Image description

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের এক মাসের মাথায় ড. মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের সব পর্যায়ে সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়নে ‘মার্চিং অর্ডার’ বাস্তবায়নের নির্দেশ দেন। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে তিনি কিছু সুনির্দিষ্ট নির্দেশনাও দিয়েছিলেন। সেই অনুযায়ী গঠিত হয়েছিল বিভিন্ন খাতভিত্তিক সংস্কার কমিশন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই প্রতিটি কমিশন তাদের প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টার কাছে জমা দেয়।

তবে নানা জটিলতায় এসব কমিশনের সুপারিশ শতভাগ বাস্তবায়ন করা যায়নি। বর্তমান সরকারের মেয়াদে এসব সুপারিশ বাস্তবায়নের সম্ভাবনাও নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বিজয়ী নতুন সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে বিদায় নেবে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। পরবর্তী সরকার এসব কমিশনের সুপারিশ আদৌ আমলে নেবে কিনা, তা নিয়েও যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।

সরকার ও সরকারের বাইরে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাজনৈতিক দলগুলোর অনীহা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্দোলন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা এবং সংস্কার কমিশনের কিছু সুপারিশ বাস্তবসম্মত না হওয়ায় মূলত এগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ঘোষিত ‘মার্চিং অর্ডার’-এর মূল লক্ষ্যে বলা হয়েছিল—জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার বৈষম্যহীন মানবিক দেশ গড়ার প্রত্যয় এবং ভয়হীন চেতনার ওপর দাঁড়িয়ে বিবেক ও ন্যায়বোধে উজ্জীবিত হয়ে সততা, নিষ্ঠা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে। সংস্কার কর্মসূচি প্রণয়নে প্রয়োজন অনুযায়ী সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা ও মতামত গ্রহণ করতে হবে। দুর্নীতির মূলোৎপাটন করে সেবা সহজীকরণের মাধ্যমে জনগণের সর্বোচ্চ সন্তুষ্টি অর্জন করতে হবে। সরকারি অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে নতুন বাংলাদেশের প্রতি বিশ্বব্যাপী তৈরি হওয়া আগ্রহ ও ইতিবাচক ধারণাকে দেশের স্বার্থে সর্বোত্তমভাবে কাজে লাগাতে হবে।

সূত্র জানায়, এ লক্ষ্যেই গঠন করা হয়েছিল ১১টি সংস্কার কমিশন। এগুলো হলো—জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কার কমিশন, বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন, পুলিশ সংস্কার কমিশন, নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন, সংবিধান সংস্কার কমিশন, শ্রমখাত সংস্কার কমিশন, নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশন, স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন, গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন এবং স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন। এ ছাড়া রাজনৈতিক দলগুলোর মতামতের ভিত্তিতে জুলাই সনদ প্রণয়নের জন্য গঠিত হয়েছিল ঐকমত্য কমিশন।

জানা গেছে, সংবিধান সংস্কার কমিশন সংবিধানের মৌলিক পরিবর্তনের মাধ্যমে একটি নতুন সাংবিধানিক কাঠামো তৈরির সুপারিশ করেছে। নির্বাচন কমিশন ও পুলিশ সংস্কার কমিশন নির্বাচন প্রক্রিয়া ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংস্কার বিষয়ে সুপারিশ দিয়েছে। বিচার বিভাগ ও দুর্নীতি দমন কমিশন বিচার ব্যবস্থার স্বাধীনতা ও দুর্নীতি প্রতিরোধের লক্ষ্যে সুপারিশমালা প্রণয়ন করেছে। জনপ্রশাসন ও স্থানীয় সরকার কমিশন সরকারি কর্মপরিচালনা ও স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার আধুনিকায়নের জন্য প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। ব্যাংক, স্বাস্থ্য, নারী ও শ্রম খাতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের সুপারিশও দেওয়া হয়েছে। নানা সংকট পেরিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোকে একত্রিত করে ঐকমত্য কমিশন জুলাই সনদ প্রণয়ন করলেও এতে সব রাজনৈতিক দলের স্বাক্ষর ছিল না।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালনরত আমলারা মনে করেন—অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিদ্যমান প্রশাসনিক কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা ঠিক হবে না। জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও আইনি জটিলতা, আদালতে মামলা, কর্মকর্তাদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল, জাতীয় সংসদ কার্যকর না থাকা, বিদ্যমান ক্যাডার বৈষম্য, আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের অভাব এবং বাজেট জটিলতার কারণে প্রক্রিয়াটি কার্যত থমকে গেছে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, শুধু জনপ্রশাসন নয়—সব সংস্কার কমিশনের সুপারিশই এসব কারণে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে খুব বেশি অগ্রগতি পায়নি। এমনকি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় বাছাই করা কিছু সুপারিশ বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও সেগুলোও কার্যকর করা যায়নি। এজন্য আমলা ও সরকারি কর্মচারীদের আন্দোলন এবং বিভিন্ন ইস্যুতে বিরোধকে দায়ী করছেন তারা। একইসঙ্গে বিভিন্ন কমিশনের দেওয়া দুই শতাধিক সুপারিশের অধিকাংশই বাস্তবায়নযোগ্য নয় বলেও মন্তব্য করেছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, অনেক বিষয় আদালতের রায়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত।

সূত্র জানায়, সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন না হওয়ার জন্য সরকারি কর্মচারীরাও অনেকাংশে দায়ী। সরকারি চাকরি (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ বাতিলের দাবিকে কেন্দ্র করে অন্তর্বর্তী সরকার ও প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়ায়। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সচিবালয়সহ সব সরকারি দফতরে শৃঙ্খলা ও নাগরিক সেবা বজায় রাখা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।

পে স্কেল বাস্তবায়নের দাবিতে আন্দোলনের সময় অর্থ উপদেষ্টাকে সচিবালয়ে অবরুদ্ধ করা, পুলিশি সহায়তায় উদ্ধার, পরদিন পুরো সচিবালয় অচল করে দেওয়ার হুমকি এবং আন্দোলনকারী নেতাদের গ্রেফতারের ঘটনাও ঘটে। এসব পরিস্থিতির কারণে কোনও সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। একই সময়ে গ্রেডসহ বিভিন্ন দাবিতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং বেসরকারি স্কুলের শিক্ষকরাও আন্দোলনে ছিলেন।

এ বিষয়ে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের চেয়ারম্যান ও সাবেক সচিব আব্দুল মুয়ীদ চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “আমরা আমাদের সুপারিশ সরকারের কাছে জমা দিয়েছি। বাস্তবায়নের দায়িত্ব সরকারের। সরকার তার সামর্থ্য ও সময় অনুযায়ী সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করবে। সব সুপারিশ একসঙ্গে বাস্তবায়নের কোনও নির্দেশনা আমাদের পক্ষ থেকে নেই।”

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. এহছানুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া থেমে যায়নি। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় এসব নিয়ে কাজ করছে। অনেক সুপারিশ সময়সাপেক্ষ।”