Image description

ঢাকায় এসে দেখা হলো দক্ষিণ এশিয়ার দুই বৈরী রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের দুই  প্রতিনিধির। বুধবার ঢাকায় খালেদা জিয়ার প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করতে এসেছিলেন তারা। তার জানাজার আনুষ্ঠানিকতা শুরুর আগে বাংলাদেশ পার্লামেন্ট ভবনের অতিথিশালায় ভারত ও পাকিস্তান প্রতিনিধির মধ্যে কুশল বিনিময় হয়। পাকিস্তান ন্যাশনাল পার্লামেন্টের স্পিকার সরদার আইয়াজ সাদিক আর ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর দু’জনেই ঢাকায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানান। খালেদা জিয়াকে চিরবিদায় জানাতে আসা সার্কভুক্ত দেশের মন্ত্রী ও তদূর্ধ্ব ৬ প্রতিনিধি বসেছিলেন জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ ব্লকে অতিথি কক্ষে।

যারমধ্যে ছিলেন নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বালা নন্দা শর্মা, ভুটানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডি এন ধুঙ্গিয়েল, মালদ্বীপের প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত ও দেশটির উচ্চশিক্ষামন্ত্রী আলী হায়দার আহমেদ এবং শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিজিতা হেরাথ। এ সময় এগিয়ে গিয়ে পাকিস্তান পার্লামেন্ট স্পিকার সরদার আইয়াজ সাদিকের সঙ্গে হাত মেলান ভারতের বিদেশমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্কর। তারা দু’জন একে-অন্যের কুশলও জিজ্ঞাসা করেন। এশিয়া ওয়ান নিউজের ইসলামাবাদ ব্যুরোর প্রধান আনাস মল্লিক তার এক্স হ্যান্ডলে প্রথম ছবিটি পোস্ট করেন। লিখেন, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর এগিয়ে গিয়ে পাকিস্তানের পার্লামেন্টের স্পিকার সরদার আইয়াজ সাদিকের সঙ্গে হাত মেলালেন। তারা দু’জন কুশলও বিনিময় করলেন। এ বছরের মে মাসে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধের পর এটাই দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের প্রথম যোগাযোগ। খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিতে পাকিস্তান পার্লামেন্টের স্পিকার সরদার আইয়াজ সাদিক বুধবার দুপুরে ঢাকায় পৌঁছান। 

পাকিস্তানের অন্য মিডিয়া যা বলছে- 
ওই হাত মেলানোকে স্রেফ সৌজন্যতা বা কুশলবিনিময় মনে করে না পাকিস্তানি মিডিয়া। বরং এটাকে সম্পর্কের এক গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে উল্লেখ করছে ইসলামাদের গণমাধ্যম। সূত্রের বরাতে পাকিস্তানের জিও নিউজ বলছে, জাতীয় পরিষদের স্পিকার এবং ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে-অপরের সঙ্গে হাত মেলান এবং সৌজন্য বিনিময় করেন। বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু হয় মঙ্গলবার। তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। জাতীয় শোক পালন উপলক্ষে পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয় এবং হাজারো নিরাপত্তাকর্মী ঢাকার সড়কজুড়ে মোতায়েন ছিলেন। তার মৃতদেহ জাতীয় পতাকা দিয়ে সজ্জিত একটি গাড়িতে বহন করা হয়। সাদিক ও জয়শঙ্করসহ এ অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ নেতারা বাংলাদেশের সাবেক এই নেত্রীর শেষবিদায় অনুষ্ঠানে অংশ নিতে ঢাকায় যান। ভারত ও পাকিস্তানের নেতাদের বৈঠকটি ২০২৫ সালের মে মাসের পর প্রথম এই ধরনের সরাসরি সংযোগ। মে মাসে পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে সংক্ষিপ্ত কিন্তু তীব্র এক যুদ্ধ হয়। দেশ দু’টির সংঘাতের সূত্রপাত ঘটে ভারতীয় দখলকৃত জম্মু ও কাশ্মীরে পর্যটকদের ওপর হামলাকে কেন্দ্র করে। নয়াদিল্লি প্রমাণ ছাড়াই অভিযোগ করে, পাকিস্তান এই হামলার সঙ্গে জড়িত। পাকিস্তান এই অভিযোগ অস্বীকার করে এবং তার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভারতের বক্তব্যকে ‘মিথ্যার সঙ্গে পরিপূর্ণ’ বলে তা চ্যালেঞ্জ করে। চারদিনের সংঘাত চলাকালীন উভয় দেশ যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র, আর্টিলারি এবং ড্রোন ব্যবহার করে। এতে ডজনের বেশি মানুষ নিহত হন। পরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় অস্ত্রবিরতি চুক্তি হয়। পরবর্তী সময়ে পাকিস্তান দাবি করে, তারা সাতটি ভারতীয় যুদ্ধবিমান ধ্বংস করেছে। এর মধ্যে ছিল ফরাসি নির্মিত রাফাল। নয়াদিল্লি স্বীকার করে ‘কিছু ক্ষতি’ হয়েছে। কিন্তু সাতটি বিমান হারানোর কথা আজও স্বীকার করেনি। ওয়াকিবহাল সূত্র বলছে- আজ খালেদা জিয়ার কফিন থেকে অল্পদূরে থাকা পার্লামেন্ট ভবনের অতিথিশালায় ভারত ও পাকিস্তানের উচ্চ নীতি নির্ধারকদ্বয় যেভাবে হাত মেলালেন এবং সহজভাবে কথা বললেন দেশ দু’টির মানুষের মধ্যে যুদ্ধপরবর্তী সামাজিক সম্পর্কে আদতে এখন আর এতোটা সহজ নয়। রাজনৈতিক উত্তেজনা উপচে পড়েছে (স্পিলওভার করেছে) ক্রীড়াঙ্গনেও।  ২০২৫ সালের এসিসি মেনস এশিয়া কাপে ভারতের খেলোয়াড়রা পাকিস্তানি খেলোয়াড়দের সঙ্গে হাত মেলাতে অস্বীকার করেন। দুই দল টুর্নামেন্টে তিনবার মুখোমুখি হয়, যার মধ্যে ফাইনালও অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু তাদের মধ্যে হৃদ্যতার কোনো ছাপ ছিলো না। বিবাদ শুরু হয় গ্রুপ-পর্বের ম্যাচ থেকে। চলতে থাকে সুপার ফোর পর্যন্ত এবং ফাইনালে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়। ফাইনালে ভারত পাকিস্তানকে পরাজিত করলেও মঈন নকভির হাত থেকে ট্রফি হাতে নিতে ব্যর্থ হয়। এ ধরনের হাত মেলানো সংক্রান্ত বিবাদ হয় মহিলা বিশ্বকাপ ম্যাচেও, হংকং সুপার সিক্সে এবং অন্যান্য এসিসি ইভেন্টে। এমনকি জুনিয়র টুর্নামেন্টেও যেখানে দলগুলো প্রচলিত শুভেচ্ছা এড়িয়ে গেছে।

ফিরে গেলেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী: বিএনপি’র চেয়ারপারসন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানিয়ে ফিরে গেছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে শ্রদ্ধা জানাতে বুধবার সকালে ঢাকায় আসেন তিনি। প্রায় চার ঘণ্টার সফর শেষে তিনি বিকালে চেন্নাইয়ের উদ্দেশ্যে রওনা করেন। দিল্লিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার এম রিয়াজ হামিদুল্লাহ তার এক্স বার্তায় লিখেন, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর চার ঘণ্টার ঝড়ো সফর শেষে ঢাকা ছেড়ে গেছেন। এ সফরের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশ ও ভারত সম্পর্কের এক নতুন অধ্যায়ের পাণ্ডুলিপি রচনার দিকে তাকাতে পারে। সম্পর্কের নতুন অধ্যায়টি হতে পারে বাস্তবতা ও পারস্পরিক নির্ভরশীলতার প্রেক্ষাপটে স্বার্থের ভিত্তিতে। এ নিয়ে বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্করের সংক্ষিপ্ত আলোচনা হয়েছে। দুপুরে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর সংসদ ভবনে বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের হাতে ভারতের শোকবার্তা হস্তান্তর করেন। তার আগে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে এস জয়শঙ্কর ভারতীয় বিমানবাহিনীর একটি উড়ানে চড়ে ঢাকায় পৌঁছান। 

ভারতের প্রধানমন্ত্রীর চিঠি তারেক রহমানকে পৌঁছে দেন জয়শঙ্কর: এদিকে তারেক রহমানের কাছে বুধবার দুপুর দেড়টার দিকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির চিঠি হস্তান্তর করে ড. এস জয়শঙ্কর। বিএনপি’র ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেয়া পোস্টে বলা হয়, খালেদা জিয়ার ইন্তেকালে গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে শোকবার্তা পাঠিয়েছে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত। বুধবার দুপুরে জাতীয় সংসদ ভবনে তারেক রহমানের হাতে এই শোকবার্তা হস্তান্তর করেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। 

ব্যক্তিগত ওই চিঠিতে মোদি খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে তারেক রহমানকে সমবেদনা জানান। বলেন, জনাব তারেক রহমান, আপনার মা, বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি’র চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু সংবাদে আমি গভীরভাবে শোকাহত। অপূরণীয় এই ক্ষতির জন্য আমার আন্তরিক সমবেদনা গ্রহণ করুন। পরম করুণাময় তার আত্মাকে চিরশান্তি দান করুন।

চিঠিতে ২০১৫ সালে ঢাকায় খালেদা জিয়ার সঙ্গে নিজের সাক্ষাতের স্মৃতি রোমন্থন করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। লিখেন, সেই আলোচনার কথা আমি উষ্ণভরে স্মরণ করি। বাংলাদেশের উন্নয়ন এবং ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক দৃঢ় করার ক্ষেত্রে খালেদা জিয়ার অবদানের কথা স্বীকার করেন নরেন্দ্র মোদি। তিনি লেখেন, খালেদা জিয়ার প্রয়াণ এক অপূরণীয় শূন্যতা তৈরি করলেও তার আদর্শ ও উত্তরাধিকার চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। মোদির বিশ্বাস, বিএনপিকে খালেদার আদর্শে এগিয়ে নিতেই নেতৃত্ব দেবেন তারেক রহমান। মোদি বাংলাদেশের জনগণের প্রতিও সমবেদনা জানান। চিঠির শেষাংশে তারেক রহমানের প্রতি নিজের সমবেদনা ও শুভকামনা পুনর্ব্যক্ত করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী।  

তারেক রহমানকে সহমর্মিতা জানালেন পাকিস্তানের স্পিকার: ওদিকে বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করেন পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের স্পিকার সরদার আয়াজ সাদিক। বুধবার দুপুর ১টা ৫০ মিনিটের দিকে বিএনপি’র ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেয়া এ সংক্রান্ত পোস্টে বলা হয়, খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিতে ঢাকায় এসেছে প্রতিবেশী রাষ্ট্র পাকিস্তানের প্রতিনিধিদল। দুপুরে জাতীয় সংসদ ভবনে তারেক রহমানকে সহমর্মিতা জানান পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের স্পিকার সরদার আইয়াজ সাদিক। 

নেপাল ও ভুটানের শোকবার্তা হস্তান্তর: এদিকে খালেদা জিয়ার ইন্তেকালে গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে শোকবার্তা পাঠিয়েছে প্রতিবেশী দেশ নেপাল ও ভুটান। বুধবার দুপুরে জাতীয় সংসদ ভবনে বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের হাতে শোকবার্তা হস্তান্তর করেন নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বালা নন্দা শর্মা এবং ভুটানের পররাষ্ট্র ও বৈদেশিক বাণিজ্যমন্ত্রী লিয়নপো ডি এন ধুঙ্গেল। গতকাল মঙ্গলবার মধ্যরাতের কিছু আগে বালা নন্দা শর্মা ঢাকায় আসেন। 
উল্লেখ্য, বিমানবন্দরে অতিথিদের স্বাগত জানান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (আন্তঃসরকারি ও কনস্যুলার বিষয়ক) এম ফরহাদ হোসেন ও মহাপরিচালক (দক্ষিণ এশিয়া) ইসরাত জাহান প্রমুখ।