন জেনারেল সাহেবের মনেও ঢুকছে শুনছি, শুনতে পাইতেছি তিনি এইটা নিয়া লবিং করতেছেন। আশা করি তারেক রহমান এবারও সেটা বর্জন করবেন। 

 

জাতীয় সরকারের পেছনের প্রধান ধারণাটা হলো যে এটা একটা ঐকমত্যের সরকার; সরকার, বিরোধী দল ও বিবিধ দল ঐকমত্যের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনা করবে।

 

এই ঐকমত্যের জাতীয় সরকার কেন খারাপ আইডিয়া, সেইটার দুইটা প্রধান বিষয় আছে। সেটা দেখতে আপনাকে আমাদের ঐকমত্য কমিশন থেকে বেশি দূরে যাইতে হবে না।

 

প্রথম বিষয়টা হলো, রাষ্ট্র পরিচালনা কোনো ঐকমত্যে পৌঁছানোর বিষয় নয়। বরং একটা দ্বন্দ্বমুখর আইডিয়া স্পেসে সমাজ, সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও বিবিধ স্টেকহোল্ডারদের সাথে ইন্টারঅ্যাকশনে গ্রহণ-বর্জনের মাধ্যমে আইডিয়া বিশুদ্ধকরণের প্রক্রিয়াই হচ্ছে রাষ্ট্র নির্মাণের প্রক্রিয়া। 

 

এখানে রাজনৈতিক শক্তি তারেক রহমান সাহেব একটা জিনিস বলবেন, শফিকুর রহমান সাহেব একটা জিনিস বলবেন, নাহিদ সাহেব আরেকটা জিনিস বলবেন।

 

অন্য দিকে সমাজ থেকে উঠে আসা জিয়া হাসান একটা জিনিস বলবে, আসিফ শাহান একটা জিনিস বলবে, আহমাদুল্লাহ হুজুর একটা জিনিস বলবে, সামিনা লুৎফা বলবে আরেকটা বা আরিফ আজাদ বলবে আরেকটা। আমরা সকলেই মনে করব আমাদের নিজস্ব আইডিয়াটা বাকিদের থেকে বেটার।

 

কিন্তু সামাজিক শক্তি হিসেবে আমাদের যেহেতু কোনো বেইল নাই, ফলে সামাজিক শক্তি হিসেবে আমরা যার যার বলয়ে লড়াই করে যাব আমাদের চিন্তা রাজনৈতিক শক্তি যারা রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারক তাদের কাছে গ্রহণ করানোর জন্য। সেই লড়াই করতে গিয়ে জন-গ্রহণযোগ্যতা ও আইডিয়ার শক্তির মাধ্যমে রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে সেই চিন্তা গ্রহণ করাতে বাধ্য করব। রাজনৈতিক শক্তি যদি মেরিটোক্রেটিক হয় তাহলে নিজে যেচে আমাদের কথা শুনবে।

 

কিন্তু রাজনৈতিক শক্তি যদি নিজেদের মধ্যে একসাথে বসে একটা ঐকমত্য তৈরি করে, সেখানে সবচেয়ে নিম্নমানের আইডিয়াটার জয়জয়কার হবে এবং তারা একটা রাজনৈতিক শক্তির সিন্ডিকেট তৈরি করবে। যেখানে জিয়া হাসান বা আসিফ শাহান বা আরিফ আজাদের মতের কোনো গুরুত্ব থাকবে না, কারণ উনারা ঐকমত্যের নামে রাষ্ট্রকে একটা ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র বানিয়ে দিবেন।

 

বিগত এক বছরের অভিজ্ঞতায় আমি দেখেছি, আমাদের রাজনৈতিক এলিটদের রাষ্ট্র চিন্তা শিশুতোষ। কিন্তু তারা শুধু মাত্র ক্ষমতার জোরে তাদের চিন্তা সমাজের উপরে চাপায় দিতে পারেন। বিভিন্ন প্রশ্নে সাবজেক্ট ম্যাটার এক্সপার্টদেরকে শুধু মাত্র তাদের শিশুতোষ রাষ্ট্রভাবনাকে ভ্যালিডেশনের কাজে ব্যবহার করেন, মতামত গ্রহণ করতে নয়।

 

ঠিক এই জিনিসটাই ঐকমত্য কমিশনে হয়েছে। কমিশনগুলোতে কমিশন প্রধানদের এবং সেই সময়ের রাষ্ট্রের পাওয়ারফুল শক্তিদের বা বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে ছাত্রছাত্রীদের নিজস্ব ব্যক্তিগত ও দলীয় চিন্তাকে সমাজের চিন্তা হিসেবে বিভিন্ন ধরনের ঐকমত্য প্রক্রিয়ায় সমাজের উপরে ঐকমত্যের নামে চাপায় দেওয়া হইছে। এই কমিশন গুলোতে অভিবাসী শ্রমিকদেরকে অতিরিক্ত খরচের থেকে কীভাবে মুক্তি দিতে হবে তার কোনো মেকানিজম নাই; আমলাদের ওপর সমাজের কন্ট্রোল কীভাবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে তার কোনো মেকানিজম নাই; অলিগার্কদের দমন করে স্মল বিজনেস কে কীভাবে রক্ষা করতে হবে তার কোনো মেকানিজম নাই। 

 

শুধু তাই না, এই মিডিওকার আইডিয়া সমষ্টিগুলোকে তারা ঐক্যমত প্রক্রিয়ায় ‘জুলাই চার্টার’ নামে একটা পলিটিক্যাল ব্র্যান্ডিং করছেন যে আপনি এটার সমালোচনাও করতে পারবেন না। শিশির মনির সাহেব তো এটার বিরোধিতাকে রাষ্ট্রদ্রোহ হিসেবে ঘোষণা করতে চাইছিলেন। 

 

আমি এই ধরনের মিডিওকার ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র চাই না। আপনি ফ্যাসিবাদী হইলে হাসিনার মতো জুলুমের ফ্যাসিবাদী হন—ঐকমত্যের মাধ্যমে কোমল ফ্যাসিবাদ আনবেন না।

 

দ্বিতীয় বিষয়টার জন্য আপনাকে অভ্যুত্থানের পরে জাতীয় সরকারের ধারণাটা কেন খারাপ ছিল সেটা বলি। যেকোনো কনসেনসাস বা আর্বিট্রেশনে, চূড়ান্ত মত দেওয়ার অধিকার যার থাকে, সে হয় সবচেয়ে পাওয়ারফুল।যেকোনো প্রশ্নে তিনটা পক্ষের তিন রকম দ্বন্দ্ব থাকবে, কিন্তু ফাইনালি যার কথায় দ্বন্দ্ব মিটবে সে হবে সবচেয়ে শক্তিশালী। 

 

অভ্যুত্থানের পরপরই যে জাতীয় সরকারের ধারণা ছিল, সেখানে সবচেয়ে শক্তিশালী এনটিটি ছিল অত্যন্ত মিডিওকার ঢাবির ছাত্র-শক্তির ভাই-ব্রাদার সিন্ডিকেটের—যাদের মিডিওকার বললে মিডিওক্রিটিকে অপমান করা হয়। নাহিদ, আসিফ, মাহফুজ—তিনজনের কেউই তাদের মন্ত্রণালয়ের কাজে মনোযোগী ছিল না। নেপোটিজম এবং নিজের দলের ক্ষমতা সংহত করা বাদে তাদের কোনো মন্ত্রনালয়ে ন্যুন্তম সংস্কার হয় নাই । সেই সময় যদি বিএনপি জাতীয় সরকারের অংশ নিতো , তবে এই জাতীয় সরকার ক্রমাগত যে ফেইল করতে থাকত, এই ফেইলরের দায় পড়ত বিএনপির ওপরে আর ক্রেডিটগুলো সব নিয়ে যেত ঢাবির ছাত্র-শক্তির ভাই ব্রাদারস সিন্ডিকেট।

 

বিএনপি যে এই সময়ের আহ্বানটাকে প্রত্যাখ্যান করতে পারছে, তার কারণেই আজকে একটা নির্বাচন হইতেছে এবং জনগণ বেছে নেওয়ার সুযোগ পাইতেছে। নইলে এই ঐকমত্যের জাতীয় সরকার ঘাড়ের উপরে চেপে ঢাকা ইউনিভার্সিটির ছাত্র-শক্তি সিন্ডিকেট ৫ বছর দেশ চালাইত এবং দেশটাকে ধ্বংস করে দিত। আমার হিউজ রেসপেক্ট বিএনপির জন্য যে তারা এই ঠুনকো জাতীয় সরকারকে প্রত্যাখ্যান করে নির্বাচন প্রশ্নে দেড় বছর অটল এবং অটুট থাকছে। 

 

এই জাতীয় সরকারের ধারণা হলো জনগণের উপরে আস্থা রাখতে না পারা এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জনগণের বেছে নেওয়ার অধিকারকে ধ্বংস করার একটা প্রক্রিয়া , যেখানে জনগণ বুঝতে পারে না ফেইলরের দায়িত্ব টা কার, ফলে আলুপড়া খায় কিছু গোপালে। 

 

যেইটা প্রয়োজন সেটা হলো কিছু ন্যূনতম প্রশ্নে ঐকমত্য—যেমন সকল পক্ষ বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব প্রশ্নে অটুট থাকবে, আমলাতন্ত্রের ওপরে সমাজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে ঐক্যবদ্ধ থাকবে, মাত্র দুই বছরে আমাদের দারিদ্র্যের হার ২০% থেকে ৩০% এ চলে গেছে, এটাকে ০%-এ নিয়ে আসতে হবে, বাজারকে অলিগার্কদের হাত থেকে মুক্ত করতে হবে , মন্ত্রীদেরকে ব্যবসা করতে দিবে না, হাসিনার মতো আর কাউকে ফ্যাসিস্ট হইতে দেবে না, আমলাদের উপরে জনগণের নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠা করবে, 

জনগণের মৌলিক অধিকার প্রশ্নে অনড় থাকবে, ফ্রি স্পিচ প্রশ্নে অনড় থাকবে। সেই লক্ষ্য গুলোতে ঐকমত্য থেকে, সেই লক্ষ্য গুলোতে কীভাবে পৌঁছানো যায় সেটা নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তি গুলোর মধ্যে একটা আইডিয়ার দ্বন্দ্ব হইতে থাকবে- এইটাই পলিটিক্স ।

 

জাতীয় সরকার সেই দ্বন্দ্বটাকে রিপ্লেস করে পলিটিক্যাল এলিটদের একটা সিন্ডিকেট বানায় এবং জনগণের ওপরে রাজনৈতিক সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ স্থাপন করে । 

এই মেধা বিহীন পলিটিকাল এলিটস, সমাজের কাছ থেকে চাপের স্বীকার না হলে, হয় ফুটেজ খোর পলিটিক্স করে অথবা আমলাতন্ত্রের বশীভূত হয়ে দেশ চালায়। 

 

শুনতে পাইতেছি ওয়াকার সাহেব নাকি জাতীয় সরকারের ধারণাটাকে নিয়ে লবিং করতেছেন। আমি অত্যন্ত দুঃখিত জনাব ওয়াকার স্যার, এইসব আর্মির ইউনিফরমিস্ট বুদ্ধি দিয়ে দেশ চালানোর জন্য জোরাজোরি করবেন না। আমরা আপনাকে সরানোর বিরুদ্ধে যথেষ্ট দৃঢ়তা দেখাইছি। এখন আপনি জনগণকে বাইছা নিতে দেন, নিশ্চিত করেন নির্বাচন যেনো এতো স্বচ্ছ হয়,যেন নির্বাচনের পর নির্বাচন বর্জন করে, আন্দোলন সংগ্রাম শুরু করার সুযোগ কোন দল না পায়, এইটাই আপনার বর্তমান সময়ের প্রধান দায়িত্ব। 

 

এই বিষয়ে যদি কোড অফ কন্ডাক্ট তৈরি করা যায় সেইটা করতে পরামর্শ দেন। 

জাতীয় সরকারের মত শিশুতোষ ফেটিস চাপায় দেওয়ার জন্যে লবিং কইরেন না। 

থামলে ভালো লাগে, স্যার।

 

-জিয়া হাসান