প্রায় চার বছর বিরতির পর ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনে গিয়েছিলেন। তিনি বাংলাদেশ মিশনে গিয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার প্রতি শেষশ্রদ্ধা জানিয়ে লিখেছেন, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে গেছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। তাঁর এই উল্লেখযোগ্য অবদান সব সময় স্মরণ করা হবে। রাজনাথ সিং তাঁর এক্স হ্যান্ডলে শোকবইতে সই করার পর এ তথ্য জানিয়েছেন।
গত দুই দিনে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সংক্ষিপ্ত ঢাকা সফর আর প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের বাংলাদেশ মিশনে যাওয়াটা তাৎপর্যপূর্ণ। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন এবং শেখ হাসিনার ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর থেকে দুই দেশের সম্পর্কের অবনতি হতে থাকে। আর ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের দ্বিতীয়ার্ধে দুই দেশের কূটনীতিকদের পাল্টাপাল্টি তলবের ঘটনায় নতুন করে সংকট তৈরি হয়। এমন প্রেক্ষাপটে ভারতের দুজন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ততা সম্পর্কের গুণগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
প্রায় ১০ দিন আগে দিল্লির বাংলাদেশ হাইকমিশন অভিমুখে বিশ্ব হিন্দু পরিষদসহ (ভিএইচপি) কয়েকটি হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের ডাকে প্রতিবাদ মিছিলকে ঘিরে উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। গত ২৩ ডিসেম্বরের ওই প্রতিবাদ মিছিলের আগে ২০ ডিসেম্বর রাতে একদল বিক্ষোভকারী বাংলাদেশ হাইকমিশন কমপ্লেক্সে অবস্থিত হাইকমিশনারের বাসার উল্টো দিকে বাংলাদেশবিরোধী স্লোগান দিয়েছিল। হাইকমিশনারকে ওই রাতে প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব ঘটনা দুই দেশের মধ্যে তিক্ততা আর উত্তেজনা বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু এক সপ্তাহ না পেরোতেই রাজনাথ সিংয়ের বাংলাদেশ হাইকমিশনে গিয়ে খালেদা জিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা জানানো তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর পাশাপাশি দূতাবাসে গিয়ে এই ইঙ্গিতও দিচ্ছেন যে দূতাবাসে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বটা দিল্লি নিচ্ছে।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরের দ্বিতীয়ার্ধে দুই দেশের কূটনীতিকদের পাল্টাপাল্টি তলবের ঘটনায় নতুন করে সংকট তৈরি হয়। এমন প্রেক্ষাপটে ভারতের দুজন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ততা সম্পর্কের গুণগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দুই দেশের সম্পর্কের সাম্প্রতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সংক্ষিপ্ত ঢাকা সফর গুরুত্বপূর্ণ। প্রায় চার ঘণ্টার ঝটিকা সফরে এসে তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করে খালেদা জিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির চিঠি তুলে দেন। প্রায় ২০ মিনিটের আলোচনায় সম্পর্কের অতীত ও ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁরা দুজন কথা বলেন।

বিশ্লেষকদের মতে, ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে বিএনপির জয়ের সম্ভাবনার ইঙ্গিত আছে। তাই খালেদা জিয়ার জানাজার সুযোগটি কাজে লাগিয়ে বিএনপির সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে সেটা এগিয়ে নেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছে ভারত।
প্রসঙ্গত, দিল্লি ছয় মাস ধরে বারবার বলেছে, বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় আগামী নির্বাচনে জয়লাভের মাধ্যমে যারাই ক্ষমতায় আসবে, তাদের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে ভারত। কূটনৈতিক ও সরকারি সূত্রগুলোর সঙ্গে গত দুই দিনে কথা বলে এই ধারণাই পাওয়া গেছে যে ‘নির্বাচনে বিজয়ী পক্ষের সঙ্গে ভারতের যুক্ততার’ প্রসঙ্গটি গত বুধবারের সংক্ষিপ্ত আলোচনায়ও এসেছে। এখানে ‘যারাই’ ক্ষমতায় আসবে বলতে বিএনপিকে বোঝানো হচ্ছে বলে বিশ্লেষকদের মত। সে দিক থেকে এস জয়শঙ্করের ঢাকা সফরের পরদিনই রাজনাথ সিংয়ের দিল্লিতে বাংলাদেশ মিশনে গিয়ে শোকবইতে সই করাটা ভারতের দিক থেকে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার আগ্রহের স্পষ্ট ইঙ্গিত।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, দুই দেশের অংশীদারত্ব এগিয়ে নিতে তারেক রহমানের নেতৃত্ব নতুন সূচনা করবে বলে নরেন্দ্র মোদির চিঠিতে ইঙ্গিত আছে।
মোদির চিঠির তাৎপর্য
গত বুধবার দুপুরের আগে ঢাকায় এসে বিএএফ বিমান ঘাঁটি থেকে সরাসরি জাতীয় সংসদ ভবনে যান ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। তিনি সেখানে গিয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করেন। এ সময় তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির লেখা চিঠি তুলে দেন তারেক রহমানের হাতে।
চিঠিতে নরেন্দ্র মোদি খালেদা জিয়ার সঙ্গে ব্যক্তিগত সাক্ষাতের প্রসঙ্গ টেনেছেন। খালেদা জিয়ার নেতৃত্ব, বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও জনগণের জন্য তাঁর ভূমিকার প্রশংসা করে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি খালেদা জিয়ার আদর্শের ওপর ভিত্তি করে বিএনপি এগিয়ে যাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। বিএনপি নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি দুই দেশের ‘গভীর ও ঐতিহাসিক অংশীদারত্বকে’ আরও সমৃদ্ধ করতে তারেক রহমানের নেতৃত্বদানকারী ভূমিকা নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, দুই দেশের অংশীদারত্ব এগিয়ে নিতে তারেক রহমানের নেতৃত্ব নতুন সূচনা করবে বলে নরেন্দ্র মোদির চিঠিতে ইঙ্গিত আছে।
সম্পর্ক উত্তরণের আশাবাদ

তারেক রহমানকে লেখা নরেন্দ্র মোদির চিঠি যে তাৎপর্যপূর্ণ, তার ইঙ্গিত আছে দিল্লিতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহর ভাষ্যে। এস জয়শঙ্করের ঢাকা ছাড়ার খবর দিয়ে নিজের এক্স হ্যান্ডলে রিয়াজ হামিদুল্লাহ লিখেছেন, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর চার ঘণ্টার ঝোড়ো সফর শেষে ঢাকা ছেড়ে গেছেন। এই সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ও ভারত সম্পর্কের একটি নতুন অধ্যায়ের পাণ্ডুলিপি রচনার দিকে তাকাতে পারে। সম্পর্কের নতুন অধ্যায়টি হতে পারে বাস্তবতা ও পারস্পরিক নির্ভরশীলতার প্রেক্ষাপটে স্বার্থের ভিত্তিতে। এ প্রসঙ্গে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্করের সংক্ষিপ্ত আলোচনা হয়েছে।
জানা গেছে, তারেক রহমানের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত আলোচনার সময় বিএনপি ও বিজেপি দুই দেশে ক্ষমতায় থাকার সময় (২০০১–২০০৪) কাজের ইতিবাচক অভিজ্ঞতার প্রসঙ্গটি এসেছে। এই প্রেক্ষাপটে ভবিষ্যতে দুই দেশের একসঙ্গে কাজ করার ওপর জোর দেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথে ভারত অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন চায় বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। এস জয়শঙ্কর স্পষ্ট করেই বলেছেন, নির্বাচনে জয়লাভ করে বাংলাদেশে যারাই ক্ষমতায় আসবে, ভারত সরকার তাদের সঙ্গে যুক্ততার জন্য অপেক্ষায় রয়েছে। দুই দেশের অমীমাংসিত বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত করে এস জয়শঙ্কর বলেছেন, দুই দেশের মধ্যে সমস্যা থাকতে পারে; কিন্তু আলোচনার মাধ্যমে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন। তাঁর মতে, আলোচনায় বসে সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।
এর উত্তর আপনাদের আগামী দিনে খুঁজতে হবে। আগামী দিনগুলোতে আপনারা দেখবেন যে কী হয়পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন
আলোচনায় গণতান্ত্রিক উত্তরণ
সরকারি সূত্রগুলো জানিয়েছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার প্রতি শেষশ্রদ্ধা জানাতে এস জয়শঙ্কর ঢাকায় আসার বিষয়টি দিল্লি গত মঙ্গলবার বিকেলে নিশ্চিত করে। ওই দিন সন্ধ্যায় দুই দেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার মধ্যে ফোনালাপ হয়।
তারেক রহমানের সঙ্গে আলোচনার পর এস জয়শঙ্কর জাতীয় সংসদ ভবনে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা করেন। সেখানে বাংলাদেশে আগামী ফেব্রুয়ারিতে শান্তিপূর্ণভাবে অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক উত্তরণের বিষয়ে আলোচনা হয়। গণতান্ত্রিক উত্তরণের মাধ্যমে কীভাবে দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় এগিয়ে নেওয়া যায়, সে বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে বলে কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে।
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ঢাকা সফরের মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েন কমবে কি না জানতে চাইলে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন গতকাল তাঁর দপ্তরে সাংবাদিকদের বলেন, ‘এর উত্তর আপনাদের আগামী দিনে খুঁজতে হবে। আগামী দিনগুলোতে আপনারা দেখবেন যে কী হয়।’